বানান হয়ে ওঠা সময়

সাধনা ছাড়া সঙ্গীত আসলে কিছুই না ।। বিদুষী কিশোরী আমনকার

ভূমিকা ও অনুবাদ:  রাফসান গালিব

উপমহাদেশের ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের কিংবদন্তী সুরসাধক কিশোরী আমনকার। ৩ এপ্রিল জন্মদিন পালনের সপ্তাহপূর্বে ৮৪ বছর বয়সে জগতের যাবতীয় সুর থেকে বিদায় নেন। সারাজীবন সঙ্গীতের প্রতি উৎসর্গ করা শক্তিমান শিল্পীদের মধ্যে এ বিদুষী নারী ছিলেন অন্যতম। সঙ্গীত সাধনাকেই জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞানে পরিণত করেছিলেন। নির্দ্বিধায় বলেছেন- আমার কাছে সঙ্গীত হচ্ছে ঈশ্বরের সাথে কথোপকথন।

প্রখ্যাত এ সাধকশিল্পীর জন্ম ১০ এপ্রিল ১৯৩২ইং । মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর পিতা মারা যান। শৈশবেই নিজের মা থেকে সঙ্গীতের দীক্ষা গ্রহণ করা জয়পুর ঘরানার এ শিল্পী খেয়াল, ঠুমরী ও ভজন পরিবেশনের মাধ্যমে আলাদাভাবে বিদগ্ধ শ্রোতাদের মন জয় করেন। পৃথিবীর নানা দেশে সুরের বাণী ছড়িয়ে দেন দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে, এসেছিলেন বাংলাদেশেও। সঙ্গীত জগতে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকারের পদ্ম ভূষণ এবং পদ্মা বিভূষণ সম্মাননা পান তিনি। প্রায় ৭০ বছর ধরে সঙ্গীতচর্চায় বিদূষী আমনকার গুরুত্ব দিয়ে গেছেন ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের আদি শাস্ত্রীয় ভাবজ্ঞানকে। আনজানিবাই মালপেকার, ওস্তাদ আনোয়ার হোসাইন খান, শরৎচন্দ্র আরোলকার, বালকৃষ্ণ পর্বতকারদের মত প্রখ্যাত সঙ্গীতগুরুদের থেকে বিভিন্ন বয়সে নানা ঘরনার শিক্ষাগ্রহণ করেন তিনি। ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতের নানা ব্যকরণ ও তত্ত্বসহকারে নিজের চিন্তা নিয়ে বের করেছেন বই। একটা সিনেমাতেও সুর প্রয়োগ করেন কিন্তু এ মাধ্যমে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি বলে আর কাজ করেননি। বর্তমান সময়ের সঙ্গীত চর্চা নিয়ে সমালোচনামুখর জয়পুর ঘরানার এ শিল্পী নিজের শৈশব, সঙ্গীতসাধনা, নিজের ব্যক্তিগত ধ্যান ধারণা ও অভিমত নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন লেখিকা শর্মিলা কামাতের কাছে। ১৯৯৮ সালের ১৫ মার্চে ফেমিনা ম্যাগাজিনে এটি প্রকাশিত হয়।

 




৫০
বছর ধরে সঙ্গীতই আপনার দুনিয়া এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে ?

আমার কাছে সঙ্গীত হচ্ছে  দুনিয়ার সাথে অন্তরের গভীরতম অনুভূতির যোগাযোগমাধ্যম এটা হচ্ছে বিমূর্ত, অপ্রকাশিত অব্যক্ত অনুভূতির সুনিপুণ এক বহিঃপ্রকাশ যেমন সন্তানসন্ততিদের প্রতি মায়ের নিঃশর্ত ভালবাসা, যেটা বলে বোঝানো সম্ভব না কিন্তু অনুভব করা যায় এই সঙ্গীত হচ্ছে আমাদের এইসব অনুভূতির মতইএর কোন বাণী নেই, নেই কোন বিট শুধুমাত্র  অভিব্যক্তি প্রকাশ (এক্সপ্রেশন) আর  লয়ের ব্যাপার কন্ঠসাধন হচ্ছে আবেগ প্রকাশের এমন এক বাহন  যেটা খুব গভীরে গিয়ে আমাদের স্পর্শ করে

 

যোগ্য সঙ্গীতশিল্পী কি জন্মগ্রহণসুত্রে হয় নাকি তৈরি হয়?

আমার ক্ষেত্রে বলব, একজন সঙ্গীতকার হিসেবেই আমি জন্মেছি অসাধারণ গায়িকা হওয়ার মধ্য দিয়ে মগুবাই কুর্দিকার  একজন মা হয়ে নিজের গর্ভেই সঙ্গীত দুনিয়া সম্পর্কে আমার দীক্ষা নিশ্চিত করেন অন্তঃসত্তায় অবস্থায়ও তিনি রেওয়াজ চালিয়ে যেতেন এবং জন্মের পরেও আমি এর সবকিছু আহরণ করতাম যখন মাত্র ছয় বছর বয়স, আমার বাবা মারা যান আমার মা-ই একাধারে মা-বাবা-গুরু সবকিছু হয়ে ওঠেন আমার জন্য তিনিই আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন

আমাদের কঠিনতর শৈশবকাল বিবেচনায় আমি অবশ্যই বলব যে, আমার মা আমাকে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রস্তুত করতে মহানতর ভূমিকা পালন করেন, এমনকি অনেকটা অমানুষিক হয়েই খুব অল্প বয়সেই, কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতকেই পাঠক্রম হিসেবে গ্রহণ করি এটাকে এরকম পবিত্রজ্ঞান মনে করি এ জন্য যে, সাধনা ছাড়া সঙ্গীত আসলে কিছুই না আমাদের বাড়িতে, আমরা পরম শান্তির (ultimate peace) লক্ষ্য অর্জনের উপায় হিসেবে সঙ্গীতকে হৃদয়াংগম করতে শিখেছি

 



 

সঙ্গীতের সাথে আপনার এ সংযোগ উৎসের দিকে ফিরে যাওয়াকেই ইঙ্গিত করে আপনি কি মনে করেন এখনকার সঙ্গীত আদি নির্দেশনা থেকে ভিন্ন দিকে ধাবিত হয়েছে?

সঙ্গীত নিয়ে অধ্যয়নরত সময় আমি বুঝতে পারি যে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের বর্তমান বিন্যাস, আদিগ্রন্থে যেভাবে শেখানো হয়েছে সেভাবে সামঞ্জস্য করা হয়নি ইতিমধ্যে সমৃদ্ধ জ্ঞানের অধিকারীদের একটা অংশ  বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন এইসব লিখিত নির্দেশনা থেকে উল্লেখযোগ্য একটাই অর্জন হচ্ছে আমরা এর সামান্য কিছুই জানতে পারছি মাত্র আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে উৎসে ফিরে যেতে হবে

এই সব ‘গ্রন্থ’ থেকে আমি একটি নোটকে বিশ্লেষণ করা, এর বৈশিষ্ট্য, এবং তার চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারণ করতে শিখেছি কিভাবে নির্দিষ্ট একটা মেজাজ, অনুভূতি এটা প্রকাশ করেছে আমি শিখেছি, এটা এমন নয় যে প্রত্যেকটি রাগ একই বিন্যাসে হতে হবে অভিব্যক্তি(এক্সপ্রেশন) অনুসারে বিন্যাসও পরিবর্তন হবে

বর্তমান বিন্যাসের বিপরীতে রক্ষনশীলতার সাথে আমার এ তৎপড়তা চালিয়ে যাওয়া একজন বিদ্রোহী হিসেবেই তকমা লাগিয়ে দেয়া যায় যাইহোক, আমি শুধুমাত্র আদিজ্ঞান সম্পন্ন গুরুর শিক্ষাকে যথার্থ মনে করি আমি বুঝতে পারি যে, সঙ্গীতের প্রতিটি ক্রিয়ারূপের উপর ধ্যান ব্যতিত, নিজেকে একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে ভাবতে পারি না

 

আপনি কি মনে করেন এখনকার ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত থেকে শ্রোতাদের আগ্রহ সরে যাচ্ছে?   

এখনকার রাগসঙ্গীতের ধরণ পরম্পররা নির্দেশনা অনুসারে হচ্ছে না এখনকার সঙ্গীতশিল্পীরা পুরোপুরিভাবে আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে জ্ঞানসম্পন্ন নয় আমরা এর মহিমাময় সৌন্দর্য্যতা হারিয়েছি, যেটি সঙ্গীতের জন্য অপরিহার্য প্রতিটা শিল্পই প্রকৃতির আবেগময়তা থেকে উৎসারিত একা কৌশল(টেকনিক) সেখানে যথেষ্ট নয় শিল্প হওয়া উচিত আত্মাঘনিষ্ট, অন্যথা কোনধরণের আত্মিক যোগাযোগ ছাড়া সঙ্গীত হয়ে পড়ে নিছক এক ছুতারগিরি দুঃখজনকভাবে, কলাকৌশল আজ আত্মিক শক্তির উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছে যার কারণে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের আজ দ্রুত অবনতি হচ্ছে আরো প্রাধান্য দেওয়া হয় বিট এবং বাণীকে, অন্তর্নিহিত অনুভূতিকে না এ ধরনের প্রবণতা দর্শকদের মধ্যে হুজুগেপনা সৃষ্টি করে যা অভিপ্রায়িত হওয়া উচিত না নিছক উপভোগ্যময়তা থেকেও ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের আরো মহিমান্বিত উদ্দেশ্য রয়েছে

 

আপনি কি মনে করেন ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত, সঙ্গীতের অন্যান্য ধারার কাছে আবেদন হারাচ্ছে?

উৎসমূল থেকে সরে যাওয়াই এর আবেদন কমে যাওয়ার একটা কারণ হতে পারে শ্রোতারা বুঝতে পারে না, কেন একজন শিল্পী স্বাতন্ত্র্য কোন পদ্ধতিতে গান করেন বা  নির্দিষ্ট সুর তৈরি করেন এছাড়াও আমাদের মধ্যে আজকাল পাশ্চাত্যমুখীতার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাদের শিরাতে পশ্চিমা রক্ত প্রবাহিত না হওয়া সত্বেও দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে আজকে আমাদের কিছুই নেই  

তবুও আমি ভবিষ্যত সম্পর্কে আশাবাদী এখনকার অনেক তরুণ চলচ্চিত্র ও রক সংগীতের থেকে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে আশা করি এদের মধ্যে অনেকে উৎসের দিকে ফিরে আসতে উদ্যত হবে এবং আমাদের সঙ্গীতকে আরো স্পন্দনীয় এবং আবেদনময় করে তুলবে শেষপর্যন্ত, ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতেই আছে মর্যাদাপূর্ণ এক উপভোগ্যময়তা প্রশান্তিময় অনুভূতির পরিবর্তে সঙ্গীতের অন্যান্য ধারা দর্শক শ্রোতাদের মধ্যে নিছক উত্তেজনা সৃষ্টি করে

 




সঙ্গীত অন্যান্য ধারার প্রতি কেন আপনি কম আগ্রহ প্রকাশ করেন
?

টানা সঙ্গীত পরিবেশনা ও রেওয়াজে এত ব্যস্ত থাকি যে অন্য বিষয়ের প্রতি আমার সময় কম তাছাড়া, এই সব সঙ্গীতের যে ধরণের চরিত্র আর এর রিদমের কসরতবাজির সাথে যুক্ত হতে ইচ্ছা পোষণ করি না ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের মতো চলচ্চিত্রের গান ও রক সংগীতে উচ্চমার্গীয় উপভোগ্যময়তা নেই দর্শকদের মধ্যে প্রশান্তি বিলানোর থেকে বরং নিছক উত্তেজনা সৃষ্টি করাই এদের কাজ পাঁচ থেকে সাত মিনিটের বাইরে একটা চলচ্চিত্রের গান গাওয়া কি সম্ভব? আপনি পারবেন না  যাইহোক, ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের একটা নোট দুই থেকে তিন ঘন্টার জন্য স্থায়ী হতে পারে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের নোটের এমন স্বাভাবিক শক্তিময়তা যে, এ ধরণের কম্পিজিশন এ জন্য সম্ভবপর হয়

ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের পরিবেশনায় নোটের নির্দেশনার প্রতি ফোকাস থাকে বেশি যার কারণে অধিক অনুভূতি স্পর্শময় হয়। আমি এটা দেখে বিস্মিত হই যে, অনেক জনপ্রিয় সঙ্গীতকার  উদীয়মান শিল্পীদের ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত চর্চা করতে বলেন, যদি তারা প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে সাফল্য পেতে চায়।

 

খুব অস্থিরমনা ও বদমেজাজি হিসেবে আপনাকে সবাই জানে, এটা কেন?

এখানে অনেক লোক আছে, এমনি ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীত জগতের বাইরেরও অনেকে আমার সাফল্য ঈর্শান্বিত। এটা অনেকটা আপনার পছন্দনীয় সুরের ক্ষেত্রে উঁচু স্কেলে উঠার সময় যে রকম বাঁধাপ্রাপ্ত হন, সেরকম। কেউই আমার গায়কীর সমালোচনা করার সাহস রাখে না, যার কারণে তারা আমার সম্পর্কে এরকম বলে থাকে। আমার মধ্যে অস্থিরতা ও বদমেজাজ নিয়ে এসব কথাবার্তা আসলেই জঘন্য। এগুলা আমার শ্রোতাদের মধ্যে কোন প্রভাব ফেলে না। আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বরঞ্চ আমি আমার লক্ষ্যের দিকে মনোযোগ দিতে অধিকতর শ্রেয় মনে করি-সংগীতের মাধ্যমে ‘পরম শান্তি’ অর্জনের জন্য আমাদের ‘গুরু’ কর্তৃক যে নির্দেশনা সেটা পালন করার মধ্য দিয়ে।            

Related Posts

LEAVE A COMMENT