বানান হয়ে ওঠা সময়

‘মনের মানুষ’: ভদ্রলোকের বাউলিয়ানা

তৈমুর রেজা

A scene from Moner Manush

মনের মানুষ ছবির একটি দৃশ্য

বাউল সাধনা কী পদার্থ? এই প্রশ্নের বিচিত্র সব উত্তর ভদ্রলোক সমাজে এতদিনে চালু হয়েছে। একদম গোড়ার দিকে এর একটা জবাব দেবার চেষ্টা করেছেন অক্ষয় কুমার দত্ত। ১৮৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বইভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়-এর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ঘরানা হিসেবে বাউলদের কথা আসছে। বাউলদের সাধন-ভজনের প্রণালী কেমন? অক্ষয় কুমার জানাচ্ছেন :

প্রকৃতি-সাধনই ইহাদের প্রধান সাধন। ইহারা একটি প্রকৃতি লইয়া বসবাস করে এবং সেই প্রকৃতির সাধনাতেই চিরদিন প্রবৃত্ত থাকে। ঐ সাধন-পদ্ধতি অতীব গুহ্য ব্যাপার। উহা অন্যের জানিবার উপায় নাই। জানিলেও পুস্তকে সবিশেষ বিবরণ করা সঙ্গত নহে। কামরিপুর উপভোগের প্রকরণবিশেষ দ্বারা উহার শান্তি সাধন করিয়া চরমে পরম পবিত্র প্রেম মাত্র অবলম্বন করা ঐ সাধনের উদ্দেশ্য।[১]

 

অক্ষয় কুমার বাউলদের এই গুহ্য সাধনার ‘চারিচন্দ্র ভেদে’র দিকটিতে মনোযোগ দিয়েছেন। তাঁর বরাতে পাওয়া সবচে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ‘শুনিতে পাই, এ সম্প্রদায়ের মধ্যে নর-মাংস-ভোজন ও শবের বস্ত্র সংগ্রহ করিয়া পরিধান করা প্রচলিত আছে।’ তবে নরঘাতক হিসেবে বাউল সমাজকে দাগিয়ে রাখতে তাঁর মতি হয়নি। তাই ফুটনোটে জানিয়ে রাখছেন, ‘ইহারা নরবধ করে না, মনুষ্যের মৃত দেহ পাইলে ভক্ষণ করিয়া থাকে।’

বাউলিয়ানার ওপর প্রথম ‘সরেজমিন প্রতিবেদন’ রচনার কৃতিত্ব মৌলবী আবদুল ওয়ালীর। ১৮৯৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সভায় বাউলদের নিয়ে তিনি এই বিখ্যাত প্রবন্ধটি পড়ে শোনান।[২] লেখক জানাচ্ছেন, বাউলদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ আচরণ, না-ছাঁটা চুল-দাড়ি, বীভৎস জীবনযাপন’ নিয়ে তাঁর অনেক দিনের কৌতূহল। নানারকম তত্ত্বতালাশ করেও ওদের ‘ঘৃণ্য জীবন ও চরিত্র সম্পর্কে’ বেশি কিছু জানার সুযোগ হয় নাই তাঁর। এরপর ঘটনাচক্রে তিনি এদের গুহ্য-সাধনা বিষয়ক একটি বই হাতে পান। এই বই পড়তে গিয়েই বাউলদের একটি ‘ভয়ানক’ দিক সম্পর্কে তিনি চেতন হয়ে ওঠেন। লেখকের ভাষ্যে:

রোগ সারানোর ক্ষমতা, মধুর গান, অদ্ভুত অভ্যাস এবং সাময়িক উৎসব—এসবের মাধ্যমেই তারা অন্যদের কাছে পরিচিত। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবার উদ্দেশ্যেই তারা গোপনে অনেক পুরুষ ধরে ঘৃণা, অপরাধ, লজ্জা ও নোংরামির জীবন যাপন করে চলেছে—এমন সন্দেহ সাধারণত কেউই করে না।[৩]

 

বাউলদের এই ‘ঘৃণা, অপরাধ, লজ্জা ও নোংরামি’র গোপনীয় জীবন বহুকাল ভদ্রলোকদের তাড়া করে ফিরেছে। এই তাড়া খাওয়া ভদ্রলোকদের মধ্যে সবার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম করা দরকার। রবীন্দ্রনাথ বাউল অনুরাগী বলে প্রসিদ্ধ হয়েছেন, দুবার বক্তৃতা দিতে গিয়ে ঘটা করে বাউল দর্শনের সুখ্যাতি করেছেন। বাউল সাধনা সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস—‘ওদের গানই হলো…ওদের সাধনার একমাত্র রূপ’। ফলে, এই সাধনার যে দিকটা ‘অসাঙ্গীতিক’, এবং যে ভাগটা ‘লজ্জা ও নোংরামি’র—রবীন্দ্রনাথ সেদিকে ঘুণাক্ষরেও মাড়াননি। এই ভাগটা সম্পর্কে আন্তরিক ঘৃণা ও সন্দিগ্ধতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

একদা পাড়াগাঁয়ে যখন বাস করতুম তখন সাধু সাধকের বেশ ধারী কেউ কেউ আমার কাছে আসত; তারা সাধনার নামে উচ্ছৃঙ্খল ইন্দ্রিয়চর্চার সংবাদ আমাকে জানিয়েছে। তাতে ধর্মের প্রশ্রয় ছিল। তাদেরই কাছে শুনেছি এই প্রশ্রয় সুরঙ্গপথে শহর পর্যন্ত গোপনে শিষ্যে প্রশিষ্যে শাখায়িত। এই পৌরুষনাশী ধর্মনামধারী লালসার লোলতা ব্যাপ্ত হবার প্রধান কারণ এই যে, আমাদের সাহিত্যে সমাজে সেই-সমস্ত উপাদানের অভাব যাতে বড়ো বড়ো চিন্তাকে, বুদ্ধির সাধনাকে, আশ্রয় করে কঠিন গবেষণার দিকে মনের ঔৎসুক্য জাগিয়ে রাখতে পারে।[৪]

 

ফলে, এই ‘পৌরুষনাশী ধর্মনামধারী লালসার লোলতা’র ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের কোনো প্রশ্রয় ছিল না। কিন্তু বেগতিক ব্যাপার হলো, এই লোলুপ-শ্রেণীর বাউল গাতকেরা অপূর্ব কিছু গান লিখেছেন। এসব গান কিছুতেই ফেলে দেওয়া যায় না। এই ‘বিপরীতের টান’ সামলাতে রবীন্দ্রনাথ বাউলদের দুই শ্রেণীতে ভাগ করছেন—খাঁটি বাউল আর সখের বাউল। ফলে দুরকম বাউল গানও পাওয়া গেল—অমূল্য ও সস্তা। সখের বাউল বেশধারী, অকম্মার ধাড়ি। আর খাঁটি বাউলের লক্ষণ হলো, অসাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কারবিরোধিতা, অহিংসা—এসব ভালো ভালো গুণ। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের লেখালেখিতে ‘চারিচন্দ্রের ভেদ’-এর মতো ‘বীভৎস ব্যাপার’ পুরোপুরি অনুপস্থিত।

রবীন্দ্রনাথের এই ভাগজোকের ফলে ভদ্রলোকের জগতে ‘বাউলিয়ানা’ একটি বিশেষ গড়ন লাভ করল। এই বাউল খৎনা করা নতুন বাউল। রবি-রশ্মির আলোকে অনেক ভদ্রলোক ঠিক করলেন, বাউলদের যৌন জীবনে যে একটা লজ্জা ও নোংরামির দিক আছে সেই পাপ থেকে ওদের রেহাই দিতে হবে। পাশাপাশি ‘সাচ্চা সেকুলার’ হিসেবে গড়ে-পিটে নেওয়া লাগবে। এই রবীন্দ্রপথের কীর্তিমান পথিক ক্ষিতিমোহন সেন। তিনি অবশ্য লজ্জার মাথা খেয়ে কবুল করছেন যে, এদের দেহসাধনায় ‘চারিচন্দ্রের ভেদ অতি গোপন ব্যাপার এবং তাহা অতি বীভৎস’। তবে তাঁর ক্ষরিত হৃদয়ের সান্ত্বনা হলো, ‘চার চন্দ্রভেদও কায়িক ব্যাপার। তাহা হইতেও উচ্চতর ভাব-সাধনাওয়ালা বাউল আছেন।’ এই উচ্চতর ভাব-সাধনওয়ালা বাউলরা জরুর জানেন যে:

চারিচন্দ্রের ভেদ প্রভৃতি স্থুল কায়াসাধনও সেই চিন্ময় পথ তো নহে। আসলে আপনার মধ্যে বিশ্বের পরিচয় এবং যোগও এক চিন্ময় ব্যাপার। ইহাকে বাহ্যরূপে পরিণত করিতে গেলেই বিপদ। চারিচন্দ্রের ভেদ হইল তন্ত্রের ও যোগশাস্ত্রের দাসত্ব।[৫]

 

চারিচন্দ্র ভেদের মাথা মুড়িয়েই তিনি ক্ষ্যান্ত হন নাই। বাউল সাধনার মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনার একটি অপূর্ব মূর্তিও দেখতে পেয়েছেন। এসব ঘটনা ঘটছে দেশভাগের ঠিক আগে-আগে, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি যখন একেবারে তলানিতে নেমে গেছে। এই নিদানকালে বাউল দর্শনের মধ্যে সেকুলার ভাবকল্প আবিষ্কার করার মাধ্যমে তিনি খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি সদর্থক চর্চাকে উস্‌কে দিলেন।

বাউলিয়ানার ডিসকোর্সে এই অদল-বদলটুকু বেশ ভালো করে খেয়াল করা দরকার। প্রথম পর্যায়ে অক্ষয় কুমার ও আবদুল ওয়ালির মতো গবেষকরা বাউল সাধনা সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে তত্ত্ব-তালাশ নিতে শুরু করলেন। দেখা গেল, এই তরিকার সাধুরা উত্তম গান করেন বটে, কিন্তু এঁদের যৌন-রুচি অতি বীভৎস। তাই যৌনরুচি কিছুটা গড়ে-পিটে নেওয়া দরকার। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ছাহাবিদের হাতে এই রূপান্তর শুরু হলো। ‘চারিচন্দ্র ভেদ’ ধুয়ে-মুছে তাঁদের সেকুলার ভাবমূর্তিকে দেবালয়ের প্রদীপ হিসেবে তুলে ধরা হলো।

 

 

২.

গৌতম ঘোষের বানানো মনের মানুষ (২০১০) ছবিতে বাউলিয়ানার যে পরিবেশন হচ্ছে তাতে বেশ মোটা হরফেই এই নির্মিতির ছিলছিলা পাওয়া যাবে। বাউলিয়ানার পরিবেশনে দুটো দিকের প্রতি এই সিনেমা মনোযোগ দিয়েছে: এক, বাউলের যৌনজীবন; দুই, সেকুলার দর্শন। রবীন্দ্রনাথ ও ক্ষিতিমোহনের হাতে সেকুলার ভাবাদর্শ ও ভদ্রলোকী যৌন নৈতিকতার আদলে বাউলের যে মনপসন্দ প্রতিমা গড়া হয়েছিল তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে এই ছবিতে। আমাদের বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, মনের মানুষ ছবিতে বাউলিয়ানার যে ভদ্রলোকী ডিসকোর্স উৎপাদিত হচ্ছে তাকে একবার পরখ করে দেখা।[৬] এই ডিসকোর্স কী অর্থ উৎপাদন করে? প্রচলিত ডিসকোর্সের সঙ্গে এর ঐক্য ও ভেদের জায়গাটি কোথায়? বলে রাখা দরকার, বাউলিয়ানার ভদ্রলোকী ডিসকোর্সের কোনো সামগ্রিক পর্যালোচনা হাজির করা এখানে আমাদের লক্ষ নয়। আমরা কেবল মনের মানুষ ছবির ভাষ্যটি বুঝতে গেলে যেটুকু আলোচনা করে নেওয়া প্রাসঙ্গিক তার মধ্যেই আগ্রহ সীমিত রেখেছি।

 

 

৩.

বাউল দর্শনে কায়া-সাধনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অন্তত বাউল তরিকার যেসব গান আমাদের হাতে রয়েছে তাতে অনায়াসে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। রবীন্দ্রনাথ এই কায়া-সাধনার ব্যাপারটি পুরোপুরি চেপে গেছিলেন—ইতিমধ্যেই সেকথা আমরা বলেছি। মনের মানুষ ছবিতে এই ‘লজ্জা ও নোংরামি’র অধ্যায়টা একেবারে বাদ পড়েনি। ছবির শুরুর আধ ঘণ্টার মধ্যেই দেহ-সাধনার প্রথম ইঙ্গিত পেয়ে যাচ্ছি আমরা। লালন গুরুবাক্য অমান্য করে নিজের বাড়ি ফিরে এসেছে।[৭] কিন্তু জাত খোয়ানোর অপরাধে বাড়িতে তার জায়গা হচ্ছে না। সে বার-বাড়িতে একটা গাছের তলায় বসে জিরাচ্ছে। লালনের প্রথম জন্মের বউ এসেছে সানকিতে করে ভাত নিয়ে। গোগ্রাসে ভাত খেতে খেতে লালন এতকাল অজ্ঞাত থাকার কৈফিয়ত এবং নতুন ফুসলানি দিচ্ছে বউকে:

লালন: আমারে মাফ করে দে। আমার কিছু মনে ছিল না রে বউ। যখন মনের কপাট খুললো ফকিরি নিলাম। আমার গুরু গোসাইয়ের মানা ছিল। অতীতে ফিরিস না লালন। কিন্তু কী করি। বড় সাধ জাগলো যে তোরে দেখার। আমার সাধনসঙ্গিনী হবি? যাবি আমার সাথে? এমন এক দেশে যাব যেথা হিন্দু-যবন বিচার নাই। যেথা এক চাঁদে হয় জগত আলো…।[৮]

 

কায়া-সাধনার ইঙ্গিত এখানে মোটামুটি স্পষ্ট। বাউলতত্ত্বে যুগল সাধনার রীতি। সেই রীতি অনুসারে লালন নিজের সাধনসঙ্গিনী হতে বউকে অনুরোধ করছে। বউ এ-কথার উত্তরে ‘ভয় করে’ জানালেও তার নিমরাজি ভাবটা চাপা থাকে না। কিন্তু অকস্মাৎ লালনের মা এসে পড়ায় ষড়যন্ত্র পণ্ড হয়ে যায়। বিফল মনোরথ লালন সিরাজ সাঁইয়ের আখড়ায় ফিরে আসে।

হতোদ্যম লালন বাড়ি ফেরার পর কায়া-সাধনার দ্বিতীয় উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এই উল্লেখ আগের তুলনায় বেশ স্পষ্ট, খোলামেলা। বাড়ি ও বউয়ের জন্য লালনের বেচইন দশা দেখে সিরাজ সাঁই বুঝে ফেলেছে, লালনের এখন একটা কায়াসঙ্গিনী লাগে। সে ময়ূর বলে একটি মেয়েকে ডাক দেয়। ময়ূরের যে দার্শনিক ভেদ সিরাজ সাঁইয়ের মুখে শোনা গেল সেটা এরকম: ময়ূরের রঙ হলো গিয়ে নীল। আর ঠোঁট দুইটা লাল। নীল মানে ঈর্ষা, আর লাল মানে কামনা। নারীর অন্তরে থাকে ঈর্ষা আর চক্ষুতে কামনা।

মনের মানুষ ছবিতে আসলে গান গাইছে কমলি

মনের মানুষ ছবিতে আসরে গান গাইছে কমলি

ময়ূরের অভিব্যক্তির মধ্যে আমরা কায়াসাধনার প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছি। গুরুর আদেশে ময়ূর এসেছে—কায়াসঙ্গিনী হবে। তার দেহ-ভাষা ও মুখের অভিব্যক্তি তার ‘কামাতুরা’ দশার জানান দিচ্ছে। ফলে, কায়াসাধনার জন্য ময়ূরের প্রস্তুতির মধ্যেই কায়াসাধনা কী বস্তু তার ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। গুরুর হুকুম পাওয়ামাত্র ময়ূর লালনকে বাহু-পাশে গ্রেফতার করে হাঁটা দেয়। গুরু তখন লালনকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেবে বলে পিছু ডাকে। তার উপদেশের সারার্থ মোটামুটি এরকম: ‘যে কর্মে লিপ্ত হতে চলেছিস তার পরিণাম কিন্তু ভয়ংকর। তোর সাধনা এই ভয়ংকর থেকে পরমানন্দ হয়ে সংগ্রহ করা’। নারী সংসর্গের বিপদ সম্পর্কে তার মতামত: নারী ‘সৃষ্টি ও স্থিতির জননী। আবার লয় বিলয়ের মহা শক্তি স্বরূপিনী।’ এই কারণেই ‘নারীর সঙ্গে লীলা সহজ কাম নয়’। সিরাজের সর্বশেষ উপদেশ হচ্ছে, ‘বিন্দু সাধনই প্রেম সাধন’। এরপর সিরাজ ময়ূরের দেহভঙ্গীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটা ইঙ্গিত করলে লালন ময়ূরের বাহুবন্ধনে টলতে টলতে শোবার ঘরের দিকে যেতে থাকে।

এই দৃশ্য থেকে কায়াসাধনার ওপর বেশ মালমশলা পাওয়া যাচ্ছে। এখানকার বিবরণে কয়েকটা বিষয় বেশ স্বচ্ছভাবে নজরে এসে যায়। প্রথমত, সাধনা এখানে একতরফাভাবে পুরুষের। নারী এই সাধনার ক্ষেত্রে ‘অবজেক্ট’ হিসাবে ভূমিকা পালন করে; বলা যায়, যোগালি দেয় মাত্র। ফলে, সাধনার কঠিন সোপান নারীর জন্য পুষ্পশয্যা মাত্র। সাধিকা হিসেবে যথেষ্ট মাত্রায় কামাতুরা হওয়া এবং সাধককে চার্জ করতে পারাটাই তার সঙ্গত ভূমিকা—ছবির রেপ্রিজেন্টেশনে সাধনা ও নারীর এমন একটি সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়।

পরবর্তী দৃশ্যগুলোতে অবশ্য কায়াসাধনার প্রসঙ্গটি বেশ ভিন্ন চেহারায় হাজির হবে। এই পরিবর্তিত রূপটিকে অনায়াসে ‘মেজর শিফট’ হিসাবে দাগিয়ে রাখা যায়। এক চন্দ্রালোকিত রাত্রে কমলি এসে লালনের ঘরে ঢোকে। এসময় তাদের মধ্যে যে বাতচিৎ ঘটে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই ছবির কায়াসাধনার ডিসকোর্সটি বোঝার জন্য। কমলি পুছ করছে লালনকে:

‘আমার গান শুনতি আসরে আইলা না ক্যান?’

‘শুনছি তো দূর থেইকা। গানডা ভুলি গেছিলাম। প্রেমপিরিতির গান। কাম থেকে নিষ্কাম প্রেম।’

‘প্রেম কেমনে নিষ্কাম হয় সাঁই? তুমিই তো কইছ, প্রেম সাগরে ফাপরে ওঠে কাম নদীর তুফান।’

লালন এর উত্তর দিচ্ছে এই বলে: ‘কাশেম কই?’

 

এখানে কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য বলে নেওয়া দরকার। লালন যে নতুন আশ্রম খুলেছে আনন্দবাজার নামে তার একঘর বসতি হচ্ছে কমলি। কমলির খসম কাশেম তুলনামূলক বয়স্ক, রোগা, নির্জীব ধরনের মানুষ। কমলি রূপবতী, এবং লক্ষণীয়ভাবে যৌনআবেদনময়ী। কমলির প্রশ্নের উত্তরে লালন যেভাবে কাশেমের খোঁজ নিতে ব্যাগ্র হয়ে ওঠে তাতে নিশ্চয়ই মনে হয় যে, এই জটিল ও দূরারোগ্য সওয়ালের উত্তর বাউল দর্শনে নাই। কিন্তু বাউল দর্শনে নিষ্কাম প্রেম একটি বহুলচর্চিত সমস্যা। আর এর সুনির্দিষ্ট উত্তরও আছে বাউল কাল্টে। মনের মানুষ সেই উত্তরকে এড়িয়ে নিষ্কাম প্রেমকে একটি ‘অমীমাংসিত সমস্যা’ হিসেবে পরিবেশন করে। এই পরিবেশনা বাউল দর্শনের একটি ভ্যালিড ক্রিটিসিজম হিসেবে দর্শকের সামনে হাজির হয়।

এই বাতচিতের পরবর্তী অংশটুকু আরো বেশি তাৎপর্যমূলক। লালনের ‘কাশেম কই?’ প্রশ্নে দারুণ অনুপ্রাণিত কমলি ফুঁসে ওঠে:

‘সে ঘুমায়। অজ্ঞানের মতো। আর আমি, আমি জ্বলি মরি। আমার জ্বালা মিটাও সাঁই।’ বলতে বলতে কমলি লালনকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু যথোচিত সাড়া না পেয়ে ব্যথা ও বিস্ময়ের সঙ্গে পুছ করে: ‘তুমি কি পাথর? তোমার কামনা বাসনা নাই?’

‘থাকবে না ক্যান? সব মানুষের যেমন থাকে।’ লালন দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দেয়। কমলি তখন লালনের নিম্নাঙ্গের দিকে মনোযোগী হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে লালনের উত্থিত শিশ্ন উপলব্ধি করে হেসে ওঠে: ‘এই তো, তোমার কাম জাগছে। তোমার বাসনা আছে ষোল আনা। তুমি ভাবের ঘরে চুরি করো সাঁই। আমারে শান্ত করো।’

লালন বেশ দাঁত চেপে এর উত্তরে বলছে: ‘শরীর জাগে শরীরের নিয়মে। মন যদি না জাগে?’

 

এই দৃশ্যে সবার আগে যেটি চোখে পড়বে সেটি হচ্ছে, বাউল নর-নারীর মধ্যকার সম্পর্কের এরোটিসাইজেশন; এবং আমাদের পরবর্তী আলোচনা থেকে স্পষ্ট হবে যে এই ধরনের এরোটিসাইজড পরিবেশনার পেছনে বাউল সমাজের গূহ্য-সাধনা সম্পর্কে শিক্ষিত সমাজে বেড়ে ওঠা বেশ কিছু অনুমান কাজ করেছে। আপাতত এর দার্শনিক দিকটির ওপর মনোযোগ দিচ্ছি আমরা। শরীর ও মনের যে পার্থক্যের কথা লালন এখানে কমলিকে শোনাচ্ছে বাউল দর্শনে সেরকম কোনো পার্থক্যের অস্তিত্ব নাই। দেহ ও মনকে আলাদা সত্তা বলে ভাবার যে কার্তেসীয় প্রচল পশ্চিমা দর্শনে আছে বাউল দর্শনে সেই মাল পুরোপুরি অনুপস্থিত।

ভদ্রলোকের বাউলিয়ানা বলে কী বস্তু বুঝতে হবে ছবির এই অংশটি তার জন্য বেশ দরকারি কাঁচামাল। নর-নারীর সংসর্গের সঙ্গে নিষ্কাম সাধনার কোনো সম্পর্ক নাই। বরং নিষ্কাম সাধনা ব্যাপারটাই একটা দুর্বল চিন্তা। সংসর্গ এখানে ‘জ্বালা মেটানো’র একটা সিদ্ধ পদ্ধতি। বাউল-সাধক লালন এই ধরনের সংসর্গের ব্যাপারে আর আগ্রহী না। এমনকি প্রাণপণে এরকম সাধনার থেকে জান-মাল রক্ষা করতে ইচ্ছুক। ফলে ‘কাম জাগা’র পরেও লালন দাঁতে দাঁত চেপে মন না জাগার অজুহাত দেয়।

বলা বাহুল্য যে, বাউল-সাহিত্যে কায়াসাধনা প্রসঙ্গে যেসব ধ্যানধারণা বিরাজিত আছে তার সঙ্গে এই বাদবিসম্বাদের কোনো সম্বন্ধই নাই। কমলি-লালনের এই বাতচিৎ তাহলে সম্ভব হচ্ছে কী করে?

বাউলদের যৌনজীবন নিয়ে বহুকাল ধরেই ভদ্রসমাজে নানারকম ফ্যান্টাসি প্রচলিত আছে। এরকম একটি ফ্যান্টাসির কড়া সাবুদ পাওয়া যাচ্ছে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বিরচিত মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস গ্রন্থে। লেখক বাউলদের সাধনপ্রণালী সম্পর্কে জানাচ্ছেন, ‘এই সমস্ত সাধনের প্রকৃতি এত কদর্য্য ও অশ্লীল যে, আমরা এখানে তাহার কোন একটি উদাহরণ পর্যন্ত উল্লেখ করিতে লজ্জাবোধ করিতেছি।’ এরপর তাঁর কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে বাউলদের ‘বীভৎস’ যৌন-জীবনের সম্পূর্ণ অজানা এক অধ্যায়। লেখক জানাচ্ছেন:

এই মুছলিম ভিক্ষোপজীবী নেড়ার-ফকির দলের পুরোহিত বা পীরেরা শ্রীকৃষ্ণ কর্ত্তৃক গোপিনীদের বস্ত্র হরণের অনুরূপ এক অভিনয়ের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে। যখন পীর তাহার মুরিদানের গ্রামে তশরিফ আনেন, তখন গ্রামের সকল যুবতী ও কুমারী উত্তম বসনে সজ্জিতা হইয়া বৃন্দাবনের গোপিনীদের অনুকরণে একটি গৃহকক্ষে পীরের সহিত মিলিত হয়। …এই সমস্ত নারীরা তাহাদের গাত্রাবরণ খুলিয়া ফেলিয়া সম্পূর্ণ উলঙ্গ হইয়া পড়ে এবং ঘুরিয়া ঘুরিয়া আনন্দে নৃত্য করিতে থাকে। পীর এখানে কৃষ্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং শ্রীকৃষ্ণ যেমন গোপিনীদের বস্ত্র হরণ করিয়া বৃক্ষে আরোহণ করিয়াছিলেন, তিনিও তদ্রুপ এই সমস্ত উলঙ্গ নারীর পরিত্যক্ত বস্ত্র তুলিয়া লইয়া গৃহের একটি উঁচু তাকে রক্ষা করেন। …কোনরূপ সঙ্কোচ বোধ না করিয়া পীরের যৌন লালসা পরিতৃপ্ত করাই ইহাদের প্রধান ধর্মীয় কর্ত্তব্য, তাহা বলাই বাহুল্য।[৯]

 

তাঁর লেখা থেকে আরো জানা যাচ্ছে, এসব ফকিরদের মধ্যে ‘ইচ্ছা পূরণ ভজন’ নামে ‘এক বিশেষ প্রকারের গোপন সাধন-রীতি’র কথা। আর এই সাধনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে:

ইহাতে কোন পুরুষ বা নারী তাহার নিজেদের বা দলের অপর কাহারো যৌন আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত করিতে ইতস্ততঃ বা কোনরূপ লজ্জাবোধ করিবে না। এই উদ্দেশ্যে হতভাগ্য এই ফকির দলের নারী-পুরুষ সকল ভক্ত ‘আখড়া’ নামে একটি বিচ্ছিন্ন স্থানে আসিয়া মিলিত হইয়া নানা দ্রব্য সেবন করে এবং যাহাকে যাহার ইচ্ছা তাহার সহিত যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হইয়া তাহাদের নিগুঢ় সাধনা চালাইয়া যায়।[১০]

 

এই ফ্যান্টাসি নানা রূপে পল্লবিত হয়েছিল। বাউল সাধকরা পরষ্পর পরষ্পরের স্ত্রীকে ব্যবহার করে—এমন একটা দৃঢ় প্রত্যয় দাঁড়িয়ে গেছিল তখনকার ভদ্রসমাজে। আরেকটা যুক্তি তখন বেশ চাউর হয়েছিল যে ‘গাছ পুঁতে ফল খেতে হয়’। অর্থাৎ আপন কন্যা সঙ্গমে দোষের কিছু নেই। এরকম নানা ফ্যান্টাসি গত কয়েকশো বছরে যে কল্পতরু হিসাবে বিকশিত হয়েছে মনের মানুষ ছবিতে তার একটি প্রস্ফূটিত ছবি পাওয়া যাচ্ছে। ভদ্রলোকী পঠনে বাউলের কায়াসাধনা দেহের জ্বালা মেটানোরই একটা বর্বর পদ্ধতি। একে ‘নিষ্কাম প্রেম’ জাতীয় ভুগিজুগির মধ্য দিয়ে একটা ভাবাশ্রয়ী রূপ দেবার চেষ্টা হলেও সেই আস্তরণ ভারি ঠুনকো। আসল কথা হলো, নির্বিচার কামাচার। ভদ্রলোকের ‘প্রিয় গীতিকবি’ লালন এই কামাচারের মচ্ছব থেকে দূর অস্ত। সে শরীরের উত্থানের পাশাপাশি মনকে নিভিয়ে রাখতে সক্ষম, ফলে উঁচুদরের সাধক। কমলির ‘ইনডিসেন্ট প্রপোজাল’ ফিরিয়ে দেবার মাধ্যমে লালন ‌’গড় পুরুষ’ থেকে ‘মহাপুরুষে’র স্তরে উন্নীত হলো।

যৌনতা ও কায়াসাধনা প্রসঙ্গে লালনের এই নতুন প্রণালীর দর্শনে ভাবনার অনেক খোরাক আছে। প্রথম জীবনের বউ ও ময়ূরের সঙ্গে কায়াসাধনার যে কল্পনা লালনের মনে পল্লবিত হচ্ছিল সেটা কমলির যুগে এসে পুরোপুরি উপড়ে নেওয়া হয়েছে। লালন আর যুগল আরাধনা বা নিষ্কাম প্রেমের কঠিন সাধনে মনোযোগী না। এসবের অসারতা সম্পর্কে সে পুরোদমে হুঁশিয়ার। সে বরং কৃচ্ছতার একটি নতুন প্রণালী আবিষ্কার করেছে। শরীর এবং মনের মধ্যে একটি নতুন পার্থক্য আবিষ্কার করে নারীদেহের যৌন আবেদন তুচ্ছ জ্ঞান করাটাই এই সাধনার সাফল্য।

বাউল সাধনার মধ্যে এই ধরনের সাধন-ভজনের কোনো প্রণালীর ইঙ্গিত নাই। লালন ফকির তবে এই সাধনার উৎসাহ পাচ্ছে কোত্থেকে? এর উত্তর হিসাবে আমরা মহাত্মা গান্ধীর নাম করবো। যৌনতা ও নারীসঙ্গ বিষয়ক দুশ্চিন্তা গান্ধীর দর্শনের একটি মৌলিক দিক। গান্ধী যৌনতাকে একটি সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করেছেন, এবং এর নিদান হিসাবে ব্রহ্মচর্যকে ব্রত হিসাবে নিয়েছেন। ব্রহ্মচর্য বলতে গান্ধী কী বোঝেন তার একটা সদুত্তর মিলছে তাঁরই লেখা চিঠিতে। গান্ধীর আচার-বিচার সম্পর্কে যেসব অদ্ভূত কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে তাতে ভারি উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁর এক বয়স্য শিষ্যা গান্ধীকে এক পত্র দেন। এর জবাবে গান্ধী তাঁকে শোনাচ্ছেন:

আমার কাছে ব্রহ্মচর্য মানে হলো এই…যার কখনও কোনো যৌনলালসা নেই, যিনি ঈশ্বরের রাহে নিজেকে অবিরত সমর্পিত রাখার কারণে নির্বিঘ্নে নগ্ন হয়ে নগ্ন নারীর সঙ্গে শুয়ে থাকতে পারেন, তাঁর মধ্যে কোনো অর্থেই কাম-বাসনা জাগ্রত হয় না, সে নারী যত রূপবতীই হোক না কেন। এরকম একজন ব্যক্তি মিথ্যা বলতে অক্ষম, অক্ষম যে কোনো পুরুষ বা নারীর ক্ষতি সাধনেও, তিনি নিরাসক্ত, তিনি মুক্ত ক্রোধ এবং বিদ্বেষ থেকেও।[১১]

(My meaning of brahmacharya is this…one who never has lustful intention, who by constant attendance upon God, has become capable of lying naked with naked women, however beautiful they may be, without being in any manner whatsoever sexually excited. Such a person should be incapable of lying, incapable of intending doing harm to a single man or woman, free from anger and malice and detached.)

 

বুঝতে তেমন অসুবিধা হবার কথা নয় যে, লালন আসলে ব্রহ্মচর্য লাভ করেছে। মহাত্মা গান্ধীর যৌনতার বিশ্বাস এখানে ছেঁউড়ের লালন ফকিরের ওপর সওয়ার হয়েছে। আমরা মনের মানুষ ছবিতে একজন গান্ধীবাদী লালনকে খুঁজে পাচ্ছি। তবে এমন নবরূপে লালনকে আবিষ্কারের পুরো কৃতিত্ব মনের মানুষ ছবিকে দিয়ে ফেলাটা একপেশে হবে। লালনকে ব্রহ্মচারী হিসাবে প্রথম দেখতে পেয়েছেন সম্ভবত লুৎফর রহমান। তাঁর লালন-জিজ্ঞাসা (১৯৮৪) বইতে লালনকে অবিবাহিত ব্রহ্মচারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[১২]

ছবিতে আরো কয়েকবার কায়াসাধনার প্রসঙ্গটি ঘুরেফিরে এসেছে। এই আগে-পরের দৃশ্যগুলো থেকে কায়াসাধনার একটি সঙ্গতিপূর্ণ চিত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যেমন একটি দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে, কমলির কামার্ত চাউনিতে অভিভূত হয়ে কালুয়া পাগলামি করছে। এই পাগলামি ঠেকাতে লালন গিয়ে কমলিকে কালুয়ার ‘নারীসঙ্গ’ মেটানোর বুদ্ধি দিচ্ছে। কিছুটা দোনোমোনো করলেও কমলি এতে রাজি হয়।
কালুয়ার নারীসঙ্গ লাগে—লালনের এই সিদ্ধান্ত ঠিক কায়া-সাধনার দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়। কমলির দেহের জ্বালা এখানে কালুয়ার দেহের জ্বালা হিসাবে পরিণতি পেয়েছে। লালন এই দেহের জ্বালা মেটানোর একটা উপায় হিসাবে কমলিকে সেবায়েত হিসাবে নিয়োগ দিচ্ছে। এই সংসর্গ যে কোনোভাবেই সাধনমূলক নয় তার সাবুদ আমরা পাচ্ছি কমলির জবানিতেই। নৌকা-ঘাটে একদিন লালনকে তীব্র অভিমান নিয়ে সে পুছ করে: ‘আমারে দীক্ষা দেওনি কেন? ক্যান দেওনি একজন সাধনসঙ্গী?’ কমলির মনে এই অভিমান উথলে উঠছে ভান্তির জন্য সাধনসঙ্গী জুটে যাবার পর। লালন ভান্তিকে নির্দেশ দিয়েছে: ‘যখন মন চায় সাজবা। আর করবা কামের সাধন। আমি তোমারে এক সাধক দেব, যার তুমি সাধনসঙ্গিনী হবা।’ এবং প্রতিশ্রুতি মতো দুদ্দু শাহকে সাধনসঙ্গী হিসাবে লাভ করে ভান্তি। ভান্তির জন্য সাধনসঙ্গী জুটে যাওয়াতে কমলির মধ্যে বঞ্চনার বোধ তৈরি হয়েছে। নিজের জন্য সাধন-সঙ্গী না থাকার ব্যাপারে লালনকে অনুযোগ করার মাধ্যমেই কমলি নিজের এই ব্যথা জানান দিয়ে ফেলছে। কিন্তু লালন তাতে সম্মত নয়। সে কমলিকে অভিমানের জন্য নিন্দা করে এবং শিমুলতলির মা জননী অভিধাতে ভূষিত করে।

ভান্তি ও দুদ্দু শাহ—এই সাধক-যুগলের সাধনার দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। ছবিতে এদের দুজনকে সাধনার উপযুক্ত বেশ-ভূষায় সজ্জিত হয়ে চিন্তিত-মুখে যুগল-সাধন করতে দেখা যায়। ছবিতে যেসব যৌন সম্পর্কের উল্লেখ নানাভাবে এসেছে তার মধ্যে এই যুগলের চর্চার সঙ্গেই কায়া-সাধনার সাদৃশ্য সবচে বেশি।

ফলে, বাউল সমাজের কায়াসাধনা বলতে কী বুঝবো—তার নানারকম উত্তর দেওয়া হচ্ছে এই ছবিতে। এতে সন্দেহের মোটেই অবকাশ নেই যে, যৌনচর্চার ব্যাপারে কমলি, ভান্তি ও লালনের অবস্থান পৃথক। কমলির সাধনসঙ্গী পাওয়ার আশা নেই, ফলে কায়াসাধনা তার বেলাতে খাটছে না। কিন্তু তার জীবন অযৌন নয়, কালুয়ার নারীসঙ্গ মেটানোর ভার নেবার মাধ্যমে নিজের একটি যৌনজীবন সে তৈরি করে ফেলেছে। লালন প্রথম পর্যায়ে ময়ূরের সঙ্গে কায়াসাধনা করলেও পরের দিকে আর কায়াসাধক নয়। সে যৌনজীবনকে ছুটি দিয়ে ব্রহ্মচর্য বেছে নিয়েছে। আর ভান্তির প্রসঙ্গে ইঙ্গিত যতটুকু পাওয়া গেছে তাতে বাউল ঘরানার কায়াসাধিকা হিসাবে তাকে মোটামুটি শনাক্ত করা যায়।

এই ছবি তাই কায়াসাধনার সঙ্গতিপূর্ণ কোনো ভাষ্য হাজির করছে না। নানারকম চর্চা এবং অবস্থানের মাধ্যমে একটি জটিল ম্যাট্রিক্স তৈরি করে নিচ্ছে। এখানে সাধনার এজমালি পাটাতনের বাইরে কিছু ব্যক্তিক কুরছি তৈরি হতে দেখছি আমরা। যেমন, লালন বাদবাকি সাধকদের থেকে স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণ করেছে। কমলি শিমুলতলির জননী হিসেবে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান পাচ্ছে। ফলে, গৌতম ঘোষের বিনির্মাণে বাউলের যৌনজীবন বহুত্ব ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লাভ করছে।

 

 

৪.

গত কয়েক দশক ধরে ভদ্রলোকী পরিসরে লালন ফকিরের রেপ্রিজেন্টেশনে একটা দিক বেশ লক্ষণীয়। প্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে সেকুলার ভাবাদর্শের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন লালন। তালাল আসাদ দেখিয়েছেন, জাতীয় সংহতি জোরালো করার মাধ্যমে সেকুলার মতাদর্শ জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপারেটাস হিসেবে কাজ করে। ভদ্রসমাজে লালনের মহাত্মা হয়ে উঠবার পেছনে এই সেকুলার রাজনীতিই সম্ভবত প্রধান প্রেরণা। মনের মানুষছবিতে আমরা এই ডিসকোর্সের প্রতিফলন দেখতে পাবো। এ প্রসঙ্গে ছবির নির্মাতা গৌতম ঘোষের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। গোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন পিকক জেতার পর বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষৎকারে গৌতম জানাচ্ছেন:

আমি আসলে প্রথম লালনের কথা ভাবি, বা গৌণধর্মীদের নিয়ে কাজ করার কথা ভাবি বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পর এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগার পর। আমার তখন মনে হচ্ছিল, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে কী ছবি করবো—রক্তাক্ত, বিচ্ছিরি, মারামারি, কাটাকাটি। এমন কিছু নিয়ে ছবি করবো যে মানুষকে দেখানো আমাদের একটা কম্পোজিট কালচার। তখন আমার লালনের কথা মাথায় আসে। আমি লালনকে নিয়ে কিছু গবেষণা করি। তখন এটা নিয়ে কিছু করা হয়নি। তারপরে ২০০৮ সালে সুনীলদা লিখলে একটা প্লট পেয়ে গেলাম।

মনে হলো এখনকার সময়টাতে লালন আরো প্রাসঙ্গিক। কারণ সমস্ত পৃথিবী জুড়ে একটা অসহিষ্ণুতা, ইনটলারেন্স দেখতে পাচ্ছি আমরা। রিলিজিয়াস ইনটলারেন্স, পলিটিক্যাল ইনটলারেন্স।[১৩]

 

এই বক্তব্যে কয়েকটি দিক বিশেষভাবে খেয়াল করা দরকার। লালনকে নিয়ে ছবি করার কথা ভেবেছেন গৌতম অনেককাল আগে—বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার ফলে যে ভয়াবহ দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল তারই পটভূমিতে এই ছবি নিয়ে ভাবাভাবি শুরু হচ্ছে। দাঙ্গার মতো একটা ‘রক্তাক্ত, বিচ্ছিরি, মারামারি, কাটাকাটি’র বিষয় নিয়ে ছবি না করে তিনি বরং দেখাতে চান আমাদের একটা ‘কম্পোজিট কালচার’। তখনই লালনের কথা মনে আসছে তাঁর। যে বিভক্তির পটভূমিতে দাঙ্গার রক্তাক্ত পরিস্থিতির সূচনা তার মোকাবিলা করতে হলে লালন ফকির বেশ ভালো আইকন হতে পারেন। দাঙ্গার বিরুদ্ধে এমন একটি ছবি তৈরির বাসনা তাঁর যা সাম্প্রদায়িক বিভক্তির অসারতাকে স্পষ্ট করে তুলবে।

মনের মানুষ ছবির পরিচালক গৌতম ঘোষ

মনের মানুষ ছবির পরিচালক গৌতম ঘোষ

২০০৮ সালে এসে তাঁর হাতে পড়ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মনের মানুষ উপন্যাসটি। মনে রাখতে হবে, উপন্যাস হাতে আসার অনেক আগেই কিন্তু ছবির থিম ঠিক হয়ে আছে। শুধু প্লটটা নেওয়া হচ্ছে সুনীলের বই থেকে। গৌতম বিস্মিত হয়ে দেখছেন, দাঙ্গা হয়ত থেমে গেছে অনেককাল আগেই, কিন্তু এখনকার পৃথিবীতে এই ছবির প্রাসঙ্গিকতা বরং আরো বেড়েছে। যে ইনটলারেন্সের বাতাবরণ আমাদের জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে লালনকে স্মরণ করা বেশ কাজের কথা হয়।

এখানে গৌতমের লালন-বীক্ষা বেশ ঘনিষ্ঠভাবেই রবীন্দ্রনাথ বা ক্ষিতিমোহনের টীকা-ভাষ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত। কম-বেশি একশ বছরের এই ডিসকার্সিভ নির্মিতির মধ্য দিয়েই বাউলিয়ানার এই সেকুলার কল্পতরু এখনকার জাতীয়তাবাদী ন্যারেশনের[১৪] একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে, ভদ্রলোকী ডিসকোর্সে বাউলিয়ানার সেকুলার রেপ্রিজেন্টেশনের একটি হালফিল নমুনা হিসেবে এই ছবিটাকে পাঠ করা উচিৎ। সেই দিকে আমরা কিছুটা মনোযোগ দিচ্ছি।

মনের মানুষ ছবির গোড়া থেকেই জাত-পাত নিয়ে খুচরা-খাচরা আলাপের ভাপ উঠতে শুরু করে। তরুণ লালন কবরেজের সঙ্গে তীর্থে যাবার পথে জলবসন্তে আক্রান্ত হলো। আশা নাই ভেবে মৃতপ্রায় লালনকে কলার ভেলায় করে জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়। মুসলমান রমণী রাবেয়া তাকে খুঁজে পেয়ে সেবাযত্ন করে প্রাণ বাঁচাচ্ছে। এসময় ‘বেজেতে লালন’কে যবনের ঘরের অন্ন খাওয়ানো উচিৎ হবে কিনা—এই সূত্রে প্রথম জাতের প্রশ্ন সামনে এলো। এর ঠিক পর পরই লালন ফকিরের মুখে আমরা শুনছি:

আছে হিন্দু মুসলমান দুই ভাগে

বেহেস্তের আশায় মুমিনগণ

হিন্দুরা দেয় স্বর্গেতে মন

ভেস্ত-স্বর্গ দুই-ই সমান।

 

সিরাজের এই গান স্মরণ করার পর লালন জাত প্রসঙ্গে নিজের ধারণাটি খোলাসা করে বলছে, ‘এই দুনিয়ায় দুইটাই জাত। পুরুষ আর নারী। বাকি সব মানুষের অনাসৃষ্টি। আমার গুরু শিখাইছিলেন। সিরাজ সাঁই। আমার প্রাণের মুর্শিদ।’ এরপর সিরাজ সাঁই স্বয়ং তাঁর গানের মধ্যে জাত-পাতকে আরো হাল-ফ্যাশনের প্রশ্ন দিয়ে বিদ্ধ করছেন:

বোল খোদা বোল খোদা বোল

জলের উপর পানি না পানির উপর জল

জমির পরে আসমান নাকি আসমান জমিন সব বরাবর

হিঁদুর মরা শ্মশান না মিয়ার গোরস্তান

 

এভাবে ছবির শুরুর দিকেই জাত-পাত-বিষয়ক হিন্দুয়ানি গোঁড়ামি ও হিন্দু-মুসলমানের ঠোরাঠুরির একটি কড়া পর্যালোচনা হাজির হয়ে যায়। কিন্তু জাত-পাতের সওয়াল কী করে লালন ফকিরের দর্শন-জিজ্ঞাসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলো তার সংবাদ পাচ্ছি আরো একটু পরে, যখন লালন গুরুর আদেশ অমান্য করে নিজের গাঁয়ে ফিরে আসছে। কিন্তু জাত গেছে বলে তার ঘরে ঠাঁই হয় না। শোকাভিভূত মাকে লালন ছুঁয়ে দেবার উদ্যোগ করতেই মা হাহাকার করে ওঠে, ‘ওরে আমারে ছুঁস নে। তোর জাত গেছে। তুই যবনের হাতে অন্ন খেয়েছিস।’

এরপর পাড়া-পড়শির ভাষ্যে জানা যায়, জাত খোয়ানোর থেকে জান খুইয়ে ফেলাটা লালনের পক্ষে বেহ্‌তর হত। কিন্তু এই সারবত্তাহীন আফসোসে বিক্ষুব্ধ লালন একটা দার্শনিক প্রশ্ন তোলে রাগী গলায়, ‘কেমনে জাত যায়? সে কি শরীর থেকে ফুছ কইরা বাহির হয়ে যায়?’ এবং তার পরেই লালনের ক্রোধান্বিত ঘোষণা: ‘জাত হাতে পালি পোড়াতাম আগুন দিয়া’।

এই সেই বিখ্যাত মুহূর্ত যা লালনের বাকি জীবনের সংগ্রামকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এখন থেকে লালনের জীবনের লক্ষ্য হবে জাত-পাতের মুখে আগুন দেওয়ার চেষ্টা। এর অব্যবহিত পরেই জাত মারার একটি বেশ খোলতাই বাসনা লালনের কৃতকর্মে টের হয়। সে নিজের বউকে তার সাধনসঙ্গিনী হয়ে ‘সাধবাজারে’ ছুটে যাওয়ার জন্য ফুসলাতে থাকে। কিন্তু এই কুকর্মের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে লালনের মা। সে আপন পুত্রবধূর দ্বিধা-থরথর মানসকে গঞ্জনা করে বলছে, ‘ও পোড়াকপালি তোরে যবনে ধরেছে। তুই না হিঁদু বাড়ির বউ। মোসলমানের সঙ্গ নিবি। ও না যবনের হাতে অন্ন খেয়েছে।’

তখন পুনর্বার লালনের রাগ ধরে যায়। সে ‘থাকো তোমাদের জাতধম্ম নিয়ে’ বলে গোস্বা করে চলে যায়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয় প্রশ্নে একটি বড় মিমাংসাতে পৌঁছে যাচ্ছে লালন, যার সংবাদ একটু পরেই আমরা পেয়ে যাবো লালন আর কালুয়ার বাতচিতের মাধ্যমে। জঙ্গলে আকস্মিকভাবে লালনের মুখোমুখি হয়ে হতচকিত কালুয়া প্রশ্ন করছে:

তোমার নামটা কি কও তো?

লালন। (লক্ষণীয় যে, লালনচন্দ্র কর সে আর বলছে না। কিন্তু আগে যে খুব বলত সেটা বেশ গুরুত্ব দিয়ে ভাবার মতো।)

মোসলমান না হিঁদু?

মানুষ। পাগল।

 

লালনচন্দ্র করের মৃত্যু হয়েছে। পৃথিবীতে আর কেউ কোনোদিন জানবে না যে-মানুষটি জাত খোয়ানোর পাপে নিজের বাড়িতে ঠাঁই পায়নি, এককালে তার নাম ছিল লালনচন্দ্র কর। এই নতুন লালন নানাভাবে জাতপাতের বিরুদ্ধে নিজের আপসহীন অবস্থান জানান দিতে থাকে। জঙ্গলের মধ্যে গড়ে ওঠা আনন্দবাজারে সবার জন্য ভাত রান্না করে কমলি। কিন্তু কালুয়া সে-ভাত মুখে তুলতে কবুল হয় না। সে ‘বামনির পাক’ খায় না। এতে তার জাত যায়। কমলি তখন বেশ কায়দা করে লালনকে পুছ করে, ‘আপনারও কি আমার ছোঁয়া খালি জাত যাবে নাকি?’

‘হাতে বুঝি জাত থাকে?’ এই মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ‘পোনা মাছের ঝাঁক’ এসে পড়ায় ছুট মারে লালন। এবং তৎক্ষণাৎ জাতধর্ম-বিদ্বেষী জাতীয় সঙ্গীত রচনা করে ফেলে।

জাত গেল জাত গেল বলে

সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সবই শুধু তা না না

 

জাত-পাতবিরোধী এই দর্শন আনন্দবাজারের সমাজকাঠামোর ওপর গভীর ছাপ ফেলে। তখনকার বাঙালি সমাজ থেকে আনন্দবাজার বিশেষভাবে পৃথক হয়ে পড়ে এই জাত-পাতের প্রশ্নেই। এই সমাজের মধ্যে জাত-পাতের প্রশ্নটি কেমন রূপ পেয়েছিল তার একটি ভালো দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে কমলি ও ভান্তির বাতচিতের মধ্যে। সতীদাহের চিতা থেকে সদ্য রক্ষা পাওয়া ভান্তিকে কমলি বলছে:

দেখরে ভান্তি। ভালো কইরা দেখ। ইরাই আমাদের সগ্গ। এখানে হিন্দু মুসলমান মিলেমিশে থাকে। তোর আবার ছোঁয়াছুয়ির বাতিক নাই তো? আমি তোর জাত মারতি চাইনে।

তুমি কি?

আমি আগে ছিলাম বামুন। এখন আমার খসম মুসলমান। এখানে এমনও আছে হিঁদুও না আবার মুসলমানও না। কিংবা বলতে গেলে দুইই।

 

এভাবে মনের মানুষ ছবিটি হয়ে ওঠে সেকুলার ভাবাদর্শের ভাষ্যকার। লালন ফকির এই ছবিতে সেকুলার নবী হিসাবে নির্মিত হন।

একটু খেয়াল করলে কায়াসাধনা ও লালনের সেকুলার ভাবকল্পের মধ্যে একটি সম্পর্কের সূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর এই দুইয়ের সম্পর্কের মধ্যেই মনের মানুষ ছবিটির দার্শনিক আকাঙ্ক্ষাও কিছু মাত্রায় টের হয়। বহুধাবিভক্ত ভারতের অস্তিত্বের জন্য জাতীয় সংহতি একটি গুরুতর সমস্যা। এই বিচিত্রকে কোনো একটি গভীর ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জন্য ফরজ কাজ। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে, উচ্চবর্গ ও ইতরের মধ্যে যে ফাটল আছে সেটা বুজিয়ে দিয়ে এক ও অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আওয়াজ তোলা ভারতের জন্য জরুরি। এক্ষেত্রে গান্ধীর সেকুলারিজম[১৫] ভারতের জন্য মোক্ষম দাওয়াই। ফলে, সর্বভারতীয় সমাজের কল্পনা নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠায় গান্ধী বিশেষ গুরুত্ব পাবেন তাতে আশ্চর্য কিছু নেই।

আমাদের প্রস্তাব, মনের মানুষ এই ভারতীয় জাতীয়তাবাদী প্রকল্পেরই অংশভাক। এখানে লালন ফকিরকে গান্ধীবাদী ভাবাদর্শের জেবের মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে। মনের মানুষকে তাই ভারতীয় জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের একটি সৃজনী তৎপরতা হিসেবে দেখা দরকার। হরিজন-প্রিয় গান্ধী এবং নিম্নবর্গের ভাবুক লালন এখানে একই ফরাসে উপবিষ্ট। এজন্য অবশ্য মূল্য দিতে হচ্ছে ছেঁউড়িয়ার লালন ফকিরকে। তিনি আত্মবিস্মৃত হয়ে এই ছবিতে অহিংস ভাবের অনুসারী হয়েছেন, এবং কামাচারে ব্রহ্মচর্যকে ব্রত করেছেন। লালনের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় দিকটি এখানে তাঁর অটল ব্রহ্মচর্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এই অটল ব্রহ্মচর্যের পাশাপাশি জাত-পাতবিরোধী দর্শনের মাধ্যমে লালন গান্ধীর তরিকাতে হিজরত করলেন। এবং এর মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী গ্রান্ড ন্যারেশনে সর্বভারতীয় আইকন হিসাবে লালনের প্রতিষ্ঠা ঘটলো। এই প্রতিষ্ঠারই উদযাপন আমরা ঘটতে দেখছি মনের মানুষ ছবিতে।

 

 

৫.

মনের মানুষ ছবির আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই ছবির নতুন নৈতিকতা। এই নিউ টেস্টামেন্ট যে নতুন ভূগোলে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটাই হচ্ছে আনন্দবাজার (অন্য নাম ‘শিমুলতলি’)। ফলে, মনের মানুষের নৈতিক ছাঁচটি বুঝতে আমাদের আনন্দবাজারে প্রবেশ করতে হবে।

প্রথমেই খেয়াল করতে হয়, আনন্দবাজার প্রচলিত সামাজিক পরিসরের বাইরের জিনিস। এটি একটি তৈরি-করা, নতুন প্রণালীর সমাজ। সেকারণেই আনন্দবাজারের ওপর একটু বাড়তি ঝোঁক দিতে চাচ্ছি আমরা। গৌতম ঘোষের ছবিতে এর আগেও আমরা এরকম ‘নতুন সমাজে’র পত্তনি দেখেছি। পদ্মা নদীর মাঝি ছবিতে[১৬] দেখানো হোসেন মিয়ার ‘ময়না দ্বীপ’ একই ধাঁচের নতুন সমাজ। ফলে, নতুন সমাজ গৌতম ঘোষের ছবির একটি রিকারেন্ট থিম।

গৌতমের ছবি থিমেটিক্যালি বোঝার ক্ষেত্রে ‘নতুন সমাজ’ খুব গুরুত্বপূর্ণ সিগনিফায়ার। এই নতুন সমাজের ভাবকল্প থেকেই গৌতম সম্ভবত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসটির দিকে ঝুঁকেছেন। গৌতমের ছবিতে আমরা আনন্দবাজার ঠিক ছেঁউড়িয়ার আখড়া হিসেবে পাচ্ছি না। এখানে বরং ভিন্ন এক ‘লোকেশনে’র নিশান মিলছে। এই ভিন্ন নিশানাটা কীরকম? আমরা এক দফা অনুমান পেশ করছি।

মনের মানুষ ছবিতে লালন ও কমলি

মনের মানুষ ছবিতে লালন ও কমলি

আনন্দবাজার ভদ্রসমাজের মানসলোকের ‘ময়না দ্বীপ’। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গরিব-গুর্বো লোকের আবাদীতে তৈরি হওয়া যে ময়না-দ্বীপের আদিকল্প নির্মাণ করেছেন গৌতমের আনন্দবাজার সেই একই ধাঁচার জনপদ। আমাদের অনুমান: এই নতুন সমাজের আদিকল্পের সঙ্গে নৈতিকতার একটি গভীর সম্পর্ক আছে। সামাজিক নৈতিকতার ধারক, বাহক, প্রচারক ও বাস্তবায়নকারী এজেন্সি হচ্ছে ভদ্রলোক সমাজ, বা আরেকটু বিস্তৃত পরিসরে—মধ্যবিত্ত শ্রেণী। পরিহাসের ব্যাপার হচ্ছে, এই নৈতিক দুনিয়ার মধ্যে সবচে বেশি তড়পায় মধ্যবিত্তের মন। নৈতিকতা মধ্যবিত্ত পরিসরে সবচে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। নিম্নবর্গের জগতে অবশ্য নৈতিকতা এমন অনারোগ্য ব্যাধি হিসেবে হাজির হতে পারে না, তারা দরকার মতো বিধিনিষেধগুলো অভিযোজন করে নেয় (কথাটা মোটাদাগে বলা হচ্ছে। এই অভিযোজন প্রায়োগিক বিচার থেকে ঘটা অভিযোজন নয়, বরং—গৌতম ভদ্র যেমন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন—উচ্চকোটির ভাবাদর্শকে আত্মীকৃত করার নিম্নবর্গের নিজস্ব ধরন)। ফলে, নৈতিক নিয়মগুলোর প্রতি একটা ক্রোধ পুষে রাখে মধ্যবিত্ত সমাজ। এই ক্রোধের ‘আউটলেট’ হিসেবেই সম্ভবত মধ্যবিত্তের ফ্যান্টাসিতে এরকম একটি ইউটোপিয়ার কথা ভাবা হয় যেখানে মানুষের ডিজায়ারের মুখে ঠুলি পরানোর মতো কোনো নৈতিক ব্যবস্থা নাই।

মধ্যবিত্ত বিপ্লবী রূপান্তরের মাধ্যমে বিদ্যমান সমাজ কাঠামো ভেঙে নতুন নৈতিকতার সমাজ গড়তে ভরসা পায় না। ফলে, সমাজের বাইরে নিজের এই ফ্যান্টাসি তালাশ করে। এই মনস্তাত্ত্বিক তল্লাশির ফলাফল হিসেবে জনহীন দ্বীপের ভাবকল্প তৈয়ার হয়। এই নতুন সমাজ তৈরি করবে স্বপ্নদ্রষ্টা হোসেন মিয়া কিংবা লালন ফকির। এই দ্বীপে প্রচলিত সমাজের নিয়ম-কানুন অচল। এই দ্বীপের বাসিনী কমলি বলে, ‘পুরুষ মানুষ যদি দশটা মেয়েমানুষ নিয়ে সংসার করতে পারে, তাইলে আমি কেন পারবো না একটার বেশি পুরুষসঙ্গ করতি?’ কিংবা কপিলা বলে, ‘আমারে নিবা মাঝি লগে?’

ময়না দ্বীপের সঙ্গে আনন্দবাজারের সাদৃশ্য ছবির শুরুর ভাগেই চোখে পড়ে যায়। সমাজের ‘জাত-পাত-মুখী’ আচরণে ব্যথিত হয়ে লালন এক জঙ্গলে এসে হাজির হয়েছে। জঙ্গলের অপূর্ব শোভা দেখে তার জঙ্গলে বসতি করার বাসনা হয়। ‘সমাজ-খেদানো’ লোকজন জড়ো করে এই জঙ্গলকে জনপদ করতে হবে। এই জঙ্গলেই লালনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা হচ্ছে কালুয়ার। কালুয়াও অত্যন্ত হিংস্রভাবে জাত-পাতবিরোধী। জঙ্গল আবাদ করার এই খেয়াল ময়না দ্বীপের হোসেন মিয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।

তবে, এই দুই জনপদের মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য হচ্ছে, এখানে নৈতিকতার পুরাতন পুঁথি ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। আনন্দবাজার সম্পর্কে এই তথ্যটি আমাদের জানা হয়ে যাচ্ছে লালন ও কালুয়ার প্রথম সাক্ষাতেই। কালুয়া দূরে আঙুল তুলে লালনকে বলছে, ‘নদীর ঐ পারে ভদ্দরলোকদের বাস। আর এই পারে তাগো হুকুম, হাকাম, শাসন—কিছুই নাই।’ ছবিতে এরপর ক্রমান্বয়ে এই নতুন সমাজের নতুন নৈতিকতার বিধি ফরশা হতে থাকবে।

এই নতুন সমাজের নৈতিকতার ধাঁচা বুঝতে পদ্মা নদীর মাঝি ছবিতে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ময়না দ্বীপের বাসিন্দা বসিরের বউ কপিলা এনায়েতের সঙ্গে ব্যাভিচার করেছে। ব্যাভিচারের শাস্তি হিসেবে হোসেন মিয়া এনায়েতকে বেঁধে রাখার হুকুম দেয়। কিন্তু গভীর রাতে কুবের মাঝি হতভম্ব হয়ে দেখছে কপিলা এসে এনায়েতকে ভাত তুলে খাওয়াচ্ছে। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই ঘটনা জানতে পেরেও হোসেন প্রতিবিধানের কোনো গরজ করে না। বরং কপিলার বুড়ো স্বামী বসিরকে ময়না দ্বীপ থেকে ভাগিয়ে দেয়।

এই নতুন বিচারের মধ্যে একটা ভিন্ন ধরনের কাণ্ডজ্ঞান আছে। বিবাহের বাইরে নর-নারীর সংসর্গকে পাপ বলে দাগিয়ে রাখার যে জরুরত টিপিক্যাল সমাজে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে উদ্ভুত হয়েছে, হোসেন মিয়ার দ্বীপে তার ভ্যালিডিটি তেমন নাই। নতুন এই দ্বীপ আবাদ করতে শক্তপোক্ত মানুষ চাই। যুবক-যুবতীর রমণের মাধ্যমে সেই নতুন মানুষ জন্ম নেবে, দ্বীপ ভরে উঠবে মানুষে।

আনন্দবাজারের নৈতিকতার প্যাটার্ন কেমন? আমরা কয়েকটি মাত্র দৃষ্টান্ত দেব। শিমুলতলির জঙ্গলে বাসা বাঁধার শুরুতেই একটি নৈতিক সমস্যা উদ্ভুত হয়। লোকালয়ে তীব্র লাঞ্ছনা ও প্রহারের শিকার হয়ে কমলি-কাশেম দম্পতি কালুয়ার কাছে আশ্রয় চায়। কমলি বিধবা ব্রাহ্মণী, কাশেম মুসলমান—হিন্দু মুসলমানে ‘পিরিত’ হয় না এই প্রচলিত নীতির খেলাফ করে তারা অপরাধ করেছে। সমাজ এতে ক্রুদ্ধ হয়ে ‘মাইরে’ কাশেমের ‘মাজা ভাইঙ্গে দিছে’। কালুয়া এই বিচারের ন্যায্যতা বুঝিয়ে বলছে লালনকে, ‘বামনের ঐ বেধবা মাগীটার জন্যই আইজ ওর [কাশেম] এই দশা। বামনের বেধবার সঙ্গে পিরিত করবা! ছি ছি ছি। পিটানি দেবে না তো কি পায়েশ খাওয়াবে?’ তা সত্ত্বেও লালন এই দম্পতিকে আশ্রয় দিতে মনস্থ করে, এবং কালুয়াকে উপদেশ করে, ‘মানুষের বিপদে মানুষই আগায়ে আসে।’

লালনের এই আদেশের মধ্যেই পুরাতন নৈতিকতা থেকে প্রস্থানের পরিষ্কার নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে। আনন্দবাজারের নতুন নৈতিকতা কেমন গড়ন পাবে সেটা এরপর ধীরে ধীরে আমরা জানতে শুরু করবো। এক্ষেত্রে কমলি চরিত্রের প্রতি বিশেষ খেয়াল করা দরকার। কমলি স্বাধীনচেতা মেয়ে। প্রচলিত রতি-ধর্মের প্রতি তার আনুগত্য মোটেই নাই। মন যা চায় তার সায় পেতে সে পুঁথির বিধান খোঁজে না। এই স্বেচ্ছাচারের তাগিদ থেকেই কামার্ত হয়ে কমলি একবার লালনের কাছে আসে, কিন্তু লালন তাতে সায় দিতে পারে না।

অনতিকাল পরে, একটি দৃশ্যে আমরা দেখতে পাবো, কালুয়া গান গাইতে গাইতে ঘরের চালে শন দিচ্ছে। কমলি তখন ভেজা কাপড়ে কাঁখে কলসি করে সামনে এসে ভয়ানক চাউনিতে কালুয়াকে বিদ্ধ করে। এতে কালুয়ার ‘হাতের কাম’ ও ‘মুখের গান’ দুই-ই বন্ধ হয়ে যায়। সে চাল থেকে লাফিয়ে পড়ে কুড়াল দিয়ে ঘরদোর ভাঙতে শুরু করে। লালন ঘটনাস্থলে হাজির হয়েই নিজের করণীয় ঠিক করে ফেলে। সে সঙ্গ-বঞ্চিতা, নিদ্রাকাতর-স্বামীর-প্রতি নালিশপ্রবণ কমলিকে হুকুম দেয়, ‘কালুয়ার নারীসঙ্গ লাগে। আমি চাই তুমি ওর সেবা করো।’ কমলি শুরুতে কিছুটা গাইগুই করে, কালুয়া যে তারে ছেড়ে পালিয়েছিল একবার সেই ব্যাপারে অনুযোগ করে, কিন্তু শেষতক সে রাজি হলো কারণ, ‘তোমার কথা তো আর অমান্য করতে পারিনে।’ এই নূতন প্রণালীর বিচার সাঙ্গ করে লালন ফিরে গেলে কাশেমের করুণ, নালিশ-ভরা চাউনি দেখতে পায় দর্শক।

আনন্দবাজারের নতুন নৈতিকতার ধরন বুঝে নিতে এই ঘটনাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পদ্মাপারের হোসেন মিয়া এবং ছেঁউড়িয়ার লালন ফকির একাকার হয়ে যাচ্ছে। লালনের এই রায়ে দু’ধারি বিচক্ষণতা টের হচ্ছে: এক, নিদ্রালু কাশেম কমলির ‘খসম’ হিসাবে উপযুক্ত নয়; দুই, কালুয়ার ‘জ্বালা’ মেটানোর জন্য কাশেমের পুরুষালি অহম কোরবান করা উচিৎ, কেননা এক নিদানকালে এই কালুয়াকেই আমরা আনন্দবাজারের রাহে শহীদ হতে দেখবো। কাশেমের চাউনি এখানে অবধারিতভাবে ময়না দ্বীপের বসিরের কথা মনে করিয়ে দেবে।

লালন ফকিরের পৌরহিত্যে গড়ে ওঠা এই নূতন প্রণালীর নৈতিকতা প্রথাগত সমাজকে আহ্লাদিত করে নাই। গোড়া থেকেই লালন-পন্থীদের প্রতি এদের মূল আক্রোশ এদের নৈতিকতার ধাঁচা—বিশেষত যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে এদের ভ্রষ্টাচার। বাউলদের এই নৈতিকতার প্রতি ‘নদীর ওই পারে’ যেসব ‘ভদ্রলোক’ বসবাস করে তাদের প্রধান নালিশগুলো কী কী সেটা বুঝতে আমরা একটি ঘটনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। বাউলদের প্রতি বেজায় ক্রুদ্ধ হয়ে পুরুত ও মৌলবির নেতৃত্বে ‘ধর্মপুত্তুর’রা জড়ো হয়েছে। এই বাড়ন্ত ক্রোধের নগদ কারণ হচ্ছে, সতীদাহের মঞ্চ থেকে বাউলরা এক সতীকে অপহরণ করেছে। এই ভয়ানক আঘাতে হিন্দু সমাজ শোকে মূহ্যমান, আর একে উপলক্ষ করে মুসলমান সমাজের মধ্যে জমে থাকা আক্রোশও ফুঁসে উঠেছে। এই দুই পক্ষ বেশ থিয়েটারি সিম্বলাইজেশনের কায়দায় একটি বাঁশের সাঁকোর দুদিকে অবস্থান নিয়ে ‘করণীয়’ প্রসঙ্গে সলা করছে। এসময়ে বাউলদের বিরুদ্ধে তারা যেসব অভিযোগ টানছে তার মাধ্যমেই আনন্দবাজারের নতুন নৈতিকতা সম্পর্কে বেশ ধারণা পাওয়া যায়।

পুরুতের প্রধান অভিযোগ, ‘সালঙ্কারা সতী মা’কে এরা জ্যান্ত পোড়াতে দিল না, ‘গা-ভর্তি গয়না-সমেত’ ফুসলে নিয়ে গেল। মৌলবি তার উত্তরে জানাচ্ছে, ‘গয়নার জন্য দুক্ষু করাটা’ আসলে গৌণ। সে ঝোঁক দিতে চাচ্ছে বাউলদের ‘মাগী-ফুসলানো’র প্রবণতার দিকটাতে। মৌলবি বেদনা-ভরে খেয়াল করছে, তাদের ধর্মের যুবতী-আওরতরা ‘স্বামী ছাড়ে ফকির-ফাকরাদের সঙ্গে পালাতি শুরু করেছে’। এসময় বাউলদের অভিধা করতে গিয়ে একটা খুব গুরুতর কথা শোনা গেল মৌলবির মুখে। বাউল সমাজের জন্য তার অভিধা হলো, ‘ওরা মুতখোর, নাপাক’।

এই দৃশ্যটি নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। বাউল সমাজের বিরুদ্ধে ধর্মতন্ত্র এখানে একাট্টা। আর ধর্মতন্ত্রের আপত্তির ঠিক কলজের মধ্যে আছে যৌনতা বিষয়ক উদ্বেগ। এরা নানারকম ফুসলানি দিয়ে কূলের সতীদের ‘সাধ-বাজারে’ বার করে নিচ্ছে। আরেকটি গুরুতর দিক হলো, মৌলবির মতে, ‘ওরা মুতখোর’। ‘মুতখোর’ কথাটি বাউল সমাজের ‘চারিচন্দ্র-ভেদে’র সাধনাকে ইঙ্গিত করে। অথচ পুরো ছবিতে বাউল সমাজের পরিবেশনার কোথাও এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে তাদের মধ্যে চারিচন্দ্র-ভেদের সাধনা আছে। ফলে, এখানে অর্থ দাঁড়াচ্ছে: বাউল সমাজ আসলে মোটেই ‘মুতখোর’ নয়, ওটা দুষ্ট লোকের রটনা।

এই দুষ্ট লোকগুলোকে বরাবরই ছবিতে একটি বিশেষ রীতিতে রেপ্রিজেন্ট করা হয়েছে। সেকুলার ভাবাদর্শে ‘মোল্লা-পুরুত’ সম্পর্কে যে স্টিরিওটাইপ সচরাচর দেখা যায় এই ছবিতে তার একনিষ্ঠ অনুসরণ লক্ষণীয়। এদের রেপ্রিজেন্টেশনে বেশ থিয়েটারি একটা আবহ আছে। নদীর চরে একদিন মোল্লা ও পুরুত একত্রে এক ‘ন্যাড়া ফকিরের’ ওপর চড়াও হয়, তার একতারা ভেঙে ফেলতে চেষ্টা করে। বাউল সমাজের ‘কালাপাহাড়’ কালুয়া তখন এই ফকিরকে উদ্ধার করে। এই দৃশ্যে মোল্লা-পুরুতকে খুব সার্কাস্টিক্যালি হাজির করা হয়েছে। এদের হাব-ভাব, কথাবার্তা, চালচলন পুরোটাই আগাগোড়া হাস্যকর। বাউলদের কী করে শায়েস্তা করা যায় সে-ব্যাপারে একটু নিভৃতে পরামর্শ করতে পুরুত মৌলবির কিছুটা কাছে ঘেঁষে, তবে হুঁশিয়ার করে দেয়, ‘আপনার ছায়া যেন আমার গায়ের ওপর না পড়ে’। মৌলবি আরেকটু ঘনিষ্ঠ হবার উছিলাতে পুরুতকে ছায়া মাখিয়ে দেয়। এতে পুরুত ঠাকুর হাহাকার করে ওঠে, ‘এইটা কি করলেন! আপনার ছায়া পড়ল যে আমার গায়। এখন গঙ্গাজল পাই কোথায়?’

এটা দুষ্টু লোকের চিত্র আঁকবার চেনা ছক। এরকম ছোট-খাটো ডিটেইলের মাধ্যমেই ফিকশনে অশুভ চরিত্রগুলো শুভ চরিত্র থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। এর একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ আছে মহাভারতের সভাপর্বে। রজস্বলা দ্রৌপদী একবস্ত্রে সভায় এসে উপস্থিত হয়েছে। দ্রৌপদীর নিগ্রহকারীদের অন্যতম হলো দুর্যোধন। দুর্যোধন সম্পর্কে মহাভারতকার এক জায়গাতে লিখছেন, ‘…দুর্যোধন কর্ণের দিকে চেয়ে একটু হেসে বসন সরিয়ে কদলীকান্ডতুল্য তাঁর বাম উরু দ্রৌপদীকে দেখালেন’।[১৭] এই ছবিতে যেখানেই মোল্লা-পুরুতের ডাক পড়েছে সেখানেই দুষ্টু লোক চিত্রায়ণের এই সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ জ্যান্ত।

বাউল সমাজের যৌন নৈতিকতার বিরুদ্ধে প্রধান আপত্তিগুলো আমরা জানতে পারছি আরো কিছুটা পরে—এরকমই একটা জনপরিসরে। ছবির প্রায় শেষদিকে লালন তার ‘গানের দল’ নিয়ে আটঘরিয়া এসেছে। এখানে একটি বাহাছ বা তর্কসভার আয়োজন হয়েছে গানের পাশাপাশি। ‘মুখ্যু-সুখ্যু’ লালনের সঙ্গে তর্ক করতে শাস্ত্রীমশাই ও মৌলবি সাহেব দলবল নিয়ে হাজির হয়েছে। তর্কটা শুরুর ধাপে মোটামুটি শাস্ত্রীয়ই থাকছে। লালনের বিরুদ্ধে শাস্ত্রী মশাইয়ের আপত্তি: লালন বেদ-পুরাণকে খোটা দেয়, মনুর বিধান মানে না। মৌলবির অভিযোগের লিস্টি আরো বড়: মচ্ছবের নামে তারা ‘নাচাগানা’ করে, ‘গাজাভাঙ’ খায় এবং শরিয়ত মানে না। লালন বাহাছের আদব-মতো উত্তর দিতে থাকে। কিন্তু এই ‘ঘুরপথের বাহাছে’ বিরক্ত হয়ে মোল্লা এক মোক্ষম সওয়াল ছুঁড়ে দেয়: ‘আমি হাজেরানা মজলিসের সামনে জানতি চাই—উনি হিন্দু না মুসলমান?’

‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’—এই গান গেয়ে লালন তার উত্তর করার চেষ্টা করে। এর মধ্যে জমিদারের নায়েব এসে বাহাছ থামিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ করে—এবার গান শুরু করা লাগবে। কিন্তু শাস্ত্রীমশাই ক্ষিপ্ত হয়ে ‘হাজেরানা মজলিসে’র সামনে এইসব ‘মুতখোর’ বাউলদের বীভৎস যৌনজীবনকে উন্মোচন করে দেয়। শাস্ত্রীর জবানিতেই শোনা যাক:

আপনারা কি জানেন, উনি [লালন] সতী ধরে নিয়ে গেছেন। আরো কি জানেন, ওনার আখড়ায় ব্রাহ্মণের সাথে মুসলমানের নিকা করানো হয়। ওনারা সব পশুর মতো সহবাস করে। আর এই ফকিরনিগুলি [লালনের ‘গানের দলে’র নারীসদস্যদের দেখিয়ে] সব একেকটা বেবুশ্যে। ঘোর অনাচার।

 

এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে মৌলবি লালনকে ‘ভণ্ড ফকির’ উপাধিতে ভূষিত করে, এবং তার অন্যতম কীর্তি হিসাবে যত পতিত আওরতদের নিয়ে জাহান্নামের আখড়া খোলার কাজটিকে নির্দেশ করে। এই তীব্র অভিযোগের জবাবে বাউলিয়ানার যৌন নৈতিকতা সম্পর্কে বাউলানীদের মুখে স্বীকারোক্তি মিলছে। আমরা কমলির বক্তব্য উদ্ধার করে দিচ্ছি:

আমি ছিলাম কুলীনের বিধবা। দশ সতিনের ঘর করছি। কুলীন পুরুষ যদি দশটা মেয়া মানুষ নিয়ে থাকবের পারে তইলি আমি কেন পারবো না একটার বেশি পুরুষ সঙ্গ করতি? মহাভারতের দ্রৌপদীর কয়ডা স্বামী ছিল? কন, কন আপনারা?

 

কমলির এই স্বীকারোক্তির সঙ্গে শাস্ত্রীমশাই নিজের টীকা জুড়ে দেয়, ‘শুনলেন তো সগ্গলি মাগির কথা। নিজির মুখে স্বীকার করল, নষ্ট মেয়েছেলে। দশ পুরুষের সঙ্গ করে।’

এবার বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। কারা যেন ছুটে এসে ভিড়ের সঙ্গে জোটে। এরপর লালনের গানের দলকে লক্ষ্য করে তীব্র হামলা ও পাথর-নিক্ষেপ শুরু হয়ে যায়। এতক্ষণ শরিয়ত-মারেফত ঘরানার যে বাহাছ চলছিল তাতে জন-চৈতন্যে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি। কিন্তু বাউলদের যৌন নৈতিকতার ‘বীভৎস’ দিকটি উদোম হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ানক প্রতিক্রিয়া ঘটে, যার অন্তিম ফলাফল হিসেবে শহীদ হয় কালুয়া।

এই দৃশ্যগুলো মাথায় রাখলে নতুন ভূগোল হিসেবে আনন্দবাজারের তাৎপর্য বোধগম্য হতে পারে। বাউলিয়ানার প্রতি ভদ্রলোকদের ঝোঁক বরাবরই সিলেক্টিভ। গ্রহণ ও বর্জনের একটি বিশিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল ভদ্রলোকী পরিসরে বাউল সমাজ পরিবেশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের আমল থেকেই আমরা দেখছি কতগুলো ‘বীভৎস’ কৃতকর্ম থেকে এদের রেহাই দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। ডিসকার্সিভ ফরমেশনের এই দিকটি নঞর্থক নির্মিতির। এর ঠিক অন্য পিঠেই রয়েছে সদর্থক নির্মিতি, যেখানে বাউলরা সেকুলারিজমের প্রতিভূ হিসাবে নাজেল হচ্ছে। আর মনের মানুষ ছবিতে গৌতম ঘোষ তাঁর ‘ময়না-দ্বীপ’ আদিকল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলছেন নৈতিকতার এক নতুন নিয়ম। মনের মানুষ ছবিটি এসব গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে বাউলিয়ানার ডিসকার্সিভ ফরমেশনের একটি গুরুতর টেক্সট হয়ে ওঠে।

 

 

৬.

মনের মানুষ চলচ্চিত্রে বাউলিয়ানার যে নতুন নির্মিতি গড়ন পাচ্ছে তার একটি গুরুতর দিক আনন্দবাজার। এরই সহগ হিসেবে লালন ফকিরের নির্মিতির দিকেও খেয়াল দেয়া দরকার। লৌকিক সাধক হিসেবে লালনকে ঘিরে যে রহস্য ও মহামানবের বাতাবরণ গড়ে উঠেছে সেটা ভেঙে দেবার চেষ্টা আছে এই ছবিতে। লালনকে এখানে নিরলংকরণ করা হয়েছে। বাউল তরিকার ছিলছিলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে লালনকে আধুনিক অর্থে ‘ব্যক্তি’(Individual) হিসাবে হাজির করা হয়েছে। একেবারে নিজস্ব, স্বয়ম্ভূ প্রতিভার বলেই লালন বাউলিয়ানার প্রতীক ও চূড়া। লালনের গানকেও সচেতনভাবে ডিমিস্টিফাই করার চেষ্টা আছে ছবিতে। এসব ‘গান’ ভাব-সমাধির ফল নয়, বা কোনো গূহ্য তরিকাতেও রচিত হয়নি। লালন নিজের চারপাশ থেকেই এসব গানের প্রেরণা পেয়েছে। চারপাশ বলতে অবশ্য বিশেষ অর্থে কমলিকেই বুঝতে হচ্ছে। কমলির কথার ধরতাই ধরে একাধিকবার ‘পোনা-মাছের ঝাঁক’ এসেছে লালনের কাছে।

লালনের কয়েকটি গুরুতর দিক নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা হয়েছে। পদ্মা নদীর মাঝির হোসেন মিয়ার সঙ্গে লালনের বেশ কিছু সাদৃশ্য গুরুত্বপূর্ণ। লালন এক স্বপ্নদ্রষ্টা পুরুষ। ফ্রেডরিখ নিৎশে-র ‘ওভারম্যান’-এর (Übermensch) মতোই এই দুটি চরিত্র সমাজের প্রচলিত দাসের নৈতিকতা বা দঙ্গলের মূল্যবোধকে ছাড়িয়ে গেছে। তারা পত্তন করেছে নতুন সমাজ, আর প্রণয়ন করেছে সেই সমাজের নতুন বিধান। লালন প্রণীত এই নতুন মূল্যবোধের প্রধান ভরকেন্দ্র দুটি: এক, জাত-পাতের ‘ক্রিটিক’ হাজির করা; দুই, নিজের জন্য ব্রহ্মচর্য আর অপরের জন্য যৌনতৃপ্তির বন্দোবস্ত করা।

লালনের রেপ্রিজেন্টেশনের একটি বেশ গুরুতর দিক লক্ষ্য করেছেন আ-আল মামুন।[১৮] তিনি দেখিয়েছেন, ‘গৌতম ঘোষের লালনকে নির্মাণ করা হয়েছে ভারতীয় “হিন্দু” মুনিঋষিদের অনুকরণে, মুসলিম ধারার সুফি-দরবেশদের অনুকরণে নয়।’ লালন জন্মসূত্রে আদৌ হিন্দু কি মুসলমান ছিলেন সেটা খুবই বিতর্কিত বিষয়।[১৯] অথচ এই ছবিতে লালনকে নিঃসংশয়ে লালনচন্দ্র কর হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এমনকি লালন নিজের ‘চন্দ্র কর’ত্ব হারিয়ে নতুন জীবনে প্রবেশ করার পরেও নিয়ম করে শাঁখ বাজাতে থাকে। এই রেপ্রিজেন্টেশনের মাধ্যমে লালনের জাত-পাতের বিচার নিয়ে ভদ্রলোক সমাজে প্রায় একশ বছর ধরে চলতে থাকা নন-সেকুলার ঝগড়া-ঝাটি নবপ্রাণ লাভ করলো।

আরেকটি বেশ দরকারি দিক হলো আধুনিক শিল্পী হিসাবে লালনের নির্মিতি। বাংলার ভাবান্দোলন সম্পর্কে প্রাথমিক জানাশোনা থাকলেই এটা বুঝতে পারা কঠিন নয় যে, লালন বাউল তরিকার মন্ত্রদ্রষ্টা নন। উনিশ শতকে গোটা বাংলা জুড়ে যে একটা লৌকিক ভাবান্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল সেই আন্দোলনের মধ্যেই জন্মেছেন লালন ফকির। মঞ্জুরুল হক পান্না মনের মানুষ ছবির ওপর লেখা প্রবন্ধে জানাচ্ছেন, ‘উনিশ শতকের নদীয়ার ভাবের ইতিহাসের মধ্যেই লালনের পরিচয়। সেই সময় নদীয়াতে দেলবার সাঁই, পাঞ্জু সাঁই, জহুরদ্দি সাঁই, যাদুবিন্দুসহ আরো অনেক ভাবুকের আবির্ভাব ঘটেছিল।’[২০]

মুশকিল হলো, লালনকে ঠিক কোনো অর্থেই আধুনিক ব্যক্তি মানুষ ভাবার উপায় নেই। তিনি বাউল ভাবাদর্শের কুয়া থেকেই জল তুলেছেন। বাউলিয়ানা তাঁর উদ্ভাবন নয়, তিনি এই পথের পথিকমাত্র। সাধনা ও মুক্তি সম্পর্কে যেসব ধারণা তিনি নিজের গানে তুলে ধরেছেন সেগুলো স্বাধীন নয়, বাউল ডিসকোর্স দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেমন: চারিচন্দ্র ভেদ। বাউল ডিসকোর্সে ইতিমধ্যেই এই কনসেপ্টটি বিদ্যমান থাকার মাধ্যমেই তাঁর চিন্তার গতিমুখ অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে, তিনি যে মুক্তির পথে হাঁটবেন সেই পথ নির্ধারিত হয়ে গেছে। এই চারিচন্দ্রের সাধনাকেই তিনি নিজের গানে আরো পোক্ত করেছেন, চিত্রায়িত করেছেন, বিনির্মাণ করেছেন।

গৌতম এই লালনকে মোটেই দেখতে পাননি। তাঁর ছবিতে পরিবেশিত লালন ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী, নির্জনতাপ্রিয় আধুনিক গীতিকবি। বাংলার ভাবপরিমণ্ডল এই লালনকে গড়ে তোলে নাই। এই লালন স্বয়ম্ভু।

 

 

৭.

গৌতম ঘোষ তাঁর ছবিতে বাউলিয়ানার যে ভদ্রলোকি ডিসকোর্স নির্মাণ করেছেন তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে আমরা এবার নজর দিচ্ছি। এই ছবির বয়ানে বাউল সমাজের শত্রু-মিত্র শনাক্ত করার একটি জরুরি দিক পাওয়া যাচ্ছে। বাউলের মিত্র হিসাবে কাদের কথা আমাদের জানাচ্ছেন গৌতম ঘোষ?

ছবির প্রথম দৃশ্যে আমরা লালনকে আবিষ্কার করছি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৌখিন বোটে। জ্যোতিরিন্দ্র লালনের ছবি আঁকছে। পাশাপাশি বাউল দর্শন বুঝে নিতে নানারকম প্রশ্ন করছে লালনকে। পদ্মার বোটে জ্যোতিরিন্দ্র-লালনের বাতচিতের ফ্রেমের মধ্য দিয়েই আমরা পুরো ছবির গল্পটা শুনছি। গৌতম লালন ফকিরের গল্প বলতে গিয়ে ঠাকুরবাড়িকে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন। ফলে, এই ঠাকুরবাড়ির আঙিনাতে বলা গল্পে ঠাকুরবাড়ির কিছু কীর্তি বাদ পড়লো, কিছু অজ্ঞাত কীর্তির সংবাদ জানা হলো।

ছবিতে নানা প্রসঙ্গে ঠাকুরবাড়ির কথা উঠেছে। কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফ হোসেনের মুখেই প্রথম বাঊলরা জানতে পারছে, যে-জঙ্গলে তারা বসতি করেছে তার মালিকানা ঠাকুরবাড়ির হাতে। হরিনাথের জবানিতে জানা যাচ্ছে, এই ঠাকুরবাড়ির জমিদাররা খুবই ‘শিক্ষিত এবং সম্ভ্রান্ত’ হলেও ‘খাজনা আদায়ের বিষয়ে ভীষণ কঠোর’। এই দুই ভদ্রলোকের পরামর্শ মোতাবেক বুড়ো বয়সে লালন এসে জ্যোতিরিন্দ্রের দুয়ারে ধর্না দিয়ে নানা তত্ত্বকথা বলে, গান-বাজনা শুনিয়ে তাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করছে। জ্যোতিরিন্দ্র এই মহান সাধকের গুণপনাতে অভিভূত হয়ে খাজনা আদায়ে ‘কঠোরতা’র ব্যাপারে যে পারিবারিক ঐতিহ্য আছে সেটি বিস্মৃত হল, এবং নায়েবকে হুকুম দিল, করমুক্ত হিসেবে ফকির সাহেবের গ্রামকে পাট্টা লিখে দিতে হবে।[২১] লালনের আখড়া সম্পর্কে এই হলো মনের মানুষের ভাষ্য।

কিন্তু এই ভাষ্য কোনো ঐতিহাসিক তথ্যেই সমর্থিত হচ্ছে না। লালনের আখড়া সম্পর্কে সুধীর চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, ‘ছেঁউড়িয়াতে শিষ্য মলম শার দানকৃত ১৬ বিঘা জমির উপর লালনের আখড়া নির্মিত হয়।’[২২] অথচ সিনেমাতে একে ঠাকুরবাড়ির জঙ্গল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো। নিম্নবর্গের নিজস্ব জমিনের উপর দাঁড়িয়ে নিম্নবর্গের ভজন-সাধনের একটি বিশিষ্ট, এবং পরবর্তীকালে, বিখ্যাত মার্গকে কেন এই রেপ্রিজেন্টেশনে ঠাকুরবাড়ির দহলিজে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে—সেটা জরুরি প্রশ্ন বটে। এটা মোটেই নতুন কথা নয় যে, লালনকে উচ্চবর্গের পৃষ্ঠপোষকতার কাছে ভীষণভাবে ঋণী করে দেখানোর একটা চল হয়েছে। জ্যোতিরিন্দ্র নিজের বোটে বসিয়ে লালনের ছবি আঁকছে, বিদেশি সিগ্রেট ফুঁকতে দিচ্ছে, মিনতি করছে যেন আনন্দবাজারে তার জন্যও একটুকরো জমিন রাখা হয়, নিষ্কর বলে পাট্টা লিখে দিচ্ছে—এই উদার সাক্ষাৎকারের পুরোটাই ঠাকুরবাড়ির কল্পিত মহত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। লালনের আখড়া প্রতিষ্ঠা করতে সহায় হয়েছিল মূলত কারিকর সম্প্রদায়—এটা বিতর্কিত কোনো তথ্যও নয়। অথচ এই ছবিতে পুরো কৃতিত্ব ঠাকুরবাড়ির মাথায় তুলে দেওয়া হচ্ছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, মনের মানুষ ছবিতে কাঙাল হরিনাথের ‘ডায়লগ’ হিসাবে তাঁর অপ্রকাশিত ডায়েরি থেকে বেশ কিছু কথা সরাসরি বসানো হয়েছে। এই কেটে বসানোর ঝোঁকটা বেশ খেয়াল করার মতো। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে যেসব কঠিন কথা হরিনাথ নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন সেগুলো বেশ চোখে বেঁধার মতো করে এই ছবিতে বাদ দেওয়া হয়েছে।[২৩]

মনে রাখতে হবে, যা প্রকাশ হলো এবং যা বাদ পড়লো—এই দুইয়ের সমন্বয়ে অর্থ তৈয়ার হয়। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে লালন ও হরিনাথের সম্পর্ক এই ছবিতে আংশিক উন্মোচিত, এবং কতকটা কল্পিত, বাকিটা চাপা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ঠ ঠাকুরবাড়ির জন্ম হলো, ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে এদের সম্পর্কেরও একটি বিশেষ রূপ নির্মিত হলো। আবার, এই নেবার ও বাদ দেবার ধরন থেকেই ‘ইনটেনশন’ স্পষ্ট হয়।

প্রচলিত ভদ্রলোকের ডিসকোর্সের সঙ্গে এই ছবিতে নির্মিত ঠাকুরবাড়ির একটি সাদৃশ্য আছে। ঠাকুরবাড়ি সম্পর্কে এদের মত, নায়েব-কর্মচারীরাই যত নষ্টের গোড়া, জমিদার নয়। ঠাকুরবাড়ির জমিদাররা ভাবুক প্রকৃতির এবং স্টেটের ভালো-মন্দের প্রায় বাইরে এদের বসবাস। প্রজাদের সঙ্গে যা কিছু অন্যায় করা হয় তার অংশভাক স্বয়ং জমিদার নয় কখনোই। কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া গার্মেন্টস কন্যা ছবিতেও[২৪] এই একই ন্যারেশন দেখা যাবে। গার্মেন্টেস শ্রমিকের দুর্ভোগের জন্য ঠিক মালিক পক্ষ দায়ী নয়, মধ্যস্ততাকারী পক্ষগুলোই হলো মূল কালপ্রিট।

মনের মানুষ ছবিতে এই ছিলছিলাতেই ঠাকুরবাড়িকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বইতে হরিনাথের বাড়িতে ঠাকুরবাড়ির লাঠিয়ালদের চড়াও হওয়ার সংবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু গৌতম তাঁর ছবিতে এই অংশটি বাদ দিয়েছেন।[২৫]

বাউলিয়ানার শত্রু হিসাবে এই ছবিতে সগৌরবে ধর্মতন্ত্রকে চিত্রিত করা হয়েছে। সেকুলারিজমের শত্রু ও বাউলের শত্রু এই ছবিকে পুরোপুরি আইডেন্টিকাল। এই মৌলবাদী গোষ্ঠীর কবল থেকে নিজেদের জান-মালের হেফাজত করতে হরিনাথের পরামর্শে বাউলরা লাঠি ধরে। নিরীহ পশুপাখিদের ভয় দেখাতে রণ-পা চড়ে জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করে। আমরা এই ছবিতে যেসব সংঘাতের ঘটনা জানতে পারছি তার সবগুলোতেই প্রতিপক্ষ আদি ও অকৃত্রিম মৌলবাদী শক্তি। সংঘাতের ঘটনাগুলো পর পর মনে করা যাক: এক, মনিরুদ্দি বয়াতির ওপর মোল্লা-পুরুতের যৌথ প্রতীকী হামলা; দুই, সতীদাহ প্রতিরোধ ও ‘গয়নাসমেত’ সতী অপহরণ; তিন, আটঘরিয়ার বাহাছ চলাকালে শত্রুপক্ষের হামলা ও কালুয়ার শাহাদাৎ-বরণ।

এসব ছোট-বড় সংঘাতের মধ্য দিয়ে বাউল সমাজের পরম মিত্র হিসেবে ঠাকুরবাড়ি এবং জন্মের শত্রু হিসাবে মৌলবাদী শক্তিকে নিঃসংশয়ে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়।

 

 

৮.

গৌতম ঘোষের মনের মানুষ ভদ্রজনের চিত্ত হরণ করেছে। অনেকেই মুগ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আনিসুজ্জামান, তপন রায়চৌধুরী—এরকম বোদ্ধা ব্যক্তিরা এই ছবি দেখে অভিভূত। আমরা ছবির এসথেটিকেল দিকটি নিয়ে মোটেই আলোচনা করিনি। সেটা এখানে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বলে রাখা জরুরি যে, এসথেটিক ও চিত্র-ভাষ্যের দিক থেকে দেখতে গেলে, মনের মানুষ একটি অসামান্য সিনেমা। ছবিটি অসংখ্য শৈল্পিক মুহূর্ত তৈরি করেছে, আর ছবির চিত্রভাষার তারিফ করতেও আমরা বাধ্য। কিন্তু আমরা ঠিক সেই আলোচনা এইখানে তুলি নাই। আমরা কেবল দেখাতে চেয়েছি, ভদ্রজনের ডিসকোর্সে বাউলিয়ানা কীরকম রূপ পরিগ্রহ করছে। আশা করা যায়, এই দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে সেটা কিছুদূর পর্যন্ত স্পষ্ট করা গেছে।

 

 

লেখকের নোট

এই লেখার জন্য আমি আ-আল মামুন, শাশ্বতী মজুমদার, সাখাওয়াত টিপু, সুমন রহমান ও আলীম আজিজের কাছে বিশেষভাবে ঋণী। তবে লেখায় প্রকাশিত মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণ আমার।

 

 

তথ্যসূত্র ও টীকা

১.    অক্ষয় কুমার দত্ত, ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, প্রথম ভাগ, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা, ১৪০৯ বঙ্গাব্দ

২.    মৌলবী আবদুল ওয়ালীর ‘অন কিউরিয়াস টেনেট্স অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস অব এ সারটেন ক্লাস অব ফকিরস ইন বেঙ্গল’ শিরোনামের এই নিবন্ধটি প্রথমে ছাপা হয়েছিল দি জার্নাল অব দ্য অ্যানথ্রোপলজিক্যাল সোসাইটি অব বোম্বে-র ১৯০০ সালের পঞ্চম খণ্ডে। পরে সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ব্রাত্য লোকায়ত লালন (পুস্তক বিপণি, কলকাতা, ২০০৭) গ্রন্থে রচনাটি পূনর্মুদ্রণ করেছেন।

৩.    মৌলবী আবদুল ওয়ালী, প্রাগুক্ত।

৪.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘শিক্ষার বিকিরণ’, ‘শিক্ষা’র সংযোজন অংশে সংকলিত। লিংক:  http://www.rabindra-rachanabali.nltr.org/node/15092

৫.    ক্ষিতিমোহন সেন, বাংলার বাউল, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৩

৬.    ছবির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আমরা এই আলোচনার বাইরে রেখেছি। কারণ সামগ্রিকভাবে মনের মানুষ ছবির একটি ক্রিটিক রচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা কেবল দেখতে চেয়েছি, এই ছবিতে বাউলিয়ানার নির্মাণ। ফলে, কালচার ইন্ডাস্ট্রির একটি পণ্য হিসেবে এই ছবির নির্মিতির দিকটি আমাদের আলাপের বাইরে থাকছে। এই ছবিটির একটি নারীবাদী পাঠ তৈরি করা দরকারি কাজ। বিশেষত, এরোটিক অবজেক্ট হিসেবে নারীর পরিবেশন, এক্সোটিক লোকেশন—এসবের মাধ্যমে ভিজুয়াল প্লেজার উৎপাদন করার যে সচেতন খেয়াল এই ছবিতে আছে সেদিকটা নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। এব্যাপারে কিছু কিছু আলোচনা ইতিমধ্যেই হয়েছে, তবে বিষয়টি আরো আলোচনার দাবি রাখে।

এই প্রসঙ্গগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য দেখুন, কল্লোল মোস্তফা, ‘গৌতম ঘোষের “মনের মানুষ”: জাতহীনের জাত মারার তরিকা’, ফেসবুক নোট আকারে প্রকাশিত। আরো দেখুন, মনের মানুষ ছবিটি নিয়ে আর্টস বিডিনিউজের আয়োজনে আর্টস বৈঠক। এই বৈঠকের অংশবিশেষ পড়তে এই লিংক দেখুন: http://arts.bdnews24.com/?p=4220

৭.    চরিত্রের ক্ষেত্রে ‘সে’ সম্বোধন ব্যবহার করা হয়েছে। লালন সম্পর্কে যেখানে ‘আপনি’ সম্বোধন ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে ঐতিহাসিক লালনকে ও যেখানে ‘তুমি’ সম্বোধন হয়েছে সেখানে ফিকশনাল লালনকে বুঝতে হবে।

৮.    সংলাপ উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে শ্রুতির ওপর নির্ভর করা হয়েছে। ফলে, কোথাও কোথাও গৌণ ত্রুটি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরকম ত্রুটির ঝুঁকি নিয়ে লেখাটি প্রকাশ করতে হলো বলে দুঃখপ্রকাশ করছি।

৯.    মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০১০

১০.    মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, প্রাগুক্ত

১১.    রাজকুমারী অমৃত কউরকে লেখা মহাত্মা গান্ধীর চিঠি। চিঠির যে অংশটি এখানে উদ্ধৃত হয়েছে সেটি নেয়া হয়েছে স্ট্যানলি ওলপার্টের গান্ধীস প্যাশন: দি লাইফ অ্যান্ড লিগ্যাসি অব মহাত্মা গান্ধী (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০২) গ্রন্থ থেকে।

১২.    শক্তিনাথ ঝাঁ, ফকির লালন সাঁই: দেশ, কাল এবং শিল্প, সংবাদ, কলকাতা, ২০০৭

১৩.    ২৩ ডিসেম্বর ২০১০ বিবিসি বাংলাতে মনের মানুষ ছবির ওপর মনীষা বসুর একটি অডিও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এখানেই ছবিটি নিয়ে কথা বলেন গৌতম ঘোষ। তাঁর কথার রেকর্ড শুনতে এই লিংকে দেখুন:http://www.bbc.co.uk/bengali/multimedia/2010/12/101223_mk_moner_manush.shtml?

১৪.    বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ন্যারেশন তৈরি হচ্ছে লালনকে দিয়ে। আর ভারতবর্ষে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে, এই ন্যারেশন তৈরি হচ্ছে আরো বড় পরিসরে। ভারতবর্ষের নানা জাতি, ধর্ম, বর্ণের মানুষকে অভিন্ন জাতীয়তাবাদী ন্যারেশনে জড়ো করতে লালন ফকির আইকন হয়ে উঠতে যাচ্ছেন।

১৫.    মহাত্মা গান্ধী তাঁর লেখালেখি ও জীবন-যাপনের মধ্যে বহুবার নিজেকে সাচ্চা সেকুলার হিসেবে হাজির করেছেন। এক্ষেত্রে একটি মাত্র উদ্ধৃতিই যথেষ্ট হবে। ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বরে গান্ধী একজন খ্রিস্টান মিশনারিকে বলছেন:

আমি যদি একনায়ক হতাম তাহলে ধর্ম ও রাষ্ট্র পৃথক হত। আমি আমার ধর্মের নামে শপথ করে বলছি। আমি এর জন্য মরতেও প্রস্তুত। কিন্তু এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্র আপনার ইহজাগতিক কল্যাণ, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বৈদেশিক সম্পর্ক, মুদ্রাব্যবস্থা এবং এরকম আরো অনেক কিছুরই দেখভাল করবে, কিন্তু আপনার কিংবা আমার ধর্ম কিছুতেই নয়। সেটা প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার।

(If I were a dictator, religion and state would be separate. I swear by my religion. I will die for it. But it is my personal affair. The state has nothing to do with it. The state would look after your secular welfare, health, communications, foreign relations, currency and so on, but not your or my religion. That is everybody’s personal concern!)

উদ্ধৃত হয়েছে দি হিন্দুর ২২ অক্টোবর, ২০০৩ সংখ্যাতে। এই লিংকে পাওয়া যাবে:http://www.hindu.com/2003/10/22/stories/2003102200891000.htm

এখানে অবশ্য এটাও মনে রাখা অত্যন্ত জরুরী যে, ধর্ম আর রাষ্ট্রের সম্পর্ককে গান্ধী মোটেই ইউরোপীয় লব্‌জ দিয়ে বোঝেননি। সেকুলারিজম সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ছিল, যাকে আশিস নন্দী বলেছেন ‘ভারতীয় ধরন’।

১৬.    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে পদ্মা নদীর মাঝি ছবিটি নির্মাণ করেছেন গৌতম ঘোষ। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় ১৯৯৩ সালে ছবিটি মুক্তি পেয়েছে।

১৭.    [সারানুবাদ] রাজশেখর বসু, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারত, এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিঃ, কলকাতা, ১৪১০

১৮.    আ-আল মামুন, ‘বেশরা ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে ভদ্দরলোকদের সূক্ষ্ম প্রেমের মর্ম বোঝা ভার!!’, লেখাটির জন্যে এই লিংক দেখুন: http://arts.bdnews24.com/?p=4041

১৯.    এই বিতর্কের একটি অসাধারণ বিবরণের জন্য দেখুন সুধীর চক্রবর্তীর ব্রাত্য লোকায়ত লালন

২০.    মঞ্জুরুল হক পান্না, ‘লালন ফকিরের মনের মানুষ বনাম গৌতম ঘোষের মনের মানুষ’, ফেসবুক নোট আকারে প্রকাশিত।

২১.    এবিষয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন শক্তিনাথ ঝাঁ। তাঁর ফকির লালন সাঁই: দেশ, কাল এবং শিল্প গ্রন্থে তিনি লিখছেন:

আবুল আহসান চৌধুরীর গ্রন্থ-উদ্ধৃত লালনশিষ্য মনিরুদ্দীনের আবেদনপত্রটি থেকে জানা যায় যে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লালনের আখড়াকে নিষ্কর করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।…

…লালনের মৃত্যুর পর আখড়াবাসী শিষ্য ভোলাই মানিক, শীতলের সঙ্গে বাইরেকার মনিরুদ্দীন প্রমুখের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। জমিদারদের দিয়ে সমাধি বাঁধানোর চেষ্টা করেছিলেন মনিরুদ্দীন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে জমিদাররা এতে কোনো সাহায্য করেননি। অনুরাগী শিষ্যদের সাহায্যে ভোলাই প্রমুখ এ সমাধিটি পাকা করেন। আর ভোলাই মানিক, শীতলের মৃত্যুর পর আখড়ার অনেক খাজনা বাকি পড়ে, এবং জমিদারগণ ১৯৪৫-এর ডিসেম্বরে খাজনার জন্য আখড়াটি নিলামে তোলেন। লালনের শিষ্যরা ১শত ৭ টাকা ৪ আনা দিয়ে নিলামে সম্পত্তি খরিদ করে আখড়ার অস্তিত্ব রক্ষা করেন। এ বিষয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

২২.    সুধীর চক্রবর্তী, প্রাগুক্ত

২৩.    সুধীর চক্রবর্তী, প্রাগুক্ত

২৪.    কিছুদিন আগে মুক্তি পেয়েছে জি সরকারের বানানো গার্মেন্টস কন্যা (২০১১)। ছবিতে অসহায় একজন নারী বাধ্য হয়ে গার্মেন্টসে কাজ নেয়। কিন্তু সেখানকার এক কর্মকর্তা তাকে যৌন হয়রানি করতে চেষ্টা করে। এর প্রতিবাদে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসে। পরিস্থিতি সামলাতে মালিক এসে উপস্থিত হয়। সে প্রথমে এই নিপীড়িতা নারীর প্রেমে পড়ে, তারপর নিপীড়ক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে, এবং দয়িতাকে গার্মেন্টসের ম্যানেজার করে দেয়।

২৫.    মনের মানুষ উপন্যাসের সঙ্গে কোথায় কোথায় মনের মানুষ ছবিটি পৃথক হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেটাও বেশ কৌতূহলকর এক আলোচনা। আমরা সেই আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছি। কারণ এরকম তুলনামূলক আলোচনা সাহিত্য দিয়ে সিনেমা বোঝার ভুল প্রকরণের দিকে ছুটতে পারে।

LEAVE A COMMENT