বানান হয়ে ওঠা সময়

বর্ণবাদ ও ‘আধুনিক’ নির্জ্ঞান 

বর্ণবাদ ও ‘আধুনিক’ নির্জ্ঞান

কবি জিনাত জাহান 

05

ছোটবেলা আমার আব্বার মুখে তদীয় শ্বেতশুভ্র মাতৃমূর্তি সম্পর্কে শুনতাম ‘আমার মার মুখখান কি সুন্দর …ফর্সা সুন্দর!’

এই ‘ফর্সা সুন্দর’ শব্দ দুখানা আমি জীবনে বহুত মুখে শুনেছি! আমি কেন, এই দুটো ভিন্ন শব্দ অনেকেই শুনে থাকবেন।

আট বছর আগে এক নবদম্পতির সঙ্গে এক চাঁদ-রাতে আড্ডা দিচ্ছিলাম। স্ত্রীটির গায়ের রঙ খুবই গৌর। অন্ধকারে তার সাদাসাদা পা দুখানির দিকে তার স্বামীসহ অন্যান্য উপস্থিতিও বারবার তাকাচ্ছিলেন। তার স্বামীদেবতা নিজের অজান্তেই স্ত্রীর পায়ের খুব প্রশংসা করে ফেললেন। সঙ্গে থাকা অন্য পুরুষ উপস্থিতিও যেন অনুরূপ ভাবছিলেন —  এমন মুডে স্বামীটির প্রশংসাকে একেবারে লুফে নিয়ে স্তোক বাক্য বের করে ফেললেন!

যাই হোক, ছোটবেলা আরেকটা গল্প শুনতাম। সেটা হল, কোনো এক নারী তার শিশু বয়স থেকেই ‘কালো’ রঙটা খুব অপছন্দ করতেন। এমন কি কালো মাছ । যেমন : শিঙ, কৈ, মাগুর টাইপের মাছও তিনি শুধুমাত্র ঘৃণার কারণে খেতেন না। তার যৌবনে যারা তাকে কালো পাত্রের সন্ধান দিয়েছেন, তিনি তাদের বিরুদ্ধে রীতিমতো তেড়ে যেত। পরে নাকি ওই নারীটির একজন ‘বিকট’কালো এবং ব্যাপক বিত্তশালী পরিবারের এক পুরুষ পাত্রের (যদিও তিনি কালো তথাপি তিনি একইসঙ্গে পুরুষ এবং বিত্তশালী পরিবারের পাত্র, এখানে ‘বিত্ত’ শব্দখানা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ) সঙ্গে বিয়ে হয়!

মানুষ রাজনৈতিক। ফলে বিয়েটাও হয়ত তার সে রাজনীতিরই অংশ! কিন্তু ‘ফর্সা সুন্দর’ শব্দ দুখানা যতোটা না রাজনৈতিক তার চেয়েও অধিক ঐতিহাসিক নির্জ্ঞানসত্য।

আমার উল্লিখিত ঘটনা ত্রয়ের মধ্যে একটা বিশেষ ঐক্যের বয়ান আমি রেখেছি। সেটা হল মানুষ যখন ‘ফর্সা-সুন্দর’ বলে সেটা সে তার নির্জ্ঞান থেকে বলে! এবং এটা কমবেশি সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আবার যখন সে ‘কালো’র আন্দোলন করে তখন সে পুরোপুরি এক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে করে। মানুষ তার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবেই ‘ফর্সা সুন্দর ‘ মনোভাবটিকে প্রকাশ করে থাকে! তবে রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সে বর্ণবাদ বিরোধী একটা পজিশন নেয় মাত্র!

মানুষ মাত্রেই রাজনৈতিক! ফলে সম্পর্কের বোঝাপড়াটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাজনীতির আদলে সংঘটিত হয়।

আমার আজকের বয়ানে কিছু বিষয়কে আমি টার্গেট করেছি। সেগুলোর মধ্যে তথাকথিত ‘সাদা-কালো ‘ ধারণাটা কতটুকু রাজনৈতিক আর কতটুকু প্রত্নতাত্ত্বিক তার ভেদ বুঝ ঠিক করা। আমি আসলে খুব দায়িত্বের সঙ্গে কোন যুক্তি ব্যাখ্যা করব না। কারণ আমি জানি ‘যুক্তি ‘ এমন এক মাধ্যম যা খোদ নিজেই নিজের কাছে ধরা খেয়ে আছে! ফলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে উঠে আসা যুক্তির ক্ষুরে যে নিমেষেই নাকচ হয়ে যেতে পারি, সে সম্ভাবনাকে আমি মাথায় রেখেছি!

ধরা যাক আমার আব্বার দৃষ্টিভঙ্গি, বা আমার ওই সতীর্থ ও নবদম্পতির মধ্যে পুরুষ সদস্যগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি অথবা গল্পের সেই কালো বিদ্বেষী নারীটির দৃষ্টিভঙ্গি গুলোকে আমরা একটি সনাতন ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে করতে পারি। তাহলে লাভ? হ্যাঁ লাভ আছে বৈকি! লাভের অন্তরের লাভটি হল আমরা ব্যাপকভাবে এক জাতীয় শনাক্তির রাজনীতির মধ্যে বসবাস করি। যেটা শনাক্ত ও সাব্যস্ত হল, সেটার দৃষ্টিভঙ্গিটির অনুকূলে আমরা আমাদের রাজনৈতিক পজিশনটা নিয়ে থাকি। অর্থাৎ আমরা যখন বলি ‘ কি সুন্দর, ফর্সা সুন্দর ‘ অবচেতনভাবেই আমাদের মুখ থেকে শব্দগুলো বেরিয়ে পড়ে। কিচ্ছু করার থাকে না! যারা ‘সাদা-কালো ‘ রাজনীতির মানুষ, শব্দগুলো তাদের অবচেতনে এলেও উচ্চারণে যখন আসে না তখন তাদের ভেতর রাজনৈতিক পজিশনটা কাজ করে!

নির্জ্ঞান এমন এক জিনিস অনেক সময় হাজার হাজার পৃষ্ঠার জ্ঞান-পত্রও যার ওপর আধিপত্য করতে পারে না।

আমি ঠিক এই জায়গা থেকে বলছি। একজন রাজনৈতিক মানুষ চেপে যান তার অবচেতনের কথা, কিন্তু অস্বীকার করবেন কি করে!

দুনিয়া জোড়া বর্ণবাদের এই যে গোপন প্রকোপ, খুন, হত্যা, হানাহানি, মারামারি, রেষারেষি, এর কোনটা রাজনৈতিক পজিশন থেকে হচ্ছে জানতে চায় মন! হচ্ছে হয়ত, তবে সে রাজনীতির গভীরে আছে অগভীর নির্জ্ঞান।

আমি কোনো তত্ত্বে যাব না, বা কোনো বরাতে যাব না।

সেদিন বাংলামটরের জ্যাম এ দেখলাম একটা রিকশা, একটা গাড়ির দরজায় চোট লাগিয়ে দিল। গাড়িওয়ালা বীর পুরুষোচিত ভঙ্গিতে একটি বিশেষ কায়দার যষ্টি নিয়ে রিকশা ড্রাইভারকে মারতে উঠে এলেন । মনে হল যষ্টি খানা রিকশাওয়ালাদের পেটানোর জন্যই রাখা হয়েছে! মানে হল, ঢাকার গাড়িওয়ালাদের অবচেতনেই রিকশাওয়ালাকে পেটানোর একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রসেসর আপগ্রেড করা আছে! এবং সেটা যেভাবেই বলি না কেন! যাই হোক গাড়ির মালিক নিমেষেই দমে গেলেন দেখলাম, নিজের লাঠির মার নিজেই খেলেন শেষপর্যন্ত ! ওইদিন ওই রিকশাওয়ালাসহ আশ পাশের জ্যামে থাকা অন্য রিকশা ড্রাইভাররা মিলে, এমনকি রিকশা আরোহীরা এবং একে একে এমনকি রাস্তার পথযাত্রীও ওই গাড়িওয়ালাকে ‘মার হালারে মার’ বলে তুমুল গালিগালাজ করল। দেখুন, নির্জ্ঞান কিভাবে রাজনৈতিক ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে! পরিস্থিতির সাপেক্ষে গাড়িওয়ালাকে বাগে পেয়ে যাওয়ার ভেতরে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের শ্রেণিগত নির্জ্ঞানের একটি রাজনৈতিক পজিশন দাঁড়িয়ে গেছে। রিকশা আরোহী ও পথযাত্রীদের নির্জ্ঞান ও তাদের ওই মুহূর্তের রাজনৈতিক পজিশনটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ! কালার এন্ড হেবিটেশনও নির্জ্ঞানকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

তবে বর্ণবাদ নিয়ে আমার এই ব্যাখ্যা যে সব ক্ষেত্রে একইরকম হবে তা কিন্তু নয়!

যুগে যুগে রাজনীতি যে পরিস্থিতি নির্ভর নির্জ্ঞানের এক ঐতিহাসিক কাণ্ডারী হয়ে উঠেছে , সে কথা বলা যায় অন্তত!

সুতরাং ‘ফর্সা সুন্দর ‘ ‘মার হালারে মার ‘ এ জাতীয় উচ্চারণকে প্রথম বিবেচনায় আমরা নির্জ্ঞান ভিত্তিক এবং পরের বিবেচনায় রাজনৈতিক বলতে পারি।

মানুষ রাজনৈতিক। ফলে, তার রাজনৈতিক ইতিহাসটা যে প্রথমে নির্জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং তারপর পারিপার্শিক পজিশন মাফিক হয়, সে কথা আশা করি বলা যায়!

Related Posts

LEAVE A COMMENT