বানান হয়ে ওঠা সময়

হুমায়ূন আহমেদের একটি গল্প ‘পাপ’

হুমায়ূন আহমেদের একটি গল্প ‘পাপ’

মোহাম্মদ আজম
Azam Edit Pic

গল্পটা আকারে ছোট। কলকাতার নয়া উদ্যোগ প্রকাশনী থেকে হুমায়ূনের একটা গল্প-সংকলন বেরিয়েছে স্বনির্বাচিত গল্প নামে। এ সংকলনে দেখছি, ‘পাপ’ পৃষ্ঠা পাঁচেক জায়গা নিয়েছে। একেবারেই সাদামাটা সরল ভাষা। খুব মনোযোগ না দিয়েই – হুমায়ূনের অন্য অনেক লেখার মতো –  পড়ে ফেলা যায়। তাতে হয়ত চোখেই পড়বে না, কত বিচিত্র লীলা এই ছোট্ট বয়ানটি নিজের শরীরে লুকিয়ে রেখেছে। ঘটনাটা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের। যুদ্ধের কালেই কেবল এ ধরনের গল্প পয়দা হতে পারে। অন্য সময়ের গল্প অন্যরকমের হয়। এই গল্পকে ঘিরে একপ্রস্ত হুমায়ূন-পাঠই আমাদের বর্তমান লেখার উদ্দেশ্য। বিস্তারে যাওয়ার আগে মূল গল্পটা সংক্ষেপে বলে নেয়া যাক।

গল্পকথক মাধবখালি ইউনিয়নের ধলা গ্রামে প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করতেন। যুদ্ধের সময় তার বউ ছিল সন্তানসম্ভবা। ধলা গ্রামটা খুব ‘ভিতরের দিকে’ হলেও জুন মাস থেকে সেখানে যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাশের কাঞ্চন নদীতে পাক বাহিনীর গানবোট চলাচল শুরু হয়। মাধবখালি ইউনিয়নে মিলিটারি ঘাঁটি করে। শুরু হয় অত্যাচার-নির্যাতন। জুলাই মাসের শেষের দিকে মুক্তিবাহিনী দেখা দেয়। প্রথমে টুকটাক আক্রমণ। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে ‘রীতিমত যুদ্ধ’। এ রকম এক যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর তরুণেরা ‘কাঞ্চন নদীতে মিলিটারীর একটা লঞ্চ ডুবায়ে দিল’। পাক বাহিনীর এক অল্পবয়সী অফিসার কোনোভাবে নদীর কূলে উঠে আসে। আশ্রয় নেয় গল্পকথকের ঘরে। তিনি অবশ্য এ খবর জানতেন না। দুইদিন পরে এক ঝড়জলের রাতে তার পোয়াতি বউ তাকে ডেকে কিরা-কসম কাটিয়ে কথা আদায় করে যে, তার কথামতো একটা কাজ করে দিতে হবে। মাস্টার সাব অগত্যা সম্মত হন। তখন বউ তাকে ভাঁড়ার ঘরে লুকিয়ে রাখা শত্রুবাহিনীর অফিসারটিকে দেখায়। বলে, ছেলেটি তাকে ‘বহেনজি’ ডেকেছে। সে তাকে আশ্রয় দিয়েছে। বাঁচাবে বলেছে। এখন তাকে মাধবখালি মিলিটারি ক্যাম্পে পৌঁছে দিতে হবে। গল্পকথক নিরীহ মানুষ। সে পড়ে বিরাট মুসিবতে। বউকে কথা দিয়েছে। কিন্তু শত্রুপক্ষের এই জোয়ানকে মিলিটারি ক্যাম্পে পৌঁছে দিলে খবরটা জানাজানি হবে। তাকে মুক্তিবাহিনী ছাড়বে না। দেশের মানুষের কাছে তার পরিচয় হবে রাজাকারের। দেশদ্রোহী হয়ে তাকে মরতে হবে। গল্পকথক আগপাছ ভেবে মিলিটারি ক্যাম্পে গেল না। খবর দিল মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে। সে রাতেই ছেলেটিকে ‘গুলি করে মারা হল’।

না, স্ত্রীর তীব্র ঘৃণা তাকে পোহাতে হয় নাই। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সে মারা যায় অল্পদিন পরেই। কিন্তু নিজের কাছেই সে অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। তার কোনো সন্দেহ নাই যে সে পাপ করেছে। ভয়ংকর পাপ। কিন্তু সেই পাপের ধরন সম্পর্কে সে নিশ্চিত হতে পারে না। আর কী করতে পারত, সে জিজ্ঞাসা নিয়েই সে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে।

খুবই ব্যক্তিগত গল্প। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা ছাড়া এ ধরনের ঘটনার জন্ম হয় না। যুদ্ধ একটা বড় ঘটনা। তার নিজস্ব হিসাব-নিকাশ আছে। জয়-পরাজয় আছে। রাজনীতি-সমরনীতির জটিলতা আছে। ব্যক্তিগত জীবন অবশ্যই তার বাইরের নয়। এমনকি জড়াতে না চাইলেও ব্যক্তি এ ধরনের ঘটনা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে না। তবুও যুদ্ধের সামগ্রিক বাস্তবতা আর পৃথক ব্যক্তির জীবনে তার প্রভাব এক জিনিস নয়। লেখক এই সুবিধাটাই নিয়েছেন। বিশাল-বিচিত্র-জটিল মুক্তিযুদ্ধ থেকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বেছে নিয়েছেন। ঘটনাটি ব্যক্তির জন্য মর্মান্তিক। ব্যক্তিগত জীবনকে ওলটপালট করে দিয়ে একটি দার্শনিক প্রশ্ন হাজির করার জন্য যথেষ্ট। যুদ্ধের বাস্তবতা আর মহিমাকে যথোচিত পরিসর দিয়েই লেখক ব্যক্তিগত ফিরিস্তির সুযোগ করে নিয়েছেন। সেদিকটা একবার দেখে আসা যাক।

বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ কী রূপে উপস্থিত হতে পারে, তার একটা পরিচ্ছন্ন ছবি আছে এ গল্পে। তুলির দুচার আঁচড়ে নিখুঁত ছবি ফুটিয়ে তোলায় হুমায়ূন বরাবরই পারদর্শী। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নদীমাতৃক এই গ্রামে মিলিটারি এসেছে নদীপথে। জুন মাসের দিকে। কাঞ্চন নদীর এক পাশে ধলা গ্রাম – গল্পকথকের বাড়ি। অন্য পাশে চর হাজরা। জুন মাসের উনিশ তারিখে চর হাজরায় মিলিটারি আসে। গ্রামের মাতবর ইয়াকুব আলী মিলিটারীদের যথাসাধ্য সমাদর করেন। খাসি জবাই করে খাওয়ান। যাওয়ার সময় তারা মেজবানের দুই মেয়ে আর ছেলের বউকে তুলে নিয়ে যায়। তারা আর ফিরে আসেনি। এ ঘটনায় পুরা এলাকার মানুষ ভয়ে অস্থির হয়ে ওঠে। জুলাই মাসে দেখা দেয় মুক্তিবাহিনী। তারা ছোটখাট অপারেশন চালাতে থাকে। কিন্তু এক জায়গায় জেঁকে বসার শক্তি তখনো মুক্তিবাহিনীর হয় নাই। এই অবস্থা গ্রামবাসীর জন্য বাড়তি বিপদের কারণ হয়। অপারেশনের খবর পেয়ে মিলিটারি আসে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে মুক্তিবাহিনীর শক্তি বাড়ে। কাঞ্চন নদীতে তারা মিলিটারির একটা লঞ্চ ডুবিয়ে দেয়। গল্পের গড়নের জন্য যুদ্ধ- পরিস্থিতির এই পরিচয় দরকার ছিল। বিশেষত মিলিটারির লঞ্চডুবির ঘটনা। কারণ, এই লঞ্চডুবির পরই পাকিস্তানবাহিনীর লেফটেন্যান্ট দিলদার গল্পকথকের স্ত্রীর আশ্রয়ে পৌঁছায়। কথকের ভাষায় ‘মূল গল্প’ শুরু হয়।

মূল গল্প শুরুর আগে একদিকে যুদ্ধের কিছুখ-চিত্র আঁকতে হয়েছে। অন্যদিকে গল্পকথকের একটা মূর্তিও তৈরি করতে হয়েছে। তিনি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। থাকেন ধলা গ্রামে। গ্রামের পাশেই কাঞ্চন নদী। তাঁর বাড়িটাও একেবারে নদীর কূলে। বাড়ি থেকে মাধবখালি যেতে হয় নৌকাযোগে। ভালো করে খেয়াল না করলে সহসা বোঝাই যায় না, ধলা গ্রামের এই ভৌগোলিক অবস্থা গল্পের যাবতীয় ঘটনাপ্রবাহের অনুকূলে খুব সতর্কতার সাথে বেছে নেওয়া হয়েছে। তো, সে গ্রামে মাস্টার সাব সুখেই বাস করছিলেন। নতুন বিয়ে করেছেন। স্ত্রীর সাথে বনিবনা ভালো। নদীর টাটকা পাবদা-বোয়াল খান। ওই গ্রাম তখনো ‘ভিলেজ পলিটিক্সে’ আক্রান্ত হয় নাই। লোকে শিক্ষক হিসাবে তাকে মান্যগণ্য করে। বিয়েশাদিতে দাওয়াত করে। শালিশ-বিচারে তার কথা গুরুত্ব পায়। সুখী-সুন্দর জীবন।

দুই বছর এখানে সুখে কাটানোর পর ‘সংগ্রাম শুরু হল’। সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় শুরু হল অশান্তির দীর্ঘ প্রহর। যে কোনো মুহূর্তে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা। তদুপরি স্কুলের বেতন বন্ধ। বউ সন্তানসম্ভবা। হাতে টাকা-পয়সা নাই। গ্রামের বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা পাওয়ারও উপায় নাই। যোগাযোগ এক প্রকার বন্ধ। এখানে উল্লেখ করা দরকার, গল্পকথক যে নিজের গ্রামে থাকে না Ñ এ গল্পে এটা খুব জরুরি একটা তথ্য। পষ্ট করে বলা নাই, কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না, তার বাড়ির খুব কাছেধারে আর বাড়িঘর নাই। তারা স্বামী-স্ত্রী আলাদা একটা বাড়িতে বাস করে। কাজের লোক বা আত্মীয়-স্বজন কেউ নাই। স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হওয়া সত্ত্বেও বাড়তি কেউ যে আসেনি তার এক কারণ গ্রামের বাড়ির দূরত্ব; মূল কারণ যুদ্ধ-পরিস্থিতির প্রতিকূলতা। বাড়িটির একাকিত্ব আর তাদের দুজনের বিচ্ছিন্ন থাকা ‘মূল ঘটনা’ ঘটার জন্য জরুরি ছিল।

ঘটনাটা বৈধতা পেয়েছে, অর্থাৎ সম্ভাব্যতা আর বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হয়েছে আরো কিছু কারণে। গল্পকথক তার বউকে নিয়ে সুখেই ছিল। তাদের এই সুখে রাষ্ট্রের বা কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল না। তাদের বিপর্যস্ত অবস্থা তৈরি হয় ‘বাইরের বাস্তবতা’ থেকে। সেই বাস্তবতায় তার সুস্পষ্ট পক্ষপাত ছিল। পক্ষপাতটা রাজনৈতিক সচেতনতা বা সক্রিয়তা থেকে তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছে পাক বাহিনীর নির্মমতা থেকে। ব্যক্তিগতভাবে সে আরো বিপদে পড়ে স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে। ঘটনার দুদিন আগে থেকে তার স্ত্রী বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তার দেখানোর উপায় নাই। মাধবখালির একমাত্র এমবিবিএস বাবু নলিনীকুমার রায়কে মিলিটারিরা প্রথম দিনই মেরে ফেলেছে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন শত্রু-মিত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট বোধ তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। যাদের কারণে তার এই দুরবস্থা, তাদের একজনকে নাগালে পেলে কর্তব্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগার কথা না। কর্তব্য সমাপনের পর নৈতিক সমস্যা বা পাপবোধও দেখা দেওয়ার কথা না। দেখা দিয়েছে স্ত্রীর কারণে। স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে। মুমূর্ষু স্ত্রী তার কাছ থেকে কথা আদায় করেছে। সে কথা রাখতে পারেনি। যে কাজটি অনায়াসেই যথার্থ গণ্য হতে পারত, সে কাজ তাকে মর্মান্তিক দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়।

ঘটনার জন্য বেছে নেয়া হয়েছে তুমুল বর্ষণের রাত। এমন রাতে সাধারণত কেউ ঘর থেকে বের হয় না। পাক বাহিনীও না, মুক্তিবাহিনীও না। সাধারণ মানুষ তো এমনিতেও খুব একটা বের হয় না। তার স্ত্রী তাকে সেই কথাই বলে। ধরা-পড়া অফিসারটিকে মিলিটারি ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অতি উত্তম সময়। প্রশ্ন হল, ফুলি একে বাঁচাতে চায় কেন? সে কি মিলিটারিদের ভয়াবহতার কথা জানে না? নিশ্চয়ই জানে। তাহলে একে বাঁচানোর জন্য তার এত উতলা হবার কারণ কী? কারণ –  সে ‘ফুলিকে দেখে ‘বহেনজি’ বলে ডাক দিয়ে কেঁদে উঠেছে। ফুলি তাকে আশ্রয় দিয়েছে’। স্বামীকে প্রথম কথাটা বলার সময় তার প্রস্তাবটাও লক্ষ করার মতো –  সরল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ: ‘একটা মানুষ আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছে। তার জীবন রক্ষা করতে হবে’। শত্রুপক্ষের এক ঘাতককে ‘মানুষ’ অভিধা দিয়ে তাকে বাঁচানোর যে ‘মেয়েমানুষী’, তাকে ফুলির দিক থেকে ন্যায্য করার জন্য লেখক যথেষ্ট কায়কসরত করেছেন। একেবারেই আলগোছে। একেবারেই ছাড়াছাড়াভাবে। কিন্তু খুব কার্যকর ছবি হয়েছে সেগুলো। এর কিছু অংশ বর্ণিত হয়েছে ফুলির জবানিতে। আর কিছু অংশ গল্পকথকের অভিজ্ঞতা থেকে। গল্পকথক তাকে ভাঁড়ার ঘরে দেখতে গেছে রাগে গজরাতে গজরাতে। সে এই ঘটনার বিপজ্জনক দিক সম্পর্কে পুরা হুঁশিয়ার ছিল। পাক হানাদারটিকে সম্বোধন করছিল ‘হারামজাদা’ বলে। এ কারণেই ফুলির তুলনায় তার বয়ান অধিকতর কার্যকর হয়েছে। কী সে বয়ান, যা হানাদার বিচ্ছুটিকে ‘মানুষ’ গণ্য করতে সাহায্য করেছে?

লঞ্চডুবির পর সে সাঁতরে কূলে উঠেছে। অস্ত্রশস্ত্র কিছু ছিল না। ফুলির আশ্রয়ে জায়গা পেয়েছে ভাঁড়ার ঘরে। নিতান্তই অল্পবয়সী ছেলে। পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি। ফুলি তাকে স্বামীর পোশাক পরতে দিয়েছে। এই পোশাকে তাকে দেখাচ্ছে ‘খুব সাধারণ বাঙালীর মত’। শুধু রঙটা বেশি ফর্সা আর নাক-মুখ কাটা কাটা। হারিকেন হাতে তাকে ঢুকতে দেখে ‘ছেলেটা’ ‘ভয়ে শিউরে উঠলো’। তার বাড়ি বালাকোটে। রেশমী নামের এক মেয়ের সাথে তার ভাব। যুদ্ধের পর গিয়ে বিয়ে করবে। রেশমী তার গ্রামেরই মেয়ে। খুব সুন্দর। ফুলি ছবি দেখেছে। তার স্বামীও দেখল। ঘাগরা পরা। মুখ হাসি হাসি।

সমরনীতি বা রাজনীতির যে কোনো বিচারে উপরোক্ত কারণগুলোর বরাতে শত্রুপক্ষীয় একজন অফিসারকে ছেড়ে দেওয়া অযৌক্তিক। কা-জ্ঞানও একে সমর্থন করবে না। এই নিরীহ ছেলেটি ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার পর স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হবে বা হতে বাধ্য হবে –  এমন ভাবাই অধিক সঙ্গত। সুতরাং ফুলির সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক ভাবার কোনো কারণ নাই। ফুলি হয়ত বলতে পারত, ‘যুদ্ধের নিয়ম’ ‘মানবিক নিয়ম’কে রদ করতে পারে না বা করা উচিত নয়। কিন্তু সে এসবের ধারে-কাছেও যায়নি। যেতে চায়নি। অব্যবহিত পরে মৃত্যু হওয়ায় তার জবানবন্দি নেয়ার সুযোগও আর থাকেনি। সে স্বামীকে সম্পর্কের বরাতে বশ করতে চেয়েছে। কোরান ছুঁয়ে কসম কাটিয়ে নিশ্চিত হতে চেয়েছে। তার অসুস্থতার সুযোগ নিতে চেয়েছে। তার মনে হয়েছে, ছেলেটিকে বাঁচানো দরকার। সে বাঁচাতে চেয়েছে। বাছবিচারে যায়নি। সে যে তার দাবিতে অটল ছিল, তা বোঝা যায় গল্পকারের জবানি থেকে: ‘বেঁচে থাকলে সারাজীবন স্বামীকে ঘৃণা করে বাঁচতো’। কিন্তু এ গল্পের সমস্যাটা ফুলির নয়। তার স্বামীর। আমাদের কথকের। তার সমস্যাটাও ঠিক অসহায় সৈনিকের বা আশ্রয়-চাওয়া মানুষের মৃত্যু নয়। সমস্যাটা নৈতিকতা বা পাপবোধের। তার দিকটা একবার দেখে নেয়া যাক।

যুদ্ধের সময় আর দশজন সাধারণ মানুষের যে সমস্যা হয়, এই লোকও সেসব সমস্যার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছিল। তার স্ত্রীর অসুস্থতা তার জন্য বাড়তি সংকট তৈরি করেছিল। তাও নিশ্চয়ই একসময় শেষ হত। অন্য সবার ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে। কিন্তু শত্রুপক্ষের এক জওয়ানকে বাঁচানোর জন্য বউয়ের কাছে ওয়াদা করার পর যে মুসিবতে সে পড়ে তার কোনো তুলনা হয় না। এ এক চরম মানবিক সংকট। ‘অস্তিত্ববাদী সংকট’। তার জীবের জীবন আর আত্মিক জীবন –  দুইই চূড়ান্ত পরীক্ষার মধ্যে পড়ে যায়। তার দুই পথ –  শত্রু-জওয়ানকে সে মিলিটারি ক্যাম্পে পৌঁছে দেবে, অথবা তুলে দেবে মুক্তিবাহিনীর হাতে। নিজের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের জন্য সে দুই দিকের যুক্তিগুলো আওড়ে নেয়। ছেলেটিকে বাঁচানোর ব্যাপারে সে স্ত্রীকে কথা দিয়েছে। আল্লার পাক কালাম ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছে। তাছাড়া ছেলেটাকে দেখে তার মায়াও হয়েছে। বাচ্চা ছেলে। এখনো জীবনই শুরু করে নাই। দেশে গিয়ে বিয়ে-থা করবে। ইত্যাদি। অন্যদিকে, একে মিলিটারি ক্যাম্পে পৌঁছে দিলে সেকথা জানাজানি হয়ে যাবে। নৌকার মাঝিই বলে দেবে। লোকে অবশ্যই জানবে। তখন রাজাকার হিসাবে তার বিচার হবে। দেশের মানুষ তাকে ঘৃণা করবে। এরপর তার আর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয় না: ‘পাকিস্তানী মিলিটারী শুধু যে আমাদের পরম শত্রু তা না, এরা সাক্ষাৎ শয়তান। এদের কোন ক্ষমা নাই’।

লক্ষণীয়, এই সিদ্ধান্তে সে পৌঁছেছে তার নিজের পরিণতির কথা ভেবে। খুবই সঙ্গত সিদ্ধান্ত। কিন্তু ব্যক্তিগত। অন্যরকম কারণেও সে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারত। পাকবাহিনী যুদ্ধনীতি মেনে এদেশে যুদ্ধ করে নাই। সে নিজেই তার সাক্ষী। চর হাজরায় ইয়াকুব আলী মাতবর মিলিটারিদের আপ্যায়নের কালে এলাকার বিশিষ্টজনদেরও দাওয়াত করেছিল। সেই দাওয়াতে আমাদের গল্পকথকও শরিক ছিল। খাওয়ার পর মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে ‘গল্পের মত’ ঘটনাটি ঘটেছিল, সে তার প্রত্যক্ষদর্শী। এর বা অন্য অনেক ঘটনার বরাতে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারত। তা সে করেনি। বরং তার চিন্তায় অন্যরকমের যুক্তিই বড় হয়ে উঠেছিল: ‘এরা হুকুমের চাকর। উপরওয়ালার হুকুমে চলতে হয়’। লেখক ব্যাপারটিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখতে চেয়েছিলেন। সামষ্টিক বিচারে যা পুণ্য বলে গণ্য হতে পারত, ব্যক্তির জন্য তাই হয়ে দাঁড়ায় পাপবোধের অমোচনীয় উৎস। সে নিশ্চিত যে তার পাপ হয়েছে। কিন্তু পাপের ধরন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। অপেক্ষা করছে রোজ কেয়ামতের জন্য।

তাহলে গল্পটা সে যাকে বলছে, কিংবা যে বা যারা গল্পটা শুনছে, তাদের কাছে কি সে ফয়সালা চায়? না, চায় না। কেন? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের ঢুকতে হবে গল্পের গভীর-কাঠামোয়। আরেকবার নিতে হবে তার পরিচয়। সে যাকে বা যাদের গল্পটা বলছে, তাদের পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধের যে বয়ান তার জবানিতে পাওয়া গেল, তার বৈশিষ্ট্য বিচড়ে দেখাও জরুরি। তার সিদ্ধান্ত আসলে এসবের ভিত্তিতেই গৃহীত হয়েছে।

Humayun Ahmed Edit 02

আমাদের গল্পকথক তার গ্রামের আবহের মধ্যে সম্মানিত মানুষ। এই সম্মানের এক কারণ তার পেশা। অন্য কারণ নিশ্চয়ই তার জীবনবোধ ও উপলব্ধির গভীরতা। গ্রাম্য শালিশে ওই অল্পবয়সী তরুণের ‘বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া’র কারণ সম্ভবত এটাই। যে গল্প সে আমাদের শুনিয়েছে, তাতে তার কা-জ্ঞান আর বিবেচনাবোধের যথেষ্ট পরিচয় আছে। তা সত্ত্বেও বাংলার প্রান্তীয় গ্রামবাসী মানুষদের সাথে তার কোনোভাবেই অনাত্মীয়তা তৈরি হয়নি। ভাবে-স্বভাবে সে বাংলার গ্রামসমাজেরই প্রতিনিধি, যাদের সাথে শিক্ষিত নাগরিক সমাজের ফারাক অনেক। এই ফারাকের কথায় পরে আসব। আপাতত সে যে তার বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতাসমেত নিখুঁতভাবে গ্রামসমাজের প্রতিনিধি, গল্প থেকে দুটি উদাহরণ দিয়ে সে কথা বলা যাক।

স্ত্রীর সাথে তার খুব ভাব। তাদের সুখের সংসার। পুরা গল্পের আবহে এই দম্পতির পারস্পরিক সম্পর্কের মাধুর্য খুব গভীরভাবে মিশে আছে। কিন্তু কোথাও ‘ভালোবাসা’ বা ‘প্রেম’ শব্দ ব্যবহৃত হয় নাই। বলা হয়েছে, ‘আমরা সুখেই ছিলাম’। এর পরই ফুলির কর্মতৎপরতার ছবি: ‘ফুলির গাছগাছালির খুব শখ। সে গাছপালা দিয়ে বাড়ি ভরে ফেলল’। দাম্পত্যপ্রেমের এ ধরনের উপস্থাপনকে খুব গুরুত্ব না দিয়ে দেখলেও চলত। বলা যেত, তারা সাংসারিক জীবনযাপনই করে। বিয়ের আগের বা পরের যে ধরনের সম্পর্কের জন্য ‘প্রেম-ভালোবাসা’ শব্দগুলো ব্যবহার করার রেওয়াজ, তাদের জীবনে ঠিক সে রকম ব্যাপার নাই। এ রকম বলা যেত, যদি এ গল্পের অন্যত্র আরেকটি উল্লেখে বিকল্প শব্দ ব্যবহার করে লেখক আমাদের মনোযোগী হতে বাধ্য না করতেন। বালাকোটের লেফটেন্যান্ট দিলদার প্রসঙ্গে ফুলি বলছে: ‘রেশমী নামের ওদের গাঁয়ের একটি মেয়ের সঙ্গে ওর খুব ভাব’। ‘ভাব’ শব্দটি লক্ষ করার মতো। গ্রামীণ মধ্যবিত্তের জন্য স্বাভাবিক শব্দ নির্বাচন করেই লেখক নর-নারীর সম্পর্কের পরিচিত ধরনটি বর্ণনা করলেন। গল্পকথক এই আবহেরই মানুষ।

দ্বিতীয় উদাহরণটি নেয়া যাক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি থেকে। মিলিটারির সৃষ্টিছাড়া কাজকামে গ্রামের মানুষ অস্থির হয়ে পড়ল। প্রতিশেধক হিসাবে তারা কী করল? –  ‘গজবের হাত থেকে বাঁচার জন্যে মসজিদে কোরআন খতম দেয়া হলো। গ্রাম বন্ধ করা হল। এক লাখ চব্বিশ হাজার বার সুরা এখলাস পাঠ করা হল’। যে বাস্তবতা আর মনস্তত্ত্ব থেকে বিপদের এরকম দাওয়াই দেয়া হয়, আমাদের গল্পকথক সে সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতারই অংশ। বিপদের বর্ণনায় সে অনায়াসেই উচ্চারণ করে –  ‘সোবহানাল্লাহ’। ‘মাগরেবের নামাজ পড়ে বারান্দায় বসে’ থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, তার পাপবোধ তথা নৈতিকতার উৎসও প্রধানত ধর্ম। চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য সে পরকালেরই অপেক্ষা করে।

উপরে গল্পকথকের জাতবিচারের জন্য দুটি উদাহরণ দিলাম। দুটিই আসলে ভাষাভঙ্গির মামলা। বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের উচ্চমধ্যবিত্ত থেকে নি¤œমধ্যবিত্ত পর্যন্ত জনগোষ্ঠীর ভাষাকে কথাসাহিত্যের উপযোগী ‘স্বাভাবিক’ ভাষা হিসাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের সিদ্ধি অতুলনীয়। এ শুধু কথ্যভাষার ব্যবহার নয়। মোটেই আঞ্চলিক ভাষা-ব্যবহারের বিশিষ্টতা নয়। এ হল ব্যক্তির জীবন-ইতিহাসকে তার উচ্চারণের মধ্যে সম্ভবপর করে তোলা। হুমায়ূনের ভাষার সারল্য আর আকর্ষণ সম্পর্কে বিস্তর বলা হয়েছে। চরিত্রানুগ বাগভঙ্গি অনুকরণের এই ‘স্বাভাবিকতা’ই যে তার প্রধান কারণ, সে কথাটি বিশেষ বলা হয় নাই। এ লেখায় সে প্রসঙ্গে বাকবিস্তারের সুযোগ আমরা নেব না। শুধু এ কথা বলাই যথেষ্ট হবে যে, এ গল্পের বয়ানের সমস্ত অনুমান, যুক্তি, লঘু-গুরু-ভেদ, চেতনা ও সুর অভ্রান্তভাবে এই গল্পের কথককে গ্রামীণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসাবে চিহ্নিত করে, যার সাথে বাংলার বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কোনো বিচ্ছেদ ঘটেনি।

সে নিজেও তা জানে। জানে, যে বা যারা তার এ গল্প শুনবে বা পড়বে, তাদের সাথে তার মৌলিক তফাত আছে। এতে সে বিন্দুমাত্রও হীনমন্যতায় ভোগে না। বরং ফারাকের কথাটা তুলে নিজেকে আলাদা করে নেয়। তার নিজের বর্ণনা খানিকটা পড়ে নেয়া যাক: ‘দুই বছর খুব সুখে কাটলো। তারপরই সংগ্রাম শুরু হল। আপনারা বলেন স্বাধীনতা যুদ্ধ। গ্রামের লোকের কাছে সংগ্রাম’। তার নিজের বয়ানে সে মুক্তিযুদ্ধকে ‘সংগ্রাম’ বলেছে, যা, তার ভাষায়, গ্রামের লোক বলে। আর যারা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলে –  তার শ্রোতা-পাঠকেরা – তারা সম্ভবত শহরের শিক্ষিত মানুষ। এরা ‘জ্ঞানী’ এবং ‘হাজার গুণে বেশি জানেন’। কিন্তু জানায় গলদ আছে। যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বয়ানে সে অন্তত দুবার গলদ সংশোধন করে দেয়। একবার ধারণাগত ত্রুটি, আরেকবার প্রচারমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্যের গোলমাল। দুটিই ‘জ্ঞানী’ মানুষদের জানার পদ্ধতি ও ধরনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

প্রথমবার চরহাজরার ঘটনায়। মিলিটারি গ্রামে এলে মাতবর ইয়াকুব আলী মিলিটারিদের খুব সমাদর করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। এ পর্যন্ত বলার পর তার মনে হয়, একটা ব্যাখ্যা দরকার। যারা গল্পটি শুনছে, তারা নিজেদের ধারণা মোতাবেক ইয়াকুব আলীকে বিচার করছে বা করবে। সে বলে, ‘ভাই সাহেব, আপনি এর অন্য অর্থ করবেন না। তখন তাদের সমাদর করে নেয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। সবাইর হাত-পা ছিল বাঁধা’। সে এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারছে নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে সে জানে, ইয়াকুব আলী মিলিটারিদের সমাদর করেছে; আর মিলিটারিরা তার দুই মেয়ে ও এক ছেলের বউকে তুলে নিয়ে গায়েব করে দিয়েছে চিরদিনের জন্য। এই যে ‘সমাদর’ আর ‘তুলে নেয়া’ –  এ দুটো একসাথে যায় না। কিন্তু ‘গল্পের মতো’ ওই সময়ে এরকম হয়েছে। ফলে ‘মিলিটারিকে সমাদর করা’ থেকে যারা সিদ্ধান্ত নেবে, তাদের সিদ্ধান্ত ‘বাস্তবসম্মত’ হবে না। এ সতর্কবাণী উচ্চারণ প্রমাণ করে –  গল্পকথকের ধারণা – তার শ্রোতা-পাঠকেরা হরহামেশাই এমনটা করে থাকে।

পরের ঘটনাটি মিলিটারির লঞ্চডুবির। গল্প থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করি: ‘লঞ্চ ডুবার ঘটনা ঘটলো সেপ্টেম্বর মাসের ছাব্বিশ তারিখ। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে এই সংবাদ প্রচার করা হয়েছিল। ভাই সাহেব হয়তো শুনেছেন। বলা হয়েছিল শতাধিক মিলিটারীর প্রাণ সংহার হয়েছে। এটা অবশ্য ঠিক না। মিলিটারী অল্পই ছিল। বেশির ভাগই ছিল রাজাকার। রাজাকারগুলা সাঁতরে পাড়ে উঠেছে, গ্রামের লোকরাই তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলেছে’। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারণা যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে হয়ত ঠিকই আছে। কিন্তু একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় তার মস্ত বড় ফাঁক ও ফাঁকি ধরা পড়ে। ফাঁক এই যে, মারা-পড়া লোকদের মধ্যে মিলিটারির সংখ্যা ছিল অল্প। আর ফাঁকিটা আরো মারাত্মক Ñ বহু লোক মারা পড়েছে তাদের হাতে, যারা যুদ্ধে ছিল না। নিজের চোখে দেখা সেই অভিজ্ঞতা থেকে গল্পকথকের সিদ্ধান্ত: ‘যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিস …। যুদ্ধ অতি সাধারণ মানুষকেও হিংস্র করে ফেলে’।

উপরের বয়ান ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে’র মহাবয়ান বা ম্যাটান্যারেটিভকে চাপে ফেলে দেয়। ‘জ্ঞান’ বা ‘তথ্য’ থেকে পয়দা হয় যে প্রভাবশালী ডিসকোর্স, তাকে প্রশ্ন করে, আরো অন্তরঙ্গ হতে বলে, পরিসর আরো বাড়ানোর তাগিদ দেয়। এতে আরেকটা কাজ হয়। ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ থেকে ‘যুদ্ধ’ আলাদা হয়ে যায়; সামষ্টিক বয়ান থেকে ব্যক্তিগত বয়ান পৃথক মহিমা পায়। এ বিবৃতিতে কথকের স্বর একবিন্দুও টলেনি, সিদ্ধান্তের বলিষ্ঠতায় টান পড়েনি। গভীর সত্যের মতো করে সে কথা বলে। তাকে বলতে হয়। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের মহাবয়ানে অভ্যস্ত শ্রোতা-পাঠকেরা তার সমস্যাটাই ধরতে পারবে না, যদি ‘যুদ্ধ’-পাঠের এই পদ্ধতিগত প্রশ্নে সতর্ক না থাকে। সে যখন পাঠক-শ্রোতাকে বলে, ‘আপনি জ্ঞানী মানুষ’ –  তখন একদিক থেকে হয়ত আন্তরিকভাবেই বলে, কিন্তু তার নিজের অভিজ্ঞতা ও সংকটের দিক থেকে কথাটা ঠাট্টার মতোই শোনায়। সে নিশ্চিত, নগরবাসী শিক্ষিত মানুষদের ‘জ্ঞান’ তার কোনো কাজেই লাগবে না। তাই তাদের কাছে সে কোনো ফয়সালা চায় না। শুধু সিদ্ধান্তটা জানায়: ‘যুদ্ধে শুধু পাপের চাষ হয়। আমার মত সাধারণ একটা মানুষ কতগুলো পাপ করলো চিন্তা করে দেখেন’। সেই পাপের স্বরূপ বোঝার জন্য সে যখন অপেক্ষা করতে চায় রোজ হাশর পর্যন্ত, তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না, কোনো ফায়সালা সে অসম্ভব মনে করে।

সাদা-কালো বা শয়তান-ফেরেশতার বাইনারিতে পাঠ করার প্রচলিত রেওয়াজের বাইরে হুমায়ূনের মুক্তিযুদ্ধচর্চায় বরাবরই পাওয়া গেছে বহুস্তর জটিল বয়ান। ছোট্ট এই গল্প তারই এক আশ্চর্য সফল নমুনা। কোনো প্রকার তত্ত্বায়ন বা আরোপণ ছাড়াই গল্পটি আমাদের সামনে হাজির করে এক অনিঃশেষ মানবিক সংকট; আর এভাবে চিনিয়ে দেয় খোদ মানুষকেই –  অতি কাছের কিন্তু সুদূর যে মানুষের খোঁজে তাঁর ইহজনমের সাধনা।

[icon size=”” icon=”icon-empty” display=”true” ][/icon] লেখক মোহাম্মদ আজম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ান ।

[icon size=”” icon=”icon-drag” display=”true” ][/icon] বানানে দেয়া হুমায়ূন আহমেদের ছবি এবং স্কেচ নেট থেকে নেয়া । [icon size=”” icon=”icon-drag” display=”true” ][/icon] 

Related Posts

LEAVE A COMMENT