বানান হয়ে ওঠা সময়

আমাকে মওলানা ভাসানী বলেই ডাকত

পর্ব ২

 

কবি মাহমুদুল হাসান

কুরানে হাফেজ কবি মাহমুদুল হাসান পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগে । শৈশবে কুষ্টিয়া থেকে হেফজ শেষ করেন । ঢাকায় এসে দীর্ঘদিন কওমি মাদ্রাসায় পড়ে শেষ করেছেন দাওরায়ে হাদিস এবং দারুল ইফতা; যা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি । পরে অল্পকাল কওমি মাদ্রাসায় পড়িয়েছেনও । সাথে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল এবং কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে । নানান বিদ্যায় উৎসাহী মাহমুদুল হাসান লেখক হতে চান । কাব্য, ধর্ম এবং রাজনীতিতে তাঁর সমান আগ্রহ । সমাজ সংস্কারের বাসানায় গত ১ যুগের বেশি ঢাকায় নানান তৎপরতায় যুক্ত । সমাজে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, পরিবারে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে হাঁটা এই তরুণ কবি নিজের হয়ে উঠা বিভিন্ন মুহূর্ত বানানের পাঠকদের সাথে শেয়ার করতে রাজি হয়েছেন । উনি ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তাঁর হয়ে উঠার সময়-সমাজ-ভাবনা নিয়ে ।  

আমাদের ধারণা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা অনেক অনেক ব্যক্তির বিচিত্র ভাবে হয়ে উঠার ছোট ছোট ঘটনা সমগ্রের ইতিহাস লিখার একটা মনোলিথিক যে ধারা বাংলাদেশে চালু আছে তাঁকে ভেঙে দিবে । ফলে এই অভিজ্ঞতা আগামীর বাংলাদেশে সামাজিক ইতিহাস লিখনের অমূল্য সম্পদ । যা লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার । ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের অন্য বন্ধুদেরও আমরা আহ্বান জানাই তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে ।

“কুদরতি বাসনা: একজন কুরানে হাফেজের কাব্যে ডুব” শিরোনামে ধারাবাহিক লেখার আজকে দ্বিতীয় পর্ব ছাপা হচ্ছে ।

    প্রথম পর্বের লিঙ্ক : http://www.banan.space/archives/art.3335.ba




ক্লাস ফাইভে পড়েছিলাম মেহেরপুরে। স্কুলের নাম দীঘির পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুল থেকে দুই কিলোমিটার দূরে মেহেরপুর শহর অবস্থিত। একটা বিশাল বিল ছিল আমাদের বাসা ও স্কুলের মাঝখানে। বর্ষাকালে সেই বিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বয়সে খুব ছোট ও মাছ ধরায় আনাড়ি হলেও বর্শী দিয়ে মাছ ধরতাম। দোকানে বর্শি কিনতে পাওয়া গেলেও অফিসের কাগজে লাগানো চিকন চিকন পিন বাঁকা করে বর্শি বানাতাম। তারপর মায়েদের সেলাই করা সুঁতো চুরি করে গাছের ডাল বা লাঠির আগায় সেই সুঁতো বেঁধে দিতাম। আর সুঁতোর আগায় শক্ত করে গেঁরো দিয়ে বাঁধতাম পিন বাঁকানো বর্শি। তাতে ভাত বা বিস্কুট বা পাওরুটি গেঁথে পানিতে ফেলতাম। সেই বিলে মাছের আধিক্য এতই প্রবল যে বর্শির মত ধারালো আল না থাকলেও পিনের বানানো বর্শিতেও টপাটপ একেরপর এক মাছ পেতাম। মেইন রোডের সাথেই বিশাল এলাকা জুড়ে মেহেরপুর পল্লি বিদ্যুতের অফিস ও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারসহ বসবাসের কোয়ার্টার। আমার আব্বা পল্লিবিদ্যুৎ অফিসে চাকরি করতেন। চারতলা বিল্ডিয়ের দোতলায় ছিল আমাদের বাসা। দোতলার জানলায় দাঁড়ালেই দেখা যেত চিতল মাছের পেটের মতন রোদে চিকচিক করা দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া পানির বিল। আরো দূরে মিলিয়ে গেছে গাছের সারি। দূরের বৃক্ষপত্র সবুজ থাকে না। কালো কালো অন্ধকার লাগে। মেহেরপুরে আমাদের বাসার পেছনের বিল হারিয়ে গিয়েছিল দূরের অন্ধকারাচ্ছন্ন গাছগাছালির সম্মিলনে। বিলের ধার ঘেঁষে রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে যেতাম স্কুলে। কোনদিন একা। কোনদিন কোয়ার্টারের অন্য ছেলেমেয়েদের সাথে। ওই স্কুলে আমি পড়েছিলাম মাত্র এক বছর। বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া আর হয় নাই। শুধু বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েই স্কুল জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে আমার।

ক্লাস ফোর অন্য স্কুলে পড়ে এখানে ফাইভে ভর্তি হলেও অল্প দিনেই ভাল ছাত্র হিশাবে সুনাম কুড়িয়ে ফেলি। ক্লাসে যে কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর ভেতর লেখাপড়া বিষয়ক প্রতিযোগিতা হতো তাদের মধ্যে আমি ছিলাম অন্যতম। এই স্কুলে মেয়েদের রোল আর ছেলেদের রোল আদালা করে হিশাব করা হতো। মেয়েদের ভেতর যে সবচেয়ে ভাল ফলাফল করতো সেই হতো মেয়েদের মধ্যে এক নম্বর। তেমনি ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল ফলাফল করা ছেলেটি ছিল এক নম্বর। ছেলে-মেয়ে সম্মিলিত ফলাফল গণনা করা হতো না। এক নম্বর ছেলেটি ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। নাম ছিল সেতাব। কিন্তু এক নম্বর মেয়েটির নাম আজ আর মনে নাই। তবে গোলগাল মুখের মেয়েটির সাথে ছেলেদের তেমন সখ্যতা না থাকলেও পরীক্ষার আগ দিয়ে আমাদের পিছপিছ ঘুরঘুর করত সাজেশন নেয়ার জন্য। আমাদের প্রস্তুতি কেমন, আমরা কী পড়ছি এসব খবরাখবর নেওয়ার জন্য যেচে আমাদের সাথে খাতির করত খুব। মনে পড়ে, একবার আমি আর সেতাব দুষ্টুমি করে দেব দেব করে অনেক ঘুরিয়েও সাজেশন দিতে ইচ্ছে করেই দেরি করি। তারপর মেয়েটির সে কি কান্না! একদিন স্কুল ছুটির পর সেতাব আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। ঘরদোর দেখেই মনে হলো ওরা তেমন অবস্থাসম্পন্ন না। মাটির দোচালা দুটো ঘর। সমবাহু ত্রিভুজের ওপরের দুবাহুর আকৃতিতে টিনের ছাউনি। উঠোন, আঙিনা ও হেঁশেলের আশপাশে স্যাঁতস্যাতে নোংরা ভাব।

আমাদের গ্রামেও মাটির অনেক বাড়ি আছে। সেগুলো বেশ পরিচ্ছন্ন তকতকে। সেতাবদের মাটির বাড়ি মোটেও তেমন পরিপাটি নয়। সেতাবের মা আমাকে দেখে কী করবে না করবে ঠাহর করতে পারছিল না। ছটফট করছিলেন আর একটু পর পর পরনের অপরিচ্ছন্ন শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুচছিলেন। বেতের তৈরি ছোট বাটিতে মুড়ি চিড়া ও গুড় খেতে দেন। গরমে আমি ঘামছিলাম বলে তালপাখা দিয়ে সশব্দে আমাকে আমার মুখের ওপর বাতাস করছিলেন। আমাকে বাড়িতে বসিয়ে রেখে বস্তা হাতে কোথায় যেন চলে গেল। কিছুক্ষণ পর অর্ধ-ভর্তি বস্তা ঘাড়ে করে ফিরে আসে। ঘাড় থেকে বস্তা নামিয়ে রেখে শুকনো গলায় বলে- ‘মেম্বারের বাড়িতে গম দিচ্ছে। গম আনতে গিয়েছিলাম।’
‘মেম্বার কি সবাইকে গম দেয়?’ আমার কৌতূহলী গলায় জানতে চাই।
‘সবাইকে না। যারা আমাদের মত গরিব। আর কার্ড করা আছে। শুধু তারাই পায় গম। তোরা কিন্তু পাবি না। কারণ তোরা বড়লোক। আর আমাদের গ্রামেও বড়লোক ঘর আছে। ওরাও গম পায় না।’

সেতাবের কাছে আরো জিজ্ঞেস করে জানতে পারি যে কয়েক মাস পরপরই মেম্বারের বাড়ি থেকে গ্রামের অন্যান্য গরিব ঘরের মত তারাও সরকারি গম পায়। কাঁচা রাস্তার সাথেই সেতাবদের টিন ও মাটির কাঁচা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর ফেরার পথে চোখে পড়ে একটা অবস্থাসম্পন্ন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা দরিদ্র লোকদের লম্বা লাইন। ময়লা কাপড় পরা ছোট ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে সব বয়সী নারী পুরুষই ব্যাগ-বস্তা হাতে ধুলো মাখা রাস্তায় সরকারি গম নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

 


 

কবি মাহমুদুল হাসান

 


বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আমরা কয়েকজন আলাদাভাবে স্কুলের স্যারদের কাছে পড়তাম। কখনো ক্লাস শুরুর আগে। কখনো পরে। এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টা। যখন যে স্যারের সময় হতো সেই মোতাবেক আমরা সেই স্যারের কাছে বইখাতা সমেত হাজির হতাম। একদিন বাসা থেকে জানিয়ে দেয়া হয় আমাকে আর স্কুলে পড়ানো হচ্ছে না। ফাইনাল পরীক্ষার পরই আমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যাব। অতএব, বৃত্তি পরীক্ষা দেয়া অনর্থক। ব্যাপারটা আমি আমার সহপাঠীদের জানিয়ে দিই। তারা আমার মাদ্রাসার ভর্তির ব্যাপারটা ঠিকমত ঠাহর করতে না পারলেও খানিক অবাক হয়। সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এখন একটি ছেলে বলছে যে– সে আর বৃত্তি পরীক্ষার মত গুরুতর একটা পরীক্ষা দেবে না। অথচ বৃত্তি পরীক্ষার জন্য তখন সবার মধ্যে গুরুগম্ভীর ভাব কাজ করত। কাছের বন্ধুদের জন্য ধাক্কা খাওয়ার একটা মতই ব্যাপার। কিন্তু আমি আমার বাসার সিদ্ধান্তে অনঢ়।
সেতাব জিজ্ঞেস করে, ‘মাদ্রাসায়ও তো তুই আমাদের মত সব পড়তে পারবি। তবে ওদের ওখানে পাঞ্জাবি-টুপি পরে থাকতে হয়। আমাদের গাঁয়ের মসজিদের সাথে মাদ্রাসা আছে। সেখানে দেখেছি। তোকেও সারাক্ষণ টুপি-পাঞ্জাবি পরে থাকতে হবে। পারবি তো?”

আমাদের ভেতর উচ্চতায় সবচেয়ে লম্বা ছেলে সেতাব আমাদের সাথেই ক্লাস ফাইভে পড়লেও বয়সে ছিল আমাদের চেয়ে কয়েক বছরের বড়। আর ওর লোহাপেটা শরীর দেখে ওকে মনেই হতো না ও ক্লাস ফাইভের ছাত্র। হাই স্কুলের ছাত্র হিশাবে ওকে একদম মানিয়ে যেত। দুনিয়াদারি বিষয়ে ওর জ্ঞানও ছিল অন্যদের চেয়ে অধিক। ‘মাদ্রাসায় গেলে যদি টুপি পরা লাগে তাহলে পরবই তো। না পরার কী আছে?’ আমার নিরস উত্তর।

সেদিন আমি আর সেতাব বিএসসি স্যারের বাসা থেকে ফিরছিলাম হারমনিয়াম নিয়ে। নতুন চাকরিতে আসা আমাদের এই স্যার স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। যখনই কোন দিবস উপলক্ষে গানবাজনা বা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দরকার হত স্যার গোটা স্কুল ঘুরে ঘুরে প্রতিভা খুঁজে বের করতেন। যে গাইতে পারে তাকে দিয়ে গান গাওয়াতেন। যে নাচে পটু তাকে আরো উন্নত প্রশিক্ষণ দিতেন। যার কণ্ঠে কবিতা মানায় তাকে আবৃত্তি শেখাতেন। আমার আর সেতাবের তেমন বিশেষ কোন প্রতিভা ছিল না। তাই আমরা দুজন ফাইফরমায়েশ খেটেই শিক্ষকদের কাছে থাকার চেষ্টা করতাম। ওইদিন সেতাব ও আমাকে পাঠানো হয়েছিল বিএসসি স্যারের বাসা থেকে হারমোনিয়াম আনতে। স্যারের বাসায় গেলে স্যারের বউ আমাদের বসতে দেন। বিস্কুটচানাচুর খেতে দেন। তারপর একটা ভ্যান ভাড়া করে হারমোনিয়ামসহ আমাদেরকে তুলে দেন।

ভ্যান চলছে স্কুলের দিকে। ‘আচ্ছা, তুই মাদ্রাসায় যাবি কেন?’ সেতাবের প্রশ্ন। ‘বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে পরের ক্লাসে পড়বি। আমরা সবাই তাই করব। মাদ্রাসায় কী শেখায়?’
‘আমি জানি না। বাসা থেকে বলেছে মাদ্রাসায় ভর্তি করাবে। তাই আমি মাদ্রাসায় পড়বো।’
‘মাদ্রাসায়ও কি তুই এখানকার মতন সব পড়বি?’
‘অত কিছু জানি না। আম্মা বলেছে, মাদ্রাসায় কুরান শরিফ শেখানো হয়। কুরান শরিফ মুখস্থ করানো হয়। আমি মাদ্রাসায় যাব কুরান শরিফ শিখতে। কুরান শরিফ মুখস্থ করতে।’

কাঁধে ময়লা ভেজা গামছা ঝুলিয়ে বয়স্ক লোকটি ভ্যান চালাচেছ। পুরোনো ত্যানার মতন চটচটে লুঙ্গি । রুক্ষ নগ্ন পায়ের শিরা-উপশিরা প্যাডল মারার তালে তালে ফুলে উঠছে। ক্লান্ত গলা দিয়ে উৎসারিত হচ্ছে অস্ফুট পরিশ্রমী শব্দ। মিনিট পাঁচেক গেলেই আমাদের স্কুল। আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল পাঠ্যবইয়ে একজন মওলানার জীবনী আছে। শুভ্র দাড়ি। মাথায় টুপি। গায়ে সফেদ পাঞ্জাবি। মওলানার নাম আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ভারতবর্ষের বিখ্যাত দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাস করে এসেছেন। দেশে এসে কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে লড়েছেন। রাজনীতি করেছেন। জালিম অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আমার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। আরে, মাদ্রাসায় পড়লে তো মওলানা ভাসানী হওয়া যায়। আমিও নিশ্চয় মওলানার মত কেউ একজন হতে পারব।

‘মাদ্রাসায় পড়লে মওলানা ভাসানী হওয়া যায়। আমিও মওলানা ভাসানী হবো। বইয়ের মওলানার কথা মনে আছে তোর?’ আমি জিগাইলাম সেতাবকে । 
‘হা। আছে। তুই তাহলে মওলানা ভাসানী হওয়ার জন্য মাদ্রাসায় যাবি?’ সেতাবের প্রশ্ন।
‘হুম।’

বাকি পথটুকু আমরা আর কোন কথা বলি না। বছরের বাকি দিনগুলো স্কুলের সহপাঠীরা আমাকে মওলানা ভাসানী বলেই ডাকত।

(চলবে…)

LEAVE A COMMENT