বানান হয়ে ওঠা সময়

ভাবের গানে কান্না চলে আসে

প্রশ্ন : বাংলাদেশে যারা ভাবুকতার গান রচনা করেন তাদের কথা একটু জানতে চাইব। যারা এই ধরনের গান লিখছেন তাদের মধ্যে কাদের নাম করবে আপনি?

আবুল সরকার : আমি আছি, শাহ আলম (সরকার) আছে। তবে চার-দশটা বা বিশটা বিচ্ছেদ লিখলে কেউ লেখক হয়ে গেল না। লেখক হতে গেলে তাকে সব বিষয়ে লিখতে হবে। যেমন সুফিবাদ, বাউলগান, শরিয়ত, মারেফত, হাদিস এসবসহ আরও বিষয়ে যার লেখা আছে, তাকেই আমরা লেখক বলি। এখন শাহ আলম আছে, আগে অনেকে ছিলেন, যেমন রজ্জব দেওয়ান, এখন নাই। আমিও লিখি। আগে তাদের সঙ্গে জুটি বাঁধতাম। এখন তাদের অনেকেই মরে গেছে। এখন নতুনদের সঙ্গে গাই। এই শাহ আলম, লতিফ দেওয়ান। শাহ আলম এক সময় এখানেই থাকত। আমরা যখন গান গাইতাম মমতাজ তখন বসে বসে শুনত।

প্রশ্ন : শাহ আলম সরকার আপনার প্রশংসা করলেন। আপনার কাছ থেকে সে তার বিদ্যা পেয়েছে।

আবুল সরকার : আমার কাছে ধারণা নিতে পারে এতটুকু বলতে পারি। কিন্তু তাদের বংশের মধ্যে প্রতিভা ছিল। তার চাচারা মেধাবী ছিল। মোহন্ত কাকা। ‘আমি তো মরে যাবো’ তার এই গানটা পপুলারিটি পেয়েছিল। ওর বাপ-চাচাদের মধ্যে প্রতিভা নিয়ে একজনের পর একজন আসছে। আমার এখানে ছয় বছরের মতো ছিল। কিছু একটা তো পায়-ই।

প্রশ্ন : আপনার ওস্তাদ কে ছিলেন?

আবুল সরকার : আমার যে ওস্তাদ নাম বললে এখন অনেকে চিনবে না। সরকারি শিল্পী ছিলেন। তিনি বেতার ও টেলিভিশনের  গান  করেছেন। হাজী শাহাবুদ্দীন বয়াতি। এখন জীবিত নাই। আমি ওস্তাদ, খালেক দেওয়ান, আলাউদ্দিন বয়াতি, রহমান বয়াতির সঙ্গে গাইতাম।

প্রশ্ন : জীবিতের মধ্যে আপনার বয়সী কি কেউ নাই?

আবুল সরকার : দুই-তিনজন আছে। তারা এখন গায় না। একজন শামসু দেওয়ান। তিনি বড় লেখক না, কিন্তু বড় গায়ক ছিলেন। তার বাড়ি ভুলতা। ধুপতারা গ্রাম। তার যুগে তিনি প্রধান গায়কদের একজন ছিলেন। আরেকজন আছে পরেশ আলী। বাড়ি জয়পাড়ায়। এক সময় খুব নাম ছিল। তারা আমার আগের শিল্পী। শামসু দেওয়ান, রজ্জব দেওয়ান, আমার, লালন, জালালের গান গাইতেন। যারা লেখে না তারা সবার গান গাইতে পারে। যারা লেখে তারাও অন্যের গান গাইতে পারে। তবে দেশ-কাল-পাত্র ভেদে নিজের গানটাই গাইতে চায়। আবার নাম করবে বলে, তাই খামখেয়ালি করে এদিক-ওদিক থেকে কথা নিয়ে সুর করে ফেললেই বড় লেখক হয় না। ওই লেখক টিকে না। টিকে ওই লেখক যে সব সময় সব দিকে সৃষ্টি করে দিয়ে যাইতে পারে। আমাদের পরে তেমন লেখক নাই। আলেয়া কিছু বিচ্ছেদ লেখে। লতিফ সরকারও লেখে। এই লেখা আমি গ্রহণ করব না। আমার বইয়েই তো আমার ৫০০ গান আছে।

প্রশ্ন : আপনার ছেলেবেলার কথা মনে অছে?

আবুল সরকার : আমার মা’র কথামতো আমার জন্ম ১৩৬১ সালের ২৪ বৈশাখ। সে মোতাবেক এখন আমার বয়স ঊনষাট-ষাট চলছে। জন্ম হইছে মুন্সীগঞ্জ জেলার শিবনগর থানায়। গ্রাম সুরদিয়া, পোস্ট অফিস পুকটিয়া। আমি ১৯৬৯ বা তার এক বছর আগে খালার সঙ্গে শ্যামপুরে মামার কাছে চলে আসি। অর্থনৈতিক কারণে সিক্সে পড়া অবস্থায় চলে আসি। যাত্রাবাড়ীতে স্কুলে ভর্তি হই। আর গানের ব্যাপারটাও এখানেই শুরু। এখন যেটাকে বাউল  গান বলে সেটাকে আমরা বলি প্রশ্নোত্তর বা পালাগান। আমরা সঠিক বাউল না। বাউল গান তো কুষ্টিয়া অঞ্চলের গান। যারা লালন ভক্ত। ওই যে বাউলের যে ভাব, তার মধ্যে পরিপূর্ণতা আছে। একতারা নিয়ে ছুটল, পয়সার পেছনে ছুটল না। তারা লোভী না তো। আমরা তো পয়সার জন্য গান গাই।

প্রশ্ন : পালা গান নিয়ে কী বলছিলেন?

আবুল সরকার : প্রথম পর্যায়ে এটা ছিল কবি গান, তারপর হলো জারিগান, তার থেকে হলো পালাগান। শরিয়ত-মারেফত, খাজার জীবনী, বড় পীরের জীবনী, নারী-পুরুষ ইত্যাদি।

প্রশ্ন : এই পরিবর্তনটা কবে থেকে হইছে বলতে পারেন?

আবুল সরকার : আমার দাদা-ওস্তাদ কবি গান গাইতেন। এরপর কেন জানি জারি গানে এলেন। কেমন একটা ভাব দিয়ে ফেললেন। এটা ৬৯-৭০ সালের আগে। বিশেষ করে এর গুরুত্ব আসছে কারবালা থেকে। এখন এটাকে কেউ বলে মনসুরের জারি, কেউ বলে হাসানের জারি। আবার কেউ বলে ইসমাইলের জারিÑ একটা গানের মধ্যে পুরো কোরবানির ঘটনা। এরপর বয়াতিদের থেকে পালা গান। আবার মিরপুর থেকে নাম দিয়ে দিল বাউল শিল্পী। এটা কিভাবে যেন সমাজের মধ্যে পরিচিতি পেয়ে গেল। বাউল নামটা আদিতে তাদের মধ্যে ছিল না। ছিল কুষ্টিয়ার লালন ভক্তদের মাঝে। ইন্ডিয়াতেও এমন হইছে।

প্রশ্ন : কবি গান, জারি গান ও পালা গানের বিষয় ভাবনার মধ্যে তো পার্থক্য আছে?

আবুল সরকার : খুব একটা পার্থক্য আসে না। কবি গানে কাহিনী যায়, তত্ত্বও যায়। জারি গানেও কাহিনী যায়, তত্ত্ব যায়। বিষয় প্রায় একই। সামান্য পরিবর্তন হয়। সুর-কথা-ছড়া-ছন্দের মাধ্যমে এই পার্থক্য ধরা পড়ে। তবে কবি গান গায়কদের বেশি শিক্ষিত মনে হতো। হিন্দুরাই বেশি গাইত। কবিতা লিখতে যে পদ্য লাগে। কাছ থেকে দেখেছি তারা পদ্য ছাড়া কথাই বলত না। এটা সুরের মধ্যেই পার্থক্য আছে। (সুর করে) ডেরে ডেরে ডেরে ডেরে ডেরে না না..

প্রশ্ন : কীর্তনের সুর মনে হচ্ছে?

আবুল সরকার : তাও হতে পারে। আমি বলতে পারি কীর্তন এখান থেকে নিছে। তখন কি বলবেন?

প্রশ্ন : কবি গান ও জারি গানের সুরের মধ্যে পার্থক্য আছে?

আবুল সরকার : জারির সুর হলো এমন… (সুর করে) আল্লাহ বলো, রাসূল বলো, দিলে বলো সার। চারকালেমা মুখে নিয়া হয়ে যায় ব্যাপার। এতে প্রশ্ন-উত্তর থাকে না। তবে এমন হয় তাকে ছোট্ট একটা প্রশ্ন করে গান গাইতে সাহায্য করা হয়। দু’জন গায়ক থাকে। আমি জানি প্রশ্ন করা হলে অন্যজন অ্যাডভান্স হতে পারবে। এক থেকে দুইয়ে যেতে পারবে। তাই প্রশ্ন করে এগিয়ে দেয়া হয়। তাদের দীর্ঘ সময় গান গাইতে হয়। অন্য গায়ক যখন গায় তখন বিশ্রাম নেয়া যায়। আমরা তো সারারাত গান করি।

অন্যদিকে পালা গানে পক্ষ-বিপক্ষ থাকে। পালা গানকে বিচার গান বলে, বায়াতি গানও বলে। কোনো এলাকায় শরিয়ত-মারেফত গান, দোতারা গান, কোনো এলাকায় বলে মালজোড়া গান। এটা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বলা হয়। আমি কুষ্টিয়া গেলে বলবে বাউল, বিষ্ণুপুরে গেলে বলবে বয়াতি আসছে, কুমিল্লায় সরকার, করিম শাহের দেশে বাউল, নেত্রকোনায় বাউল।

শ্রীমঙ্গল-আখাউড়া-বাঞ্ছারামপুরের দিকে ছিল জীবন সরকার, বাদশা সরকার, আলমাস সরকার। সবাই মারা গেছে। তারা কুমিল্লায় ভাষা পাইছে। তাদের বাউল, বায়াতি বললে কেউ চিনবে না। সরকার বলতে হবে। সরকার আসছে ফারসি ভাষা থেকে। যারা লেখালেখির দায়িত্ব থাকে। যেমন বড় বড় মহাজনরা লেখালেখির জন্য তাদের দোকানে সরকার রাখে।

প্রশ্ন : আমরা কি বলতে পারি কবি গানে হিন্দু ধর্মের প্রভাব আছে?

আবুল সরকার : এটা তো আসছেই হিন্দুদের কাছ থেকে। তখন মুসলমান কবি, গায়কেরা ভাবল সব তো হিন্দুর হয়ে গেল। আমাদের ঢোকানোর একটা জায়গা আছেÑ মহররম। এটা ঢুকানো যায়। তখন মুসলমানদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য হলো। এভাবে কবি গান থেকে জারি গান চলে এলো।

প্রশ্ন : মুসলমান সমাজে গান নিয়ে নেতিবাচক ধারণা ছিল। আব্বাসউদ্দিনের আগে কোনো মুসলমান গায়ক দেখা যায় না। জারি গানটা কি সমাজের মধ্যে গানের স্থান করে নেয়ার জন্যই হইছে?

আবুল সরকার : আমাদের আব্বাসউদ্দিন, নজরুলের কথা বলেন আপনি, তারা হিন্দুদের নিয়েও গান লেখেন। আমাদের মুসলমানদের জন্যও লেখেন। নজরুল লিখলেন। আব্বাসউদ্দিন এসব গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। অন্যদিকে মীর মশাররফ হোসেন দেখলেন কবি গানে ঠাকুররা রামায়ণ করছে। তখন তিনি বিষাদসিন্ধু করলেন। আল্লাহ পাক তারে অনেক উপরের স্থানে উঠাইছেন। আমরা যারা গায়ক তারা তো এখান থেকেই জ্ঞানার্জন করে গান গাই।

প্রশ্ন : আপনার গান শেখার বিষয়টা বলেন।

আবুল সরকার : যখন যাত্রাবাড়ীর স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি আমার ওস্তাদ বললেন ক্লাসিক্যাল শিখতে। আমি ১৯৭৩ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে ভর্তি হলাম। প্রিন্সিপালের নাম বেদার উদ্দিন আহমেদ, ওস্তাদের নাম সোহরাব হোসেন। সেখানে নজরুল ও রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখলাম। প্রথম বছরেই প্রথম স্থান অর্জন করলাম। তখন বিভিন্ন জায়গায় গান গাইতাম। গ্রামে গান গাইতে গিয়ে দেখি সেখানে লোকে বায়াতি গান বুঝে ভালো। অন্যদিকে পাস করার পর পরিণয়ে আবদ্ধ হলাম। টাকা-পয়সায় দরকার আছে। তখন পালা গানে চলে আসি। লেখার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই ছিল। তখন কিছুই হতো না। তারপরও চেষ্টাটা ছিল। এরপর কেউ বলল রেকর্ডিং করতে হবে। এই দায়িত্বের মাধ্যমেই গান লেখা হয়। আমার সব গান বিক্রি করে দিছি।

প্রশ্ন : ছোটবেলা থেকেই লিখছেন, কিন্তু লেখার মূল জোরটা কই পাইলেন?

আবুল সরকার : এর জন্য তো পড়াশোনা লাগে। আমি প্রচুর পড়ছি। পড়াশোনা আর কবিত্ব শক্তি। প্রয়োজনের তাগিদে চলে আসছে। লেখার মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠা করবÑ এটা আমার মনের মধ্যে ছিল। তবে না জানলে তো হবে না। জ্ঞান ভাসা ভাসা হলে হবে না। আপনাকে ভেতরে যেতে হবে। আবার মুসলমান ধর্ম জানলে হবে না। অন্য ধর্মও জানতে হবে। আমার এমনি কোনো গুরুবিদ্যা নাই। তবে প্রাধান্য দিয়েছি লেখাপড়াকে। আপনি একবার না বুঝলে হাদিস তিনবার পড়েন। দেখবেন বুঝতে কোনো গুরু লাগবে না। শিক্ষা কম হলে বুঝও কম হয়। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা আলাদা বিষয়। তবে সাধনা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন : আপনাকে লোকে প্রথম পছন্দ করল কোনো সময়ে?

আবুল সরকার : নজরুলগীতি গাইতাম বাড়ি বাড়ি। সেটা ছিল শৌখিনদের জন্য। পরে যখন দেখলাম লোক পল্লীগীতি পছন্দ করে ব্যবসা হিসেবে সেটা ধরলাম। এখন অবশ্য ব্যবসার দিকে তেমন লোভ নাই। তবে লেখালেখি পড়াপড়ির মধ্যে ব্যবসার ব্যাপার নাই। এটা অন্য ব্যাপার। আমি ৭৪-এ স্টেজে উঠি। তখন খাজা মঈনুদ্দীনকে নিয়ে কোনো গান ছিল না। আমি লেখা শুরু করি। এখন বাংলাদেশে এটা প্রচার হয়ে গেছে, বাংলাদেশে খাজা বাবার গানের প্রথম লেখক আমি।

প্রশ্ন : রেকর্ডিং শুরু হলো কিভাবে?

আবুল সরকার : ডেমরায় আবুল কাশেমের সুরমেলা নামে একটা রেকর্ডিং ঘর ছিল। তখন এত যন্ত্রপাতি ছিল না। বিদেশ থেকে একটা টেপ (রেকর্ড প্লেয়ার) আনছিল। মাইকে গান গাইতাম। সেখান থেকে রেকর্ডিং করা হতো। এই ক্যাসেট খুব হিট করছে। নাম ছিল খাজার জীবনী, এখন পর্যন্ত বাজে। টাকা-পয়সা তখনকার হিসাবে ভালোই দিছে। গীতিকার হাসান মতিউর রহমানের ভাই বাচ্চুর একটা প্রতিষ্ঠান ছিল ঝংকার। এটার স্টুডিও ছিল। সেখান থেকে করলাম কোন বাগিচার ফুল। সেটার অনেক জনপ্রিয় গান আছে। যেমনÑ ঘুম আসে নারে, একা ঘরে রইরে। সেটা পরে বেবি নাজনীন গাইছে।

প্রশ্ন : অডিও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আপনাদের বোঝাপড়াটা কেমন?

আবুল সরকার : ওরা তো আমাদের ডেকে নেয়। আমাদের নিজেদের তো অডিও করার ক্ষমতা নাই। তারা বলার পর আমরা কন্ট্রাক করি। এককালীন টাকা নিয়ে নিই। তারা যখন দেখল এই শিল্পীকে দিয়ে গান করালে ব্যবসা হবে, তখন আসে। তারা পাবলিকের কাছেই আমাদের কথা জানতে পারে। একটা অ্যালবামে ১০টা গান করি। আবার জারিতে একটা গান হয়। পালায় করি তিনটে গান। তিন গানের জন্য ৩০ হাজার টাকা। এরপর এলো সিডি। বিভিন্ন জায়গায় স্টেজ করে গানের শুটিং হয়েছে। এফডিসিতেও হয়েছে।

প্রশ্ন : গানের বিষয় কে ঠিক করে?

আবুল সরকার : তারা বলে দেয়। যেমন খাজা বাবার ক্যাসেট আছে ১০টা। তবে এক গান দুই ক্যাসেটে গাওয়া যায় না। প্রয়োজনে একই ভাব দুইবার আসতে পারে কিন্তু গান আলাদা হতে হবে।

প্রশ্ন : অন্য শিল্পীরা কি আপনার গান গাইছে?

আবুল সরকার : বহুত গাইছে। লেখক তো বাধা দিতে পারে না। আমি সবার জন্য গান লিখি। তবে নির্দিষ্ট করে কোনো শিল্পীর জন্য লিখছি বলে মনে পড়ে না। আমি আর শাহ আলম গানে বিভিন্ন সময় সাহায্য করছি। কিন্তু একজন শিল্পীর জন্য ১০টা গান লিখছি এমন হয় না। গান বিক্রি করে দেয়ায় আমার কপিরাইট নাই। তবে সিনেমার ক্ষেত্রে কপিরাইট আমার। শবনম পারভীন তার সিনেমায় ‘আমার ঘুম আসে না’ ব্যবহার করছে। একটা মেয়ে নাচতে নাচতে গাইছে। আমার ভালো লাগে নাই। তাই ফিল্মে গান দিই নাই।

প্রশ্ন : আপনার অডিও আর সিডির সংখ্যা কত?

আবুল সরকার : সব মিলিয়ে দুই শতাধিক হবে।

প্রশ্ন : এখন অডিও বাজারের কি অবস্থা?

আবুল সরকার : মোবাইল আসার পর থেকে কমে গেছে।

প্রশ্ন : লালনের গানে আমরা তত্ত্ব পাই, আপনার গানে কি তত্ত্ব আছ?

আবুল সরকার : সাধারণ গানও আছে, তত্ত্ব গানও আছে। সেটা যে দেশে যে ভাব তার সঙ্গে মিলিয়ে হয়। এখন চেষ্টা করি বাক্যটা যেন ওজনদার হয়। উপরের দিকেই তো যেতে হয়। একবার উপরে উঠলে নিচে নামা যায় না। সুরও ভিন্ন করতে হয়। নইলে লোকের ভালো লাগে না।

এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক গান লিখি না। যেমন ঘুম আসে না-তে মোহন বাঁশির কথা বললাম। এটা কার বাঁশি? খাজা বাবা না আল্লাহ? ইসলাম ধর্মে তো এই ধরনের বাঁশির কথা নাই। এটা কৃষ্ণের বাঁশিÑ ব্যক্তিকেন্দ্রিক গান। আমাদের তো দেশ-কাল ভেদে গান গাইতে হয়। যেমন হিন্দুদের পালা-পার্বণে আপনি তো মুসলমানদের গান গাইতে পারেন না। তখন হনুমানকে বিরাট কিছু বুঝাইতে পারব। এখন এমন হইছে হিন্দুদের কাছে তাদের বড় করে তুলব। কিন্তু ইসলামের মধ্যে একে আনব না, প্রাধান্য দেয়া যাবে না। যেহেতু আমার ব্যক্তিগত ধর্ম আছে। এটা আমার ধর্মীয় পরিবর্তন। রাসূল (সা.) বলেছেন, কোনো কিছু জানা থাকলে তা অন্যকে শিক্ষা দাও। এটা আমার দায়িত্ব। আমার জুনিয়রদের বলাও আমার দায়িত্ব। বৈষ্ণবদের মতো গান আমারও আছে। আমি দাবি করি আমি সুফিবাদী। তাই ওইসব বৈষ্ণব গান নিয়ে বই বের করি নাই। সুফিবাদী গান নিয়ে বই বের করছি। বাউলবাদের সাধনা জল, নীর, ক্ষীর, যোগ, মহাযোগ। এটা দিয়ে কি করব? আমি যদি পারি রাতভর ইবাদত করব। নইলে ঘুমাব। এটাও আল্লাহর নেয়ামত।

প্রশ্ন : সুফিবাদের সাধনা কি?

আবুল সরকার : সুফিবাদের সাধনা কোরআন-হাদিস থেকে যে আধ্যাত্মিক সারটা আসছে নিজেকে জানলে রবকে জানবে বা আমি ফকিরের ভেদ, ফকির আমার ভেদ সেটার চর্চা করা। তাদের সারাজীবন কাটে আল্লাহকে পেতে।

প্রশ্ন : সুফিরা কি দেহকেন্দ্রিক?

আবুল সরকার : ইসলামও দেহকেন্দ্রিক। ইসলামের দেহকেন্দ্রিকতা হলো শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়া আপনাকে ইবাদত বন্দেগি করতে হবে। মনে মনে স্মরণ করলেই নামাজ হয় না। সেজদা আল্লাহ চায়। অথবা রাত জেগে কেয়ামুল লাইল। আল্লাহ তো বলছে ওই ব্যক্তির চোখমুখ আমার হয়ে গেছে। বাউলবাদে ধরো জল সাধন করলা। না, এখানে তা বলব না। বাউল মত সহজিয়া থেকে আসছে, বৌদ্ধ ধর্ম থেকে আসছে। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু থেকে আসছে। তারপর তো লালনে এসে এর বিস্তার ঘটছে। আবার এর মধ্যে তিনি ইসলাম আনছেনÑ তার গুরু সিরাজ সাঁই ছিলেন ফকির। তাই লালনকেও ফকির বলা হয়। এদিকে বাউল ওদিকে ফকির। একে যদি ইসলামিক অর্থে ত্যাগী ধরেন ঠিক আছে। কিন্তু আউল-বাউল ধরলে ইসলামে যায় না। ভালো দিক হলো তারা বলে অন্যায় করব না, জাতি বিভেদ করব না। ইসলাম জাতি বিভেদ করে কিন্তু অন্যের ধর্মে হিংসা করে না। সহ্য করে। মানুষকে নিজের করে নেয়।

প্রশ্ন : শহরের গানে অনেক হালকা কথা থাকে। অন্যদিকে গ্রামে যেসব গান করেন সেগুলোতে ভাবের কথা, অনেক জটিল কথা থাকে। তাইলে আপনি কি বলছেন গ্রামের মানুষেরা শহরের মানুষের চেয়ে চিন্তা-ভাবনায় উঁচুমানের?

আবুল সরকার : ভাবের গান গাইলে কান্না চলে আসে। গ্রাম আর শহরের পার্থক্য হলো গ্রামের মানুষ সহজ-সরল। শহরের মানুষ আধুনিক। সে এমএ পড়বে, ইঞ্জিনিয়ার হবে। তার চিন্তা এই দিকে থাকে। গ্রামের মানুষ ক্ষেত-খামারে কাজ করে। তারা ভাবে আমি মরে যাব। আল্লাহ তুমি আমাকে রক্ষা করো, দয়াল আমাকে রক্ষা করো। গ্রামের মানুষের মধ্যে যে প্রেম ভাব আছে তা শহরে নাই। গ্রামে কান্নার ভাব প্রবল। প্রাণটা বেশি।

বাউলের ভাব তো অঞ্চল ভেদে আলাদা। করিমের বাউল গান আছে কিন্তু চোখের পানি আনার মতো গান নাই। মানিকগঞ্জের সুরে কথায় চোখের পানি আসে। ময়মনসিংহ-নেত্রকোনার সুর উড়ে উড়ে যায় আর মানিকগঞ্জে ঢাবা ঢাবা। অন্তরের গভীর থেকে আসে। কুষ্টিয়ার সুর এ রকম কান্নার মধ্যে না, বুঝের মধ্যে আছে। বাঞ্ছারামপুর, হোমনা, দাউদকান্দি এসব এলাকার মধ্যে কান্না আছে। সিলেট চিটাগাং নোয়াখালীতে তো নাই-ই। বরিশাল খুলনায় কিছু পাবেন। আবার বিজয় সরকার আর উকিল মুন্সীর ভাব একই না।

আমরা যদিও লালনকে শ্রেষ্ঠ বাউল মনে করি কিন্তু জালালউদ্দিন খাঁ’র একটা গানের কাছে কিছু না। কিন্তু নড়াইল গিয়া জালালের গান করেন কিছু হবে না। সেখানে লাগবে বিজয়ের গান।

প্রশ্ন : জালালের গান নিয়ে বলছিলেন। কোন গানটা?

আবুল সরকার : যে কোনো গান। লালনের গান দুই অন্তরা তিন অন্তরা। তার একটা আবিষ্কার আছে। সে আবিষ্কারের কারণে সে শূন্যের মধ্যে আছে। কিন্তু জালালের গানের মধ্যে সৃষ্টি আছে। গভীর কথা আছে, কঠিন কথা আছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রচার পায় নাই। শুধু ময়মনসিংহ অঞ্চলে। আমাদের বাউল শিল্পীদের মধ্যে এমন কোনো শিল্পী নাই যিনি জালালের গান জানেন না। লালন জালালের আগে এবং তার মধ্যে কীর্তনের একটা ঢঙ আছে। লালন ১৩০ বছর আগের। তার জনপ্রিয়তা তো হবেই।

প্রশ্ন : জালাল সুফি না বাউল?

আবুল সরকার : বাউলই তো। সে কম পড়ছে কিন্তু জানত অনেক। আমি তো কুমিল্লার মনমোহনের কাছে করিমের দাম দেব না। করিম কি গান লিখছে? পাতলা। বাতাসে উড়ে যায়। আঞ্চলিক স্বার্থে কিছু লোক তাকে বাঁচাইয়া রাখছে। স¤্রাট বানাইছে। স¤্রাট তো লালনই। এক দেশে কত স¤্রাট থাকে?

Related Posts

LEAVE A COMMENT