বানান হয়ে ওঠা সময়

ফকির মওলা, কিশোর আর আমরা পরস্পরকে দেখতাছি !

মোহাম্মদ রোমেল

গত দুইদিন আমার ঘুম, কাজের রুটিন সব উল্টাপাল্টা হইয়া গেছে । ফয়সাল রহমান কিশোর মইরা গেছে যতক্ষণ জাইগা আছি এইটা মনরে মানাইতে পারতাছি না । সব বন্ধ কইরা ঘরে বইসা থাকতে ইচ্ছা হইতাছে । আমার সাম্প্রতিক পরিচিত জনের কোন মৃত্যুর খবর এমন কইরা আমারে অস্থির করে নাই । কেন এমন লাগতাছে ? সেইটা বুঝতে হয়ত আরেকটু সময় লাগবে ! ফেইসবুক খুলে কয়েকবার তাঁর প্রোফাইলে ডু মারলাম । বারবার তাঁর কাভারে সাঁটা ফকির মাওলা বক্সের ছবিতে চোখ আটকায় যাইতাছে । ছবিটা দেখলাম ২০১২ তে আপ করা । ২০১২ তে ফকির মওলা বক্স পর্দার আড়াল হইছিলেন। যারা মওলা বক্সকে চিনেন তাঁরা জানেন উনি অনেক বড় মাপের সাধক-গায়ক ছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০১২ পর্যন্ত লালন আখড়ায়-বাইরে ফকির মওলা বক্সের সাথে আমার ৮ বছরের নানান মেমোরি গাঁথা আছে । ফলে কিশোরকে খুঁজতে গিয়ে মাওলার সাথে দেখা হইয়া যাইতাছে । কিশোরের কাভারে মাওলার ছবির দিকে তাকায় থাকতে থাকতে মনে হচ্ছে মাওলা পর্দার আড়াল থেকে আমাদের দিকে তাকায় আছেন । যেন ফকির মওলা, কিশোর আর আমি পরস্পরকে দেখতাছি ! যেন বাংলার ভাবের অন্যতম কেবলা নদীয়ার এই সাধক আমাদের ডাইকা জড়ো করেছেন স্মৃতির যৌথজালে !



                                          



 

কিশোর বয়সে আমার অল্প ছোট হলেও আমরা একই সময়ে বেড়ে উঠা একই জেনারেশন যারা ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়ে উঠলেও সমাজ পরিবর্তনের লড়াই-সংগ্রামের দিক থেকে একই স্পিরিটের ছিলাম। ছিলাম আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক-সামাজিক-কালচারাল ফিল্ডে গণবিরোধী যেসব বাসনা আছে সেই সব থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে অন্যদের নিয়ে কিভাবে নতুন সমাজ-রাষ্ট্র গড়ে তোলা যায় সেই পথের যাত্রী। আমাদের কিছুই ঠিক নাই সমাজ-রাষ্ট্রে একজন লড়াক মনের মানুষের নিজের কাজের জন্য নিজেকে স্কিল করে গড়ে তোলা কতটা কঠিন সেইটা লায়েক মাত্রই জানেন । কিশোর প্রস্তুত হওয়ার দীর্ঘ জার্নি শেষে যখন কাজ শুরু করলেন তখনই চলে গেলেন ! এই পচা সমাজ ভেঙ্গে বড় জায়গা থেকে যারা গড়ে তুলতে চায় এমন মনের-কাজের সক্ষম মানুষ বেশি নাই আমাদের আশে-পাশে । কিশোরকে হারানো সেই দিক থেকে আমাদের বড় ক্ষতি ।

কিশোরের কাজের ফোরাম-সঙ্গ ভিন্ন হলেও আমাদের রাস্তায়-ছবির লড়াইয়ে আড্ডা-পাঠচক্রে একথাকে সময় কেটেছে । আমাদের রেগুলার দেখা হত না । কিন্তু দেখা হলেই কিশোর খুব আন্তরিক ভাবে জানতে চাইত এখন কি কাজ করছি ? আমি হেয়ালি করে বলতাম কিসের কাজ– আড্ডাবাজি আর ঘুইরা বেরাইতাছি ! কিশোর আমার কাজের কিছুটা খবর জানত বলেই রাস্তায় চা খাইতে খাইতে আমাদের আলাপ রাজনীতি-সিনেমা-প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-কৃষি ইত্যাদি নানান দিকে বিস্তার ঘটত। কিশোরের সাথে আলাপে আমার আরাম লাগত । আলাপে কিশোর এতো স্পেইস দিত, কোন বিষয়ে ভিন্ন মতকে এতো আন্তরিক ভাবে ঠাণ্ডা মাথায় শুনত এবং তাঁর মত বলত যে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তহীন আলাপ করে যেতে পারতাম । কোন বাড়তি কথার বাহাদুরি ছিলনা । ছিলনা পাণ্ডিত্য নিয়া অতি জাহিরিপনা কিনবা অহংকার । বিভক্তি চিন্তা আর সংকীর্ণ ইগোতে ঠাসা আমাদের জেনারেশনের খুব কম মানুষ এই গুণ অন্তরে এবং আচরণে লালন করেন । ফলে কিশোরের সাথে যখনই আমার দেখা হয়েছে আমাদের দুই-চার বাক্য বিনিময় হয়েছে । আফসুস কিশোরের মিষ্টি হাসির মধ্যে জন্ম হওয়া সেই সব শব্দ আর বিনিময় সম্ভব হবে না ।

আমরা যখন ‘বানান’ শুরু করি ঢাকায় বন্ধুদের মধ্যে যারা আন্তরিক ফিডব্যাক দিয়েছেন কিশোর একজন । উৎসাহ দেয়ার জন্য প্রায়ই বলতেন ভাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন । কাজটা বন্ধ কইরেন না ।

আমাদের খাদ্য নষ্ট হয়ে গেছে বহু আগে । আমরা বিষ খাইয়া বাইচা আছি । আমাদের কৃষি, বীজ বিদেশী কর্পোরেশনের দখলে চলে গেছে-যাচ্ছে প্রতিনিয়ত । এইসব নিয়ে প্রগতিশীল কিনবা অন্য রাজনৈতিক কর্মীদের বুঝাপড়া কিনবা আগ্রহ কম সমাজে । খালি হাওয়ায় দেশ প্রেম । কিশোর এবং তাঁর একদল বন্ধুরা এইসব নিয়া সরব ছিলেন মাঠে, লেখায়, নানান মিডিয়াম এবং যাপনে । ফলে জন দুশমনদের কবল থেকে প্রাণ-প্রকৃতি-বীজ রক্ষার তাগিদে যে নানান ধরণের কাজ করছিলেন বন্ধুরা মিলে তাঁর যৌথ ফসল প্রামাণ্যচিত্র ‘বিটিবেগুন বিসম্বাদ’। অনেকটা এক সাথে হাজির হওয়া, গড়ে উঠার যৌথ চর্চার নমুনাও । নগদ লুটের এইসময়ে দীর্ঘ দিন লেগে থেকে গবেষণা করে, নিজেদের-বন্ধুদের চাঁদায় এই ধরণের কাজ বিরল আমাদের এই না-লায়েক সমাজে । ফলে কিশোরদের প্রামাণ্যচিত্র ‘বিটিবেগুন বিসম্বাদ’ এর শো’তে আমি উচ্ছসিত হই । এই নিয়া বানানে পরের দিনই প্রায় ৪৩ মিনিটের ভিডিও কনটেন্ট এডিট করে ছেড়ে দেয়া দায়িত্ব ভাবি । আমরা কথা বলতে থাকি অনেক বিষয়ে । বাংলাদেশের হেলথ, সুন্দরবন ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে যৌথ ভাবে কি কাজ করতে পারি সেই আলাপও আমরা করেছিলাম । হায় আমাদের কিছুই হল !

আজ ভাবছি– ফয়সাল রহমান কিশোরের জন্য আমার কোন শোক করা উচিত হবে না । কারণ আমি জানি কিশোর তাঁর বেঁচে থাকার প্রতিটা মুহূর্ত কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছেন । নিজেকে এবং অন্যকে গড়ে তোলতে ব্যয় করেছেন । তাঁর সময়ে অসংখ্য তরুণকে গড়ে উঠতে নীরবে ভূমিকা রেখেছেন । ফলে ফয়সাল রহমান কিশোর আমার কাছে শোক নয়; অন্যের-সমাজের সাবালোক হয়ে উঠার প্রেরণা । মওলার দোহাই শান্ত-সাধু ভাবের বন্ধু ফয়সাল রহমান কিশোর– আমরা আপনার মত নীরবেই এই প্রেরণা বহন করার চেষ্টা করব ! হয়ত এইভাবেই কিশোর থেকে কিশোরে, আমাদের যৌথভাবে অনন্ত কাল হয়ে উঠার মধ্যে বেঁচে থাকার সাধনা করা ছাড়া অন্য কোন কাজ নাই !

সালাম কমরেড ফয়সাল রহমান কিশোর !

১ ।। ‘বিটিবেগুন বিসম্বাদ’ ফিল্ম নিয়ে আলাপের লিঙ্ক – 

বেগুন চুরি এবং বিটি বেগুন: প্রকৃতি ও মানুষ বিকৃতির নয়া কৌশল

২।। ‘বিটিবেগুন বিসম্বাদ’ ফিল্মের ইউটিউব লিঙ্ক – https://www.youtube.com/watch?v=FP6og0Pjxe8

LEAVE A COMMENT