বানান হয়ে ওঠা সময়

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিপীড়িতদের জন্য তারা নবীদের কণ্ঠস্বর হতে পারে — পোপ ফ্রান্সিস


[ মিয়ানমারের রাজধানী নাই পে তাউ কনভেনশন সেন্টারে মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর ২০১৭, পোপ ফ্রান্সিস যে ভাষণ দিয়ে ছিলেন তার পুরাটা Vatican Radio তে প্রকাশিত হয় । সেখান থেকে পোপ ফ্রান্সিসের ভাষণটা বানানের জন্য অনুবাদ করেন কবি, কোরআনে হাফেজ মাহমুদুল হাসান । নিজ দেশ মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা এবং নিজ ভুমিছাড়া করার নিষ্ঠুর এই সময়ে যখন সারা দুনিয়ায় এর প্রতিবাদ হচ্ছে তখন পোপ ফ্রান্সিসের মায়ানমার যাত্রা অনেকের মনোযোগের কেন্দ্রে । ফলে মায়ানমারের ক্ষমতাসীনদের উনি কি বলছেন এইটা জানা-বুঝার একটা গুরুত্ব আছে । ফলে আমরা নিচে উনার ভাষণটা হুবুহু ছাপালাম – সম্পাদক । ]

সম্মানিত রাষ্ট্রপ্রধান,

সম্মানিত সরকারি ও সাধারণ অতিথিবৃন্দ,

স্থানীয় আমার বিশপ ভায়েরা,

কূটনৈতিক পর্যায়ের মাননীয় সদস্যবৃন্দ,

ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আমি কৃতজ্ঞ মায়ানমারে এই আন্তরিক সফরের জন্য এবং ধন্যবাদ, সম্মানিত স্টেট কাউন্সিলরকে, আপনার আন্তরিক বক্তব্যের জন্য। আমি তাদের কাছেও অনেক কৃতজ্ঞ যারা এই সফরের সাফল্যের পেছনে পরিশ্রম করেছেন। সর্বপরি, আমি এসেছি দেশের ক্ষুদ্র কিন্তু উষ্ণতায় ভরপুর ক্যাথলিক কমিউনিটির সাথে প্রার্থনা করার জন্য। তাদের বিশ্বাসে নিশ্চয়তা দিতে এবং জাতীয় পর্যায়ে ভাল অবদান রাখার জন্য তাদেরকে সাহস জোগাতে । আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে মায়ানমার ও রোমান ক্যাথলিক চার্চের (Holy See: the government of the Roman Catholic Church, under the Pope) মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পরপরই এমন একটি সফরের সুযোগ হয়েছে । আমি চাই যেন এই সিদ্ধান্ত বৃহৎ জাতীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পারস্পারিক সহযোগিতা ও আলোচনার পথে একটি জাতীয় প্রতিশ্রুতির নিদর্শন হিশাবে অন্তর্ভুক্ত হয় । যদিও এটা সুশীল সমাজের কাঠামো নতুন করে গঠনের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ।

আমি আরো চাই যেন আমার সফর মায়ানমারের সমস্ত জনগণকে বুকে টেনে নেয় এবং আমি চাই যারা ন্যায়, মীমাংসিত এবং সামগ্রিক সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে, তাদেরকে সাহসিকতার বাণী শোনাতে। মায়ানমারকে দান করা হয়েছে দারুণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ভরপুর সম্পদ। হ্যাঁ, এর সবচেয়ে বড় গুপ্তধন হচ্ছে জনগণ, যারা অনেক দীর্ঘদিন-ব্যাপ্তি ও বিভেদ সৃষ্টিকারী অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও নিষ্ঠুরতা সহ্য করেছে এবং এখনো সহ্য করে যাচ্ছে । মায়ানমার জাতিকে শান্তি পুনরুদ্ধার করতে এবং ক্ষত সারিয়ে তুলতে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিকে অধিক প্রাধান্য দিতে হবে। আমি কেবল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সরকারি প্রচেষ্টার ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করতে পারি, বিশেষ করে প্যাঙলঙ পিস কনফারেন্সের মধ্যদিয়ে, যা সংঘর্ষ খতম করতে, বিশ্বাস স্থাপন করতে এবং এই ভূমির প্রতিটি দাবিদারের অধিকারের প্রতি সম্মান জানাতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির প্রতিনিধিদের একত্র করেছিল।

প্রকৃতপক্ষে, শান্তি প্রতিষ্ঠার শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া ও জাতীয় সমঝোতা তরান্বিত হতে পারে ইনসাফের প্রতি আন্তরিকতা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের ভেতর দিয়ে । পূর্বসূরীদের প্রজ্ঞা ইনসাফের সংজ্ঞা দিয়েছে– বৃহত্তর অর্থে প্রতিশ্রুত ও বিশ্বস্ত সৎ ইচ্ছা, প্রতিটি ব্যক্তিকে তার ন্যায্যতা প্রদান করার জন্য। পুরোনো যুগে নবীগণ ইনসাফকে আখ্যা দিয়েছেন সমস্ত সত্য ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তির ভিত্তি হিশাবে । দুটি মর্মান্তিক বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই সূক্ষ্ণদৃষ্টি জাতিসংঘ ও মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক ঘোষণা তৈরি করতে প্রেরণা জুগিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক জাতিগুলোর চেষ্টা হিশাবে বিশ্বব্যাপী ইনসাফ, শান্তি ও মানব-উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা করতে এবং পেশি শক্তির বদলে আলোচনার মাধ্যমে সংঘর্ষ এড়াতে । এই বিবেচনায়, আমাদের ভেতর কূটনৈতিক সৈন্য দলের উপস্থিতি জাতীয় ঐক্যমতের ক্ষেত্রে শুধু মায়ানমারের মর্যাদাই প্রমাণ করবে না; বরং এইসব মৌলিক নীতি সমুন্নত রাখতে দেশের প্রতিজ্ঞাও বজায় রাখবে । মায়ানমারের ভবিষ্যৎ হবে শান্তি । এমন শান্তি যা গড়ে উঠবে সমাজের প্রটিতি সদস্যের মর্যাদা ও অধিকার, প্রতিটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠির মর্যাদা ও পরিচয়, আইনের শাসনের প্রতি সম্মান এবং জাতীয় স্বার্থে বৈধ অবদান রাখনেওয়ালা প্রতিটি ব্যক্তিকে সক্ষমকারী গণতান্ত্রিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে।

জাতীয় সমঝোতা ও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মায়ানমারের ধর্মীয় গোষ্ঠিগুলোর বিশেষ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে । ধর্মীয় পার্থক্য অনাস্থা ও বিভেদের উৎস হওয়ার দরকার নাই । বরং তা ঐক্য, ক্ষমা প্রদর্শন, সহনশীলতা ও জ্ঞানী রাষ্ট্র গঠনের উপকরণ । ধর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মানবিক, আত্মিক ও আবেগী জায়গার বহু বছরের ক্ষত সমূহ সারিয়ে তুলতে । তারা গভীর মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে সংঘর্ষের মূলোৎপাটন করতে পারে । আলোচনার বন্ধন তৈরি করতে পারে । ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিপীড়িতদের জন্য তারা নবীদের কণ্ঠস্বর হতে পারে । এটা একটি আশার কথা যে, দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের জ্ঞানী ব্যক্তিরা এক সাথে কাজ করার চেষ্টা করছে শান্তি কায়েমের জন্য ঐক্য এবং পারস্পারিক সম্মানের বোধ থেকে । দরিদ্রদের সাহায্য করতে ও বিশুদ্ধ মানবিক ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা প্রদান করতে । সংহতি ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য টিকিয়ে রাখতে এবং আগামী প্রজন্মের উন্নয়নের জন্য জনগণের স্বার্থ ও অপরিহার্য নৈতিক ভিত্তি বিশেষ অবদান রাখছে ।

দেশের ভবিষ্যৎ এখন তরুণ প্রজন্মের হাতে । তরুণরা হচ্ছে লালিত স্বপ্ন । যদি তাদেরকে সঠিক কর্মসংস্থান ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের সুযোগ করে দেয়া হয় তাহলে তারা অবশ্যই একদিন এর সমৃদ্ধ প্রতিদান দেবে । এটা আবশ্যকীয় অপরিহার্যতা প্রজন্মান্তরের ইনসাফের জন্য । মায়ানমারের ভবিষ্যৎ দ্রুত গতিতে পরিবর্তন হচ্ছে । পারস্পারিকভাবে সংযুক্ত দুনিয়া এখন তাকিয়ে আছে এর তরুণ সমাজের প্রশিক্ষণের দিকে । শুধুমাত্র কারিগরি ময়দানেই নয়, বরং সবকিছুর ওপরে সততা, নৈতিক মূল্যবোধ, শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক সংহতির প্রতি যা নিশ্চিত করতে পারে গণতান্ত্রিক পরিসর, অভিন্ন থাকার বর্ধনশীলতা এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে শান্তি । এটা জরুরি যে, তরুণরা কখনোই আশাহত হবে না । এবং তাদের মেধা ও আদর্শ দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে এবং প্রকৃতপক্ষে, আমাদের সমগ্র মানব পরিবার গঠনে ব্যয় করবে ।

মাননীয় স্টেট কাউন্সেলর, প্রিয় বন্ধুগণ:
বর্তমান সময়ে আমি আমার ক্যাথলিক ভাইদের ও বোনদের উৎসাহ দিতে চাই যেন তারা নিজ বিশ্বাসে অটুট থাকে এবং অব্যাহতভাবে প্রকাশ করে যায় ভ্রাতৃত্ব ও মিলনের বার্তা, সামগ্রিকভাবে সমাজের কাজে আসে এমন দাতব্য ও মানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে। এটাই আমার আশা যে, সদিচ্ছা সম্পন্ন প্রতিটি নারী-পুরুষ এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে সম্মান পূর্ণ সহযোগিতা দ্বারা তারা এই প্রিয় জাতির উন্নতি ও ঐকতানের জন্য একটি যুগের উদ্বোধন করতে সাহায্য করবে । মায়ানমার দীর্ঘজীবী হোক। আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি । এবং প্রার্থনা করছি শুভ কামনার জন্য আপনাদের জাতীয় স্বার্থের প্রতি । আমি আপনাদেরকে আহ্বান জানাচ্ছি প্রজ্ঞা, শক্তি ও শান্তির পরম সুখের প্রতি।

# ছবি নেয়া হয়েছে Vatican Radio সাইট থেকে । 

 

LEAVE A COMMENT