বানান হয়ে ওঠা সময়

খোলামেলা আলোচনা ও বৈচিত্রের প্রতি সম্মানের মধ্যদিয়েই একটি জনগোষ্ঠি বিভেদ দূর করতে পারে– পোপ ফ্রান্সিস

[৩০ নভেম্বর, ২০১৭ বৃহস্পতিবার ঢাকায় রাষ্ট্রপতির বাসভবনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ ও কূটনীতিকদের সাথে সাক্ষাৎকালে পোপ ফ্রান্সিস যে বক্তৃতা করেন সেইটা Vatican Radio’ সাইট থেকে বানানের জন্য অনুবাদ করেন কবি মাহমুদুল হাসান । নিচে তা হুবুহুব ছাপলাম । এর আগেও মিয়ানমারের রাজধানী নাই পে তাউ কনভেনশন সেন্টারে ২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার পোপ ফ্রান্সিস যে ভাষণ দিয়ে ছিলেন সেইটা ‘Vatican Radio’ সাইট থেকে বানানে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছিল । ]  




মাননীয় রাষ্ট্রপতি,

সম্মানিত সরকারি ও সাধারণ অতিথিবৃন্দ,

স্থানীয় আমার বিশপ ভায়েরা, কূটনৈতিক পর্যায়ের মাননীয় সদস্যবৃন্দ,

ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে প্রথমেই আমি আপনাকে– মাননীয় রাষ্ট্রপতি, ধন্যবাদ জানাতে চাই উষ্ণ অভ্যর্থনায় এই দেশে আমাকে আন্তরিক আমন্ত্রণ জানানোর জন্য । আমার দুজন পূর্ব পুরুষ পোপ পল ষষ্ঠ ও পোপ জন পল দ্বিতীয় এর পদাঙ্কন অনুসরণ করে আমি এখানে এসেছি আমার ক্যাথলিক ভাই ও বোনদের সাথে প্রার্থনা করতে এবং তাদেরকে স্নেহ ও অনুপ্রেরণা জোগাতে । বাংলাদেশ একটি নতুন রাষ্ট্র হলেও পোপদের অন্তরে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে । বাংলাদেশের জনগণের সাথে তারা শুরু থেকেই সংহতি প্রকাশ করে এসেছে । প্রাথমিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে একসাথে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে । উন্নয়ন ও জাতিগঠনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করেছে । এই মজলিশে সভাপতিত্ব করতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ । আশা করি এই মজলিশ বাংলাদেশের সমাজের ভবিষ্যৎ গঠনে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ববোধ সম্পন্ন নারী-পুরুষকে এক কাতারে হাজির করেছে ।

বাংলাদেশে আসার পথে আমাকে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সোনার বাংলা । ছোট ও বড় অজস্র নদীনালা ও খাল বিলে পরিপূর্ণ । এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য জাতি হিশাবে আপনাদের নির্দিষ্ট পরিচয়ের প্রতীক। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অস্থিরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এমন একটি জাতি রাষ্ট্র যা বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা বজায় রেখে ভাষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন তৈরি করতে বদ্ধ পরিকর ।

রাষ্ট্র কিম্বা জাতিগোষ্ঠি, আজকের বিশ্বে কোন সম্প্রদায়ই একক প্রচেষ্টায় টিকে থাকতে ও উন্নতি করতে পারে না । একটি মানব পরিবারের সদস্য হিশাবে আমাদের একে অপরকে দরকার এবং আমরা পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল । রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন । তাই তিনি জাতীয় সংবিধানে এই মূলনীতি কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন । তিনি একটি আধুনিক, বহুত্ববাদী ও সামগ্রিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন । যেখানে প্রতিটি নাগরিক ও সম্প্রদায় সবার প্রতি সমান অধিকার ও সহজাত সম্মান বোধ নিয়ে স্বাধীনতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ভেতর বসবাস করতে পারে । এই সদ্য গণতান্ত্রিক দেশের ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক জীবনের সুস্বাস্থ্য জরুরি ভাবে সংযুক্ত ওই মৌলিক স্বপ্নের বিশ্বস্ততার সাথে । শুধুমাত্র খোলামেলা আলোচনা ও বৈধ বৈচিত্রের প্রতি সম্মানের মধ্যদিয়েই একটি জনগোষ্ঠি বিভেদ দূর করতে পারে, একপক্ষীয় সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি চিনতে পারে । কেননা সত্যিকারের আলোচনা ভবিষ্যতের পথ দেখায় । এটা গণমানুষের স্বার্থে ঐক্য গঠন করে এবং প্রতিটি নাগরিকের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকে; বিশেষ করে যারা দরিদ্র, সুবিধা বঞ্চিত ও কণ্ঠস্বরহীন ।



সাম্প্রতিক মাসগুলোয়, উদারতা ও সংহতির তেজস্বিতা- বাংলাদেশি সমাজকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করছে- যা রাখাইন রাজ্য থেকে ধেয়ে আসা শরণার্থীদের প্রতি মানবিকতায় আরো প্রাণবন্ত হয়েছে । বাংলাদেশিরা তাদেরকে সাময়িক আশ্রয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস প্রদান করছে । এটা কোন ছোটখাট কুরবানি নয় । বরং তামাম দুনিয়ার চোখে এটা একটা বিরাট কিছু । আমরা কেউই অক্ষম নই পরিস্থিতির গুরুতরতা, ভয়াবহ আকারের নির্মানবিকতা এবং আমার অগণিত ভাই-বোনদের অনিশ্চিত জীবনযাপন উপলব্ধি করতে । ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবিরের অসহায় মানুষগুলোর বেশির ভাগই নারী ও শিশু । এটা জরুরি যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এই সমস্যার গভীরতা আঁচ করে । গণহারে মানুষকে ঘরছাড়া করেছে এই রাজনৈতিক ইস্যুর সমাধান করলেই হবে না । বরং তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের ডাকে সাড়া দিয়ে কার্যকারী, বাস্তবসম্মত ও জরুরি মানবিক সাহায্য পাঠাতে হবে ।

আমার এই সফর প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ক্যাথলিক কমিউনিটির সাথে সম্পর্কিত হলেও আগামীকাল আমি রমনায় ভিন্ন ভিন্ন চার্চের নেতা এবং আন্তঃধর্মীয় নেতাদের সাথে কিছু চকৎকার মুহূর্ত কাটাবো । আমরা একসাথে শান্তির জন্য প্রার্থনা করবো এবং শান্তির স্বপক্ষে আমাদের অঙ্গীকার পুনঃব্যক্ত করবো । বাংলাদেশ আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থানের ক্ষেত্রে বেশ পরিচিত । যা এখানে পরম্পরাগত ভাবেই সব ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বিদ্যমান । পারস্পারিক সম্মানের এই পরিবেশ এবং আন্তঃধর্মীয় আলোচনার বর্ধনশীল সুবাতাস বিশ্বাসীদেরকে স্বাধীনভাবে জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের হৃদয়ের গহীনের স্বীকারোক্তি প্রকাশ করতে সক্ষম করে তোলে । এই পথেই তারা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রাখে । যা একটি ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ সমাজের নিশ্চিত ভিত্তি । বর্তমান বিশ্বে, যেখানে ধর্ম প্রায়শই– কলঙ্কজনক ভাবে- কারো স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অপব্যবহার করা হয়, সেখানে একটি সন্ধি ও ঐক্যের প্রত্যক্ষ শক্তি আরো বেশি জরুরি । গতবছর ঢাকায় একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির সন্ত্রাসী আক্রমণের মধ্যদিয়ে এমন সাধারণ ঘৃণার ঘটনা ঘটেছে । এবং যেখানে জাতীয় ধর্মীয় পণ্ডিতদের কাছ থেকে পরিষ্কার বার্তা এসেছে যে ঈশ্বরের পবিত্র নামে মানবজাতির বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সন্ত্রাস চর্চা করা কোন ভাবে বৈধতা পাবে না ।

বাংলাদেশে ক্যাথলিকদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম হলেও তারা দেশের গঠনমূলক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী । বিশেষ করে তাদের স্কুল, ক্লিনিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে । বাংলাদেশের চার্চগুলো অনুমোদন করে বিশ্বাস চর্চার স্বাধীনতা, চেরিট্যাবল কাজকাম, যা সমগ্র জাতির উপকারে আসে । এছাড়াও চার্চ ভবিষ্যতের প্রতিনিধি তরুণ প্রজ্ন্মকে পরিচ্ছন্ন নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সরবরাহ করে । শিক্ষাব্যবস্থায় চার্চ বহুমুখী সংস্কৃতি শিক্ষা দান করে যা ছাত্রদেরকে সমাজ জীবনে দায়িত্বশীল করতে সহায়তা করে । যেখানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এবং অনেক শিক্ষকই এইসব স্কুলে ক্রিশ্চিয়ান নয়, ভিন্ন ধর্মীয় ট্র্যাডিশন থেকে আসা । আমি আত্মবিশ্বাসী যে, এই পত্রের বর্ণনা ও জাতীয় সংবিধানের প্রেরণা অনুযায়ী ক্যাথলিক কম্যুনিটি ভাল কাজ করার সুযোগ উপভোগ করে যাবে বৃহৎ স্বার্থে তাদের প্রতিজ্ঞার প্রতিফলন হিশাবে ।



মাননীয় রাষ্ট্রপতি, প্রিয় বন্ধুগণ,
আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ এবং আমি আমার প্রার্থনায় আপনাদের নিশ্চিত করছি যে, আপনাদের সুউচ্চ দায়িত্বসমূহে আপনারা সবসময় অনুপ্রাণিত হবেন সুমহান ইনসাফের আদর্শ ও আপনাদের নাগরিকদের সেবা প্রদানে । আপনাদের জন্য এবং বাংলাদেশের সমস্ত নাগরিকের জন্য পরম শক্তিমানের কাছে ঐক্য ও শান্তির সৌভাগ্য প্রার্থনা করছি ।

# এখানে ছবির নেয়া হয়েছে এপি এবং রয়টার থেকে ।  

LEAVE A COMMENT