বানান হয়ে ওঠা সময়

বিদায়ের আগে শরীরে মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ।। মাহমুদুল হাসান

হাফেজ কবি মাহমুদুল হাসানের “কুদরতি বাসনা: একজন কুরানে হাফেজের কাব্যে ডুব” শিরোনামে ধারাবাহিক লেখার আজকে তৃতীয় পর্ব ছাপা হইল ।



    প্রথম পর্বের লিঙ্ক http://www.banan.space/archives/art.3335.ba

    দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক : http://www.banan.space/archives/art.3357.ba




পর্ব ৩

জানুয়ারি মাসের এক শীতের সকালে আব্বা আমাকে কুষ্টিয়া শহরের একটি মাদ্রাসায় রেখে আসেন। মজমপুর গেটে বাস থেকে যখন নামলাম তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। আকাশের সূর্য ডিমের কুসুমের মতন নিস্তেজ ও ঘোলাটে । কুয়াশা ভেদ করে জমিনে বিচরণকারী মানুষের শীতবসনা শরীর স্পর্শ করতে যথেষ্ট সক্ষম নয়। বাস ট্রাক রিকশা ও নানান যানবাহনের বিচিত্র শব্দ ও মাঘ মাসের শুষ্ক ধুলোবালির মিশ্রণে গ্রামীণ কোন আমেজ আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। গ্রামের উঁচু উঁচু গাছগাছালির বদলে সদ্য বিকাশমান শহরটির দালান কোঠা আমাকে খানিকটা বিচলিত করে তোলে।

 

আব্বা আমাকে নিয়ে যান শহরের সবচেয়ে জমজমাট নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কের একটি মার্কেটে। সেখান থেকে নতুন কিছু কাপড় চোপড় পেস্ট-ব্রাশ ও একটি ট্রাংকসহ প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পাতি কিনে দেন। সদ্য কেনা বস্তুগুলো আমি ট্রাংকে ঢুকিয়ে রাখি। বাড়ি থেকে বিদায় নেয়ার সময় আম্মা একটি ব্যাগে কিছু জামা-কাপড়সহ ঈদে বানানো একটি পাঞ্জাবি ও পায়জামা দিয়েছিলেন। সেগুলোও ট্রাংকের ভেতর রাখলাম। তারপর একটা বেকারির দোকান থেকে বড় বড় দেখে দুপ্যাকেট কিস্কুট কিনে দিলেন আব্বা। কেনাকাটা সেরে একটি রিকশায় চড়ে মাদ্রাসার দিকে রওনা দিই।

 

কুষ্টিয়া শহরের দেয়ালে দেয়ালে দেখলাম সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবি নতুন মুখ ফেরদৌস ও কোলকাতার প্রিয়াঙ্কা অভিনীত ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র রঙিন পোস্টার। কয়েক দিন আগেই ঈদের সময় বিটিভিতে ছবিটি আমি দেখেছি। এই ছবিটি দেখার জন্য আমাদের বাড়ির ছোটবড় সবার মধ্যে সেকি তোরজোর ঈদের আগের দিনগুলোয়। সেকি অপেক্ষা আর গুঞ্জন। টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখে দেখে সবাই উদ্গ্রীব ছিলাম কবে হঠাৎ বৃষ্টি দেখতে। নায়ক-নায়িকার সামনাসামনি মোলাকাত না হয়েও শুধুমাত্র চিঠি বিনিময়ের মধ্যদিয়ে দুর্দান্ত হৃদয়গ্রাহী প্রেম।

 

সে সময় বাড়িতে মেজো কাকার ক্যাসেটে অঞ্জন দত্তের গান শুনে শুনে ওত অল্প বয়সেই গান শোনার কান তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে নচিকেতার গলায় হঠাৎ বৃষ্টির ফাটাফাটি রোমান্টিক গানগুলো হৃদয়ের গভীর ছুঁয়ে যায়। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে অধ্যয়নরত মেজো কাকার তাগিদেই আমাদের সবার ভেতর ছবিটি দেখার উদ্দীপনা-অপেক্ষা কাজ করছিল। মেজো কাকা ম্যাজিকের মতন বাড়ির সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হলেন যে, হঠাৎ বৃষ্টি পরিবারের সবাই একসাথে বসে দেখার মতন ভাল ছবি। বলা বাহুল্য, তার সেই প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল। বাড়ির সবাই মিলে আমরা বিটিভিতে হঠাৎ বৃষ্টি উপভোগ করি।
তিনি আমাদের পরিবারে খানিকটা সংস্কৃতিমনা হিশাবেও নাম কুড়িয়েছিলেন। নিজে গানের রেওয়াজ করতেন। শহর থেকে গ্রামে আসলে প্রায়শই বাড়ি কিম্বা পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে জটলা করে গান শোনাতেন। বাড়ির সামনের প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদেরকে গোল করে বসিয়ে নিজের কণ্ঠের গান শোনাতেন। বাচ্চাদের গানও শুনতেন।

 






মাদ্রাসার গেইট দিয়ে প্রবেশ করার পর চলন্ত রিকশার গতি একটু স্থির হওয়ার আগেই কোত্থেকে চারপাঁচজন আমার বয়সী টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত ছেলে ছুটে এসে রিকশা থেকে আমাদের জিনিসপত্র নামিয়ে নিজেরা ধরাধরি করে কিরাতখানা লেখা একটা বড় লম্বা ঘরের দিকে নিয়ে যায়। ওদের ভেতর একটা ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করে– “তুমি কোথায় ভর্তি হয়েছো?”

আমি প্রথমে প্রশ্নকারী ছেলেটির মুখের দিকে এবং তারপর আব্বার দিকে তাকাই। বোঝার চেষ্টা করি ছেলেটি “তুমি কোথায় ভর্তি হয়েছো?” বলে কী ইঙ্গিত করলো। আমি তো এই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছি। এখানেই পড়ব। এখানেই থাকব। বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে বিছানাপত্র ট্রাংক নিয়ে এসেছি। তাহলে এধরনের প্রশ্নের কী জবাব হতে পারে? ঠিক বুঝে উঠলে পারলাম না । ভাবছিলাম ছেলেটির প্রশ্নের সদুত্তর কী হতে পারে। আমি কোন কথা বলতে পারি না। আমার চুপ থাকা দেখে আব্বাই আমার হয়ে ছেলেটির প্রশ্নের জবাব দেন — ‘ও নতুন ভর্তি হয়েছে। এখন থেকে ও এখানেই থাকবে। আগে কখনো মাদ্রাসায় পড়েনি।’
– ওহহ। বুঝেছি। মক্তবে। ও মক্তবে ভর্তি হয়েছে। আপনারা আসেন আমার সাথে।

এই বলে সে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করে। বেশ সপ্রতিভ ও চনমনে ভাব ছেলেটির চোখে মুখে কথায়। আমি ও আব্বা ছেলেটিকে অনুসরণ করি। কিরাতখানা লেখা দীর্ঘ-চওড়া ঘরটিতে ঢুকে দেখি, সেই চারপাঁচজন ছেলে আমার ট্রাংকটি ধরাধরি করে দেয়াল ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা আরো অনেক ট্রাংকের পাশে নামিয়ে রেখেছে। নানান রঙের নানান মাপের সারি সারি স্টিলের ট্রাংক । প্রায় প্রতিটি ট্রাংকই আনকোরা নতুন। চকচক করছে গায়ের রঙ ও লেখা। সদ্য রং করা ট্রাংকের গা থেকে নাকে এসে লাগছে কড়কড়ে ঘ্রাণ। ট্রাংকটি যথাস্থানে রেখে এরপর ছেলেগুলো কোথায় যেন ভোজবাজির মতন উধাও হয়ে গেল চোখের পলকে।

 

মক্তবের লম্বা চওড়া সেই ঘরটা অনেকটাই বড় বড় গোডাউনের মতন দেখতে। ইটের দেয়াল। অনেক উঁচুতে দোচালা টিনের চাল। আড়াআড়িভাবে বাঁশের আড়া। দুটো দরজা দুপাশে। আর প্রসারিত কপাটওয়ালা কয়েকটা জানলা। ঘরের ভেতরকার বাচ্চা ছেলেগুলো বটগাছের শালিক পাখির মত কিচিরমিচির করছে।

 

নতুন ভর্তি হওয়া ছেলেদের কেউ কেউ ছোট ছোট জটলা পাকিয়ে খোশগল্পে মশগুল। কেউ অযথাই ছোটাছুটি করছে। যাদের অভিভাবক এসেছে তারা সন্তানদের শেষ নসিহত দিচ্ছেন । বিদায়ের আগে শরীরে মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কয়েকটা ছেলেকে লক্ষ্য করলাম অনেকদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে আসার শোক ও বিষণ্নতায় নিশ্চুপ বসে আছে এক কোণায়। হালকাপাতলা শুকনো মুখ। চোখের পাপড়িতে পানি না কী যেন চিকচিক করে উঠল মনে হলো। আমি বিপণ্ন বোধ করতে শুরু করলাম। আব্বাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

 

মাদ্রাসার ঠিক মাঝখানের উঠোনটিতে প্রাণবন্ত পরিবেশ। অভিভাবক এবং তাদের হাত ধরে ভর্তি হতে আসা আমার মতই খুদে খুদে তালেবে ইলম। উঠোনে বসে অনেকেই শীতের শেষ দুপুরের ম্রিয়মাণ নিস্তেজ রোদ পোহাচ্ছে। মক্তবের ঠিক দক্ষিণ দিকে মসজিদ। একচালা টিনের মসজিদের সামনের চত্বরে কয়েকটি বাচ্চা ছেলে টুপি-পাঞ্চাবি পরেই সবুজ টেনিস বল ও স্টিকার লাগানো সদ্য কেনা ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট খেলায় ব্যতিব্যস্ত। আমি ওদের ক্রিকেট খেলা দেখতে থাকি। বেশ নির্ভার বোধ করি এসময়। ঘরের ভেতরকার বিপণ্নতা-বোধ আর নাই। আমার বয়সী বাচ্চাদের খেলা দেখায় এতই বিমগ্ন ছিলাম যে, কখন যেন আমার আশেপাশে আমার মতনই অনেকে খেলা দেখতে দাঁড়িয়ে গেছে সেটা টেরই পাই নি।

 

বলারের দুর্বলতার মওকা বুঝে ব্যাট করা ছেলেটি সজরে ব্যাট পরিচালনা করলে তীব্র গতিতে সবুজ বলটি আমাদের দিকে ছুটে আসে। আমি গা বাঁচানোর জন্য একদিকে সরে যাই। আব্বা আমার ঘাড়ে অজান্তেই শক্ত করে হাত রাখেন।
– আচ্ছা, আব্বা। আমি ওদের সাথে খেলতে পারব না? আমি জিজ্ঞেস করি।
– পারবা না কেন? অবশ্যই পারবা। ওদের সাথেই তো তুমি খেলবা। আগে পরিচয় হোক সবার সাথে। তারপর খেলো। আজই কেবল মাদ্রাসায় ভর্তি হলা। দুএকদিন যাক আগে।
– এখন খেলা যাবে না কেন? ওরা খেলায় নেবে না আজ? আমার গলায় একটু অস্থিরতা।
– শোনো, তুমি আজ নতুন এসেছো মাদ্রাসায়। আজই খেলতে গেলে লোকে খারাপ বলবে। তুমি এখানে পড়তে এসেছো। মাদ্রাসায় তোমাকে রেখে যাওয়ার মহৎ উদ্দেশ্য আছে আমাদের। তোমাকে কুরানের হাফেজ হতে হবে। দ্বীনের আলেম হতে হবে। মানুষ তোমার কাছ থেকে কুরান শিখতে আসবে। ইসলামের জ্ঞান জানতে চাইবে। খেলাধুলা শিখতে তোমার কাছে কেউ আসবে না। মনে রাখবা, মাদ্রাসায় তুমি খেলতে আসো নি। আগে লেখাপড়া শুরু হোক। ভাল করে মনোযোগের সাথে পড়তে থাকো। দেখবা তখন খেললে কেউ কিছু বলবে না।

– কিন্তু ওরা খেলছে যে। ওরা পড়ালেখা করে না? ওদেরকে কি সবাই খারাপ বলে?
– ওরা মনে হয় পুরোনো ছাত্র। তোমার মতন নতুন না। তুমি তো কেবল আজই আসলে।
– এখনই আসরের আজান পড়বে। নামাজের পর বড় হুজুরের সাথে দেখা করে আমি চলে যাব। এখন এদিকে দেরি হলে ওদিকে বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যাবে।

 

শীতের মৃদু বেলা ক্ষণস্থায়ী। আসর ও মাগরিবের নামাজের মধ্যবর্তী সময়ের তফাৎ খুবই সামান্য। আব্বার চেহারায় মায়ের কোল থেকে সন্তানকে মাদ্রাসায় রেখে যাওয়ার গ্লানি কিম্বা বাড়ি ফেরার তাগাদা স্পষ্ট হতে থাকে। আসরের আজানের পর মাদ্রাসার সবাই মসজিদে ছুটতে লাগল। আব্বা ও আমি ওজু করে মসজিদে প্রবেশ করলাম।  (চলবে…)



হাফেজ কবি মাহমুদুল হাসান পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগে । শৈশবে কুষ্টিয়া থেকে হেফজ শেষ করেন । ঢাকায় এসে দীর্ঘদিন কওমি মাদ্রাসায় পড়ে শেষ করেছেন দাওরায়ে হাদিস এবং দারুল ইফতা; যা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি । পরে অল্পকাল কওমি মাদ্রাসায় পড়িয়েছেনও । সাথে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল এবং কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে । নানান বিদ্যায় উৎসাহী মাহমুদুল হাসান লেখক হতে চান । কাব্য, ধর্ম এবং রাজনীতিতে তাঁর সমান আগ্রহ । সমাজ সংস্কারের বাসানায় গত ১ যুগের বেশি ঢাকায় নানান তৎপরতায় যুক্ত । সমাজে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, পরিবারে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে হাঁটা এই তরুণ কবি নিজের হয়ে উঠা বিভিন্ন মুহূর্ত বানানের পাঠকদের সাথে শেয়ার করতে রাজি হয়েছেন । উনি ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তাঁর হয়ে উঠার সময়-সমাজ-ভাবনা নিয়ে ।

 


আমাদের ধারণা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা অনেক অনেক ব্যক্তির বিচিত্র ভাবে হয়ে উঠার ছোট ছোট ঘটনা সমগ্রের ইতিহাস লিখার একটা মনোলিথিক যে ধারা বাংলাদেশে চালু আছে তাঁকে ভেঙে দিবে । ফলে এই অভিজ্ঞতা আগামীর বাংলাদেশে সামাজিক ইতিহাস লিখনের অমূল্য সম্পদ । যা লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার । ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের অন্য বন্ধুদেরও আমরা আহ্বান জানাই তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে ।

LEAVE A COMMENT