বানান হয়ে ওঠা সময়

সলিমুল্লাহ খান ‘সাধু’ গদ্যে লেখেন কেন?




[ কিছুদিন আগে সলিমুল্লাহ খান জন্ম লইয়া ষাট বছর পার হইছেন । উনার বন্ধু-ভক্তজনরা সেইটা সেলিব্রেট করছেন । আমরাও তারপ্রতি শ্রদ্ধা জানাই । ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে ‘লোক’ সাহিত্যবিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন ‘লোক সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭’ সলিমুল্লাহ খানকে দেয়া হয় । সলিমুল্লাহ খানকে নিয়ে ‘লোক’ বিশেষ সংখ্যাও করেন । সেই সংখ্যায় মোহাম্মদ আজমের
সলিমুল্লাহ খান ‘সাধু’ গদ্যে লেখেন কেন? এই লেখা আছে । সলিম খান এবং ভাষা বিষয়ে ঢাকায় চলতি তর্কের বিষয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু অব্জারবেশন এই লেখাটায় পাইবেন । আগ্রহীরা পড়তে পারেন । সম্পাদক ]



মোহাম্মদ আজম

এ প্রশ্নের উত্তর বিচড়াবার ছলে আমি আসলে আমাদের শিক্ষক সলিমুল্লাহ খানের ষাট বছর
পূর্তিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে চাই। শিরোনামে ‘সাধু’ শব্দের কানে সন্দেহবাচক উদ্ধৃতিচিহ্ন
বসিয়ে আমি কয়েকটি ব্যাপারে নিজের ‘আলাদা’ অবস্থান জানিয়ে রাখলাম। প্রথমত, আমি
হয়ত একে, মানে সলিমুল্লাহ খান আজকাল যা লেখেন তাকে, সাধু গদ্যই মনে করি না। অর্থাৎ
এই নামে আমার পোষায় না। দ্বিতীয়ত, যেমনটি অন্য প্রসঙ্গে একদা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লিখেছেন, ‘সাধু’ নামটা হয়ত এ স্থলে ‘অসাধুতা’রই নামান্তর। তৃতীয়ত, প্রশ্নটি হয়ত
আমার নয়। আর কারো। বা কারো কারো।

প্রথমে তৃতীয়টি থেকেই শুরু করা যাক। সে বহু বহু দিন আগের কথা। আরবের লোকদের অবস্থা
এখনো জঘন্য আছে, তখনো অনেক খারাপ ছিল। ২০০১ সাল। সম্ভবত। তখন আমি সলিমুল্লাহ
খানকে প্রথম দেখি। দেখি যে, এক ঝুঁটিওয়ালা লোক। আমরা তখন অধ্যাপক আহমদ শরীফের বাসার
নিচতলায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের নেতৃত্বে ‘স্বদেশ চিন্তা সংঘ’ নামের আহমদ
শরীফ-প্রতিষ্ঠিত এক সংগঠনের ছায়ায় শুক্রবার সকালের আড্ডায় শরিক হতাম। আমরা সবাই মিলে
বেশ বাঙালি ছিলাম; অর্থাৎ যথেষ্ট পরিমাণে বাংলা ভাষা ও বাংলা অঞ্চলে লিপ্ত ছিলাম। কলকাতায়
আমাদের আসক্তি বেশ পাকা ছিল; আর ইতিহাস, রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে ফি-হপ্তায় প্রবন্ধ
উপস্থাপিত হত। শরীফ সাহেবের বাসা থেকে প্রতি সভার জন্য নাস্তা-পানির বন্দোবস্ত হত। আমরা
বেশ আগ্রহ সহকারে খেতাম। সভার প্রবীণ সদস্যরা বিস্তর কথা বলতেন এবং সময়-সুযোগ
মতো কিছু পরিমাণে ঘুমিয়েও নিতেন। আমরা তুলনামূলক নবীনরা বড়দের সাথে এন্তার তর্ক-
বিতর্ক করে এবং প্রায়শই প্রবন্ধ উপস্থাপন করে যথেষ্ট প্রত্যয়ী হয়ে উঠেছিলাম। ঠিক এসময়ে
একদিন সলিমুল্লাহ খান এলেন। তাঁকে কেউ কেউ চিনতেন। আমি চিনতাম না। এমনকি
আগে তাঁর নামও শুনি নাই। পরে তাঁর পূর্বকীর্তির কথা এত জনের মুখে এত শুনেছি যে, আমি
ভেবে অবাক হই, আগে তাঁর নাম কানে আসে নাই কেন?

 

তো, একদিনের সভাশেষে আমরা কয়েকজন মিলে বোধ হয় আহমদ শরীফের দ্বিতীয় স্মারকগ্রন্থের
প্রুফ দেখার কাজ করছি, এমন সময় সলিমুল্লাহ খান এলেন। সঙ্গে কচি ভাই। এদিক সেদিক
কিছু কথা বলার পর পরিষ্কার হল, সলিমুল্লাহ খান এসেছেন তাঁর আসন্ন সেমিনারের জন্য
‘ছাত্র’ সংগ্রহ করতে। তখন এই ‘সেমিনার’ কথাটার সাথে আমাদের পরিচয় ছিল না। পরে
তাঁর বহু ‘সেমিনারে’ উপস্থিত থেকে এ বস্তুর সাথে আমার ভালোই চিন-পরিচয় হয়েছে।
কোনো একটা বিষয়ে সপ্তাহে একদিন ঘণ্টা দুয়েক করে তিনি ধারাবাহিক বক্তৃতা দিতেন।
মোটামুটি তিন মাস ধরে চলত। ঢাকায় আমাদের শব্দভান্ডারে এ জাতীয় ‘সেমিনার’ শব্দের
কোনো উপস্থিতি না থাকায় আমরা এ পরিকল্পনায় বেশ হকচকিয়ে গেলাম। তবে তাঁর প্রস্তাবিত
বিষয়টা আমাদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় মনে হল। তিনি ‘কবিতা ও সিভিল সোসাইটি’ বা
এ জাতীয় কোনো বিষয়ের কথা বলেছিলেন। সেখানে বোদলেয়ার, রোকে ডালটন ইত্যাদি জনা
পাঁচেক কবির কবিতা পড়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। কথাবার্তায় আমরা ততক্ষণে বুঝে গেছি,
আমাদের মধ্যে তুলনামূলক বয়স্করা সলিমুল্লাহ খানের ব্যাপারে আগে থেকেই ওয়াকিবহাল। তাঁদের
বাতচিতে বেশ একটা সম্ভ্রমের ভাব প্রকাশ পাচ্ছিল। তাতে আমাদের মতো না-ওয়াকিফ ব্যক্তিরা
তাঁর আমেরিকা-প্রবাসের আগের ঢাকার দিনগুলোর তৎপরতার গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু ইশারা
পাচ্ছিলাম। ফলে তাঁর ছাত্র হতে আমাদের আপত্তি ছিল না। আমরা আসন্ন সেমিনারের জন্য
মুখিয়ে আছি এমন একটা ভঙ্গিতে তাঁকে আশ্বস্ত করতে চাইলাম। কিন্তু বাধ সাধলেন কচি
ভাই। তিনি সংগঠক মানুষ। অত রসিক হলে তাঁর চলে না। বেরসিকের মতো তিনি বললেন, সবাই
ওই সেমিনারে বসার সুযোগ পাবে না। বাছাই করে যোগ্যতা যাচাই করে সদস্য নেয়া হবে।
তাঁর এ কথায় আমরা বোধ হয় খানিকটা অপমান বোধ করেছিলাম। আমাদের মধ্যে কিছু বেশি
বয়সি আমজাদ ভাই ছিলেন। ব্যাংকে চাকরি করতেন। অল্প লিখতেন; কিন্তু বেশি পড়ার জন্য তাঁর
সুনাম ছিল। আমি তখন কলেজে বাংলা পড়াই। আমজাদ ভাইয়ের ছেলে ওই কলেজের ছাত্র। ছেলের
শিক্ষক হিসাবে তিনি বোধ হয় আমাকে কিছু বাড়তি মূল্য দিতেন। তিনি নিজেকে এবং
আমাকে ইঙ্গিত করে চোখ-মুখ-গলায় যথেষ্ট পরিমাণে বিস্ময় আমদানি করে জিজ্ঞাসা করলেন,
আমাদেরকেও পরীক্ষা দিতে হবে? উত্তরে সলিম ভাই বা কচি ভাই কী বলেছিলেন এখন আর মনে নাই।
অনুমান করা যায়, এ ধরনের আলাপের পর আগের উষ্ণতা আর বজায় থাকে নাই। কিছু শীতলতার মধ্যে
আলাপ শেষ হয়েছিল। তখনই অবশ্য সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সলিম ভাই পরের সপ্তাহে ‘স্বদেশ চিন্তা
সংঘে’ জাক লাকাঁ সম্পর্কে বক্তৃতা দেবেন। পরের দিনগুলোতে ঢাকায় তাঁর নামের সাথে জাক
লাঁকার নাম যে ওতপ্রোত হয়ে উঠেছিল, ওই বক্তৃতাই বোধ হয় তার আনুষ্ঠানিক সূচনা।

 

দু-চার হপ্তা যেতে-না-যেতেই শুনি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মিলনায়তনে সলিমুল্লাহ খানের
সেমিনার শুরু হয়ে গেছে। কচি ভাই ভালো খেইল দেখিয়েছেন। উত্তম সংগঠকের খেইল। বিভিন্ন
চ্যানেলে খবর পৌঁছানোর বন্দোবস্ত করেছেন। ঢাকার জ্ঞান-বুভুক্ষু তরুণরা এবং কিছু
সংখ্যক তরুণীও কেন্দ্রের মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ করে হাজির হচ্ছে। আমি সংবাদ
পেলাম একাধিক সূত্র থেকে। শুনে পিছিয়ে পড়ার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার আশায় তৃতীয় বৈঠক
থেকে হাজিরা দিতে শুরু করলাম। সেই থেকে শুরু করে পরের অন্তত দশ-বার বছর সলিমুল্লাহ খান যে
বিচিত্র বিষয়ে সেমিনার দিয়েছেন তার প্রায় সবগুলোতেই আমি সবান্ধব হাজির ছিলাম।
আমাদের বয়সী বা কাছাকাছি বয়সীদের গুরুত্বপূর্ণ একাংশ এবং অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের কেউ
কেউ এসব সভায় অংশ নেয়া শুরু করলে ব্যাপারটাকে ঢাকার স্টান্ডার্ডে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক
বিপ্লবের মতোই মনে হচ্ছিল। সলিম ভাইয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক আস্তানার ব্যবস্থাপনা প্রধানত কচি
ভাই করতেন। এ আস্তানা বিভিন্ন সময়ে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, মোহাম্মদপুর, এলিফ্যান্ট রোড,
ধানমন্ডি প্রভৃতি জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছে। তাতে উপস্থিতির ইতরবিশেষ হয়নি। মাঝে
কিছুদিন ফরহাদ মজহারও এ প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছিলেন। বিশেষত হেগেল আর মার্কস পড়ার
কালে। কত বিচিত্র বিষয়ে যে সলিমুল্লাহ খান সেমিনার দিয়েছেন তার লেখাজোখা নাই।
প্লেটো থেকে লাকাঁ, বাংলা গদ্য থেকে বঙ্কিমচন্দ্র, এমনকি ভাষাশিক্ষা পর্যন্ত। এসব তৎপরতা
থেকে আমার দুটি ধারণা হয়েছিল। এক. ঢাকায় এযাবত পশ্চিমা বিদ্যায় পারঙ্গম যেসব মানুষ
আবির্ভূত হয়েছেন, তার মধ্যে সলিমুল্লাহ খানের প্রস্তুতির গভীরতা এবং বিস্তার সর্বোত্তম।
দুই. ঢাকার বহুল কাক্সিক্ষত বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের প্রথম ধাপ এ প্রক্রিয়াতেই সম্পন্ন হতে
যাচ্ছে। দ্বিতীয়টি যে হয় নাই, তা তো এখনি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে। প্রথমটির ব্যাপারে
অবশ্য আমার নিশ্চয়তা দিনকে দিন বেড়েছে।

 

এবার কাজের কথায় আসি। আমি লক্ষ করলাম, সলিমুল্লাহ খানের আগ্রহের পরিধি যথেষ্ট ব্যাপক
হলেও তাঁর রাজনৈতিক-মতাদর্শিক পক্ষপাত মোটামুটি স্পষ্ট। সে পক্ষপাত পশ্চিমা দার্শনিক
সিলসিলার কোনটিকে তিনি গুরুতর মনে করেন তা থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের ধারা এবং
বাংলা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিবৃত্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বভাবতই বাংলাদেশের
বুদ্ধিবৃত্তিক-সাংস্কৃতিক চর্চার প্রভাবশালী ধারার যাকে অন্য সুবিধাজনক শব্দের অভাবে
সংক্ষেপে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ ধারা বলা যেতে পারে এবং যার মধ্যে বাংলাদেশের আওয়ামী
এবং বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা একত্রে ক্রিয়া ও ক্রীড়া করেন, তাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক বিরোধমূলক
হয়ে ওঠে। এ ধরনের বিরোধীরা তাঁর সম্পর্কে কয়েকটি অভিযোগ হামেশাই উত্থাপন করতেন। না,
তাঁর পাণ্ডিত্যের ব্যাপারে কোনো গুরুতর প্রশ্ন ওঠেনি। সে ধরনের প্রশ্ন ওঠার জন্য যে
সামাজিক প্রস্তুতি দরকার, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সে ধরনের
চর্চা কখনোই ছিল না, এবং এখনো নাই। তাঁরা বলতেন, সলিমুল্লাহ খানের বক্তৃতা শুনতে ভালো
লাগে, কিন্তু কী বলেছেন তা ধরা যায় না। তাঁর লেখার ক্ষেত্রেও একথা অনেককে বলতে শুনেছি। আর
বিশেষভাবে বলতেন, সলিমের বলাবলি বা লেখালেখি বাংলাদেশের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’দের বলবান করছে।
বাংলাদেশে যারা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বসতি করেন তারা অভিযোগের এই শেষোক্ত ভাষার সাথে এত
বেশি পরিচিত যে এর আক্ষরিক বা আলঙ্কারিক তাৎপর্য সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন দেখছি
না। সলিম খান ‘সাধু’ গদ্যে লেখা শুরু করলে এ ঘরানার অভিযোগকারীরা একটা দারুণ মওকা
পেয়ে যান। ব্যাপারটাকে তাঁরা ভাওতা, খেয়ালিপনা, লোকদেখানো এবং এমনকি পশ্চাৎপদতা
হিসাবেও ব্যাখ্যা করতে থাকে। আমার পরিচিত এ ধরনের মানুষদের কারো কারো মুখেই এই
প্রশ্ন আমি অনেকবার শুনেছি আচ্ছা, সলিমুল্লাহ খান যে আজকাল সাধু গদ্যে লিখছেন
তার যুক্তিটা কী?

 

এ ধরনের প্রশ্নে আমি অবশ্য কখনোই বিব্রত বোধ করি নাই, কিংবা প্রশ্নকর্তাকে
বিশেষভাবে শিক্ষাদানের চেষ্টা করি নাই। আমি জানি, ঢাকার পরম শ্রদ্ধাভাজন পক্বকেশ অধ্যাপক
সাধু ও চলিতরীতির ফারাককে ‘সামন্ততন্ত্রীয়’ দৃষ্টিভঙ্গি এবং ‘আধুনিক’ দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক
দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। জানি, ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এবং বাংলা ভাষার ইতিহাসে
বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল অন্য এক অধ্যাপক সাধু ও চলিতের ফারাককে নিছক ক্রিয়া ও সর্বনামের
ব্যাপার মনে করেন। সাধু-চলিত সম্পর্কে এ ধরনের ‘জ্ঞান’ই আমাদের ভাষাবিষয়ক সংস্কৃতি
তৈয়ার করেছে, আর পূর্বোক্ত প্রশ্ন সেই সাংস্কৃতিক অভ্যস্ততার গভীর থেকেই উত্থিত। এ প্রশ্ন
ঠিক জিজ্ঞাসামূলক নয়, বরং সিদ্ধান্তসূচক। সিদ্ধান্তটা হল, এই কাজ করে অর্থাৎ চলিত বাদ
দিয়ে সাধু ভাষায় লিখে সলিম খান ঠিক কাজ করছেন না। তাহলে আমাকে একথা জিজ্ঞাসা করার
অর্থ কী? এ কথা ঠিক যে আমি বাংলা পড়াই, ভাষা সম্পর্কে লেখালেখি কিছু করেছি, আর
কারণে-অকারণে প্রচুর কথা বলি। কিন্তু এ প্রশ্নের গোড়া আছে অন্য জায়গায়। ঢাকার আরেক
সংস্কৃতিতে। এখানে ইউনিভার্সিটির মাস্টারদের ডিগ্রি নেয়ার প্রয়োজন ছাড়া এমনি
এমনি কারো কাছে পড়তে যাওয়াকে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হিসাবে ভাবা হয় না। তাঁরা যে
‘পড়তে’ যান না এমন নয়। তবে তাঁদের কাছে যান, যাঁরা চাকরি বা অপরাপর ক্যারিয়ার-সংশ্লিষ্ট
কাজে সাহায্য করতে পারবেন। এমতাবস্থায় ঢাকাই সংস্কৃতিতে সলিমুল্লাহ খানের, যাঁর হাতে
অন্তত প্রত্যক্ষত আমার ক্যারিয়ার-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাপার ছিল না, সেমিনারে নিয়মিত
যোগদানের একটাই অর্থ হতে পারে আমি তাঁর ‘চ্যালা’ বনেছি। ফলে তাঁর কায়কারবার
আমি সম্পূর্ণত ‘ওউন’ করি। ফলে তাঁর যে কোনো কাজের দায় অন্তত অংশত আমিও বহন করি।
এ সংস্কৃতি ঢাকায় এত প্রগাঢ় যে, এর সম্পর্কে আর বিশদ করে বলার প্রয়োজন দেখছি না।
কেউ কেউ যখন আমাকে সলিম খানের সাধু গদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন, তখন সে
প্রশ্নের পেছনে ওই সংস্কৃতির কালো দিকটাই প্রধান ছিল, কোনো উত্তরের প্রত্যাশা নয়। তবে
উত্তরটা আমার নিজের দরকার ছিল; এবং আমি এ সম্পর্কে কিছু তত্ত্বতালাশ করেছি।

২০১৩-র ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগ আন্দোলন শুরু হলে সলিমুল্লাহ খান সম্পর্কিত ঢাকার
মনোভঙ্গিতে প্রায় আমূল পরিবর্তন সূচিত হয়। তিনি তাঁর ‘পক্ষপাত’ বদলানোর ইশারা
দিয়েছিলেন অবশ্য আরো আগেই ঢাকার বিখ্যাত-কুখ্যাত ‘মেহেরজান’কাণ্ডের সময়ে। ব্রাত্য
রাইসু তখন বিডিনিউজ২৪ অফিসে ইতিমধ্যে বিতর্কিত হয়ে ওঠা এই সিনেমা সম্পর্কে
আলোচনার আয়োজন করেছিল। ওই সভায় সলিমুল্লাহ খান মেহেরজান-কাহিনির আদি ভাষ্যকার
এবাদুর রহমান এবং নয়া সেলুলয়েড-ভাষ্যকার রুবাইয়াতকে যৌথভাবে শায়েস্তা করছিলেন। তাঁর
‘পজিশন’ আমার পছন্দ হচ্ছিল না। আমি প্রায় জন্মসূত্রে ‘অপছন্দ’ হজম করার মতো
‘লিবারেল’। কিন্তু ওইদিন আমাকে কিছু কথা বলতে হয়েছিল। আমার জন্য কাজটা কোনো দিক
থেকেই খুব সহজ ছিল না। তবু আমাকে ঘেমে-নেয়ে এবং বিস্তর তোতলা-তোতলি করে কথাগুলো
বলতে হয়েছিল মুখ্যত এ কারণে যে, এবাদের উপন্যাসটি ওখানে অন্যদের মধ্যে শুধু আমারই পড়া
ছিল। এবং আমি জানি, এবাদের বইয়ের সাথে বর্ণিত দৃশ্যের ক্ষেত্রে রুবাইয়াতের সিনেমার
তাৎপর্যপূর্ণ ফারাক ছিল। সলিম ভাই তাঁর কথায় ওই ফারাক রক্ষা করছিলেন না। আমি কথাটা মনে
করিয়ে দিয়েছিলাম; এবং ভাবে মনে হল, আমার এই আনাড়ি তর্ক তাঁর মনঃপূত হয় নাই। যাই
হোক, পরে শুনেছি, অন্য একাধিক সভায় এবং আড্ডায় তিনি ‘মেহেরজানে’র বিরুদ্ধে স্বর
আরো চড়া করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও কিছুদিন পর যখন তিনি শাহবাগ আন্দোলনকে
কাছাখোলা সমর্থন দিয়ে বসলেন, তখন আমি এবং আমরা বেশ অবাক হয়েছিলাম। অবাক হওয়ার
মূল কারণ : শাহবাগ আন্দোলনে মতাদর্শিক আলঙ্কারিকতার প্রবল প্রতাপ সত্ত্বেও এর পার্টি-
ভিত্তি এবং ক্ষমতা-সম্পর্কের অব্যবহিত প্রত্যক্ষতা মোটেই গোপন ছিল না। পরে ক্রমশ ব্যাপারটা
রাখ-ঢাক না রেখেই ব্যবহৃত হয়েছে; কিন্তু প্রথম থেকে এটা প্রকাশ্যই ছিল।

 

‘কী ছিল বিধাতার মনে’ কে বলবে? কিন্তু আমরা দেখলাম, সলিমুল্লাহ খান তাঁর আগের কয়েক
দশকের যাবতীয় প্রস্তুতি এবং ক্ষমতা সাথে নিয়ে সক্রিয় হয়েছেন। তাঁর সক্রিয়তা শাহবাগ
আন্দোলনের ক্ষেত্রে সম্ভবত দিকনির্ণায়ক ছিল না, কিন্তু বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের
সাম্প্রতিক পর্বে নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সাথে পাঠযোগ্য ঘটনা। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও
প্রভাবশালী ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ বুদ্ধিজীবী সমাজ কাজ করে মূূলত নিরূপিত ‘সত্য’
এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। ফলে ‘সত্যে’র পরীক্ষা সাধারণত তাঁদের করতে হয় না। এসব সত্যের
গুরুত্বপূর্ণ একাংশ উৎপাদিত হয়েছিল ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের কালে।
আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ সাধারণভাবে সেকালের কিছু রেফারেন্স ব্যবহার করেন, এবং তার সূত্রে
কলকাতার পুরানা জমানার কথা তোলেন। কলকাতায় গত তিন-চার দশকে চিন্তাপদ্ধতির যে
অভূতপূর্ব বদল ঘটেছে, সে সম্পর্কে তাঁরা হয় জানেন না বা সেগুলো ব্যবহার করাকে
সুবিধাজনক মনে করেন না। আর এই সবকিছুর পেছনে আছে যে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ড তা
কার্যকরভাবে ব্যবহারের ক্ষমতা আমাদের হয় নাই বা খুব কম সংখ্যকের কম পরিমাণে আছে। ঠিক
এখানেই সলিমুল্লাহ খান আবির্ভূত হয়েছিলেন শাহবাগ আন্দোলনের কার্যকর মতাদর্শিক
অ্যাপারেটাস হিসাবে। তাঁর স্কিল, পাণ্ডিত্য এবং আবেগ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিচিত্র
মাধ্যমে। টিভি টক শো ওই মাসগুলোতে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল প্রধানত সলিমুল্লাহ
খানের প্রবল প্রতাপে। যাঁরা শাহবাগ আন্দোলনের পক্ষে বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াই করছিলেন, তাঁদের
জন্য ব্যাপারটা বেশ আরামদায়ক হয়ে উঠেছিল। সেই ইতিহাস প্রণয়ন আমার বর্তমান লেখার
আওতাভুক্ত নয়। এখানে কেবল এ কথা বলাই যথেষ্ট হবে যে, শাহবাগ আন্দোলনে সক্রিয়তার এই ধরন
সলিমুল্লাহ খানের পক্ষ-বিপক্ষের পূর্বতন মানচিত্র প্রায় সম্পূর্ণই পালটে দিয়েছিল। তার
খানিক ইশারা দেয়ার আগে আমার নিজের কথাটা বলে নেয়া দরকার।

 

সলিমুল্লাহ খানের প্রতি গত আঠার বছর ধরেই আমার এক ধরনের অটল পক্ষপাত আছে। আমার
বন্ধুদের অনেকেই এতে বিরক্তি এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের কখনো
বলা হয় নাই, সলিম ভাইয়ের প্রতি আমার এই পক্ষপাত সাবজেক্টিভ ব্যক্তিগত দীনতাজাত, ফলে খুব
গভীর। আমি প্রথম যৌবনে বিজ্ঞান ছেড়ে কলায় পড়তে এসেছিলাম কলা ও সমাজবিজ্ঞানে
‘পাণ্ডিত্য’ হাসিলের নিয়তে। সে সময় ব্যাপারটা বোধ হয় অত সচেতনভাবে মনে ছিল না,
কিন্তু অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ছিল। আমি জানি, এবং অন্যরাও, আমার সে আশা পূরণ হয় নাই।
নিজে পারি নাই বলেই অন্য যারা পারে তাদের প্রতি আমার সীমাহীন দুর্বলতা। দুঃখের বিষয়,
ঢাকায় এ বাবদ চোখে-পড়া লোকের সংখ্যা এত কম যে, আমার ভক্তিযোগের মোট পরিমাণকে
বেশি ভাগে ভাগ করতে হয় নাই। সলিম খানের ভাগে কিছু বেশিই পড়েছে। আরেকটা কারণ
আছে। অব্যবহিত রাজনীতিকে আমার প্রাত্যহিক সাংবাদিকতা মনে হয়। এই দুইয়ের গুরুত্ব
বুঝলেও এবং মানলেও কাজটাকে আমি আমার জন্য বেশি উপযোগী মনে করি না। আমি জানি,
এ অবস্থানের মধ্যে সুবিধাবাদী নীরবতার সুযোগ আছে; কিন্তু কিরা-কসম কেটে বলছি, এটা
আমার স্ব-ভাব। মানুষ অভ্যাসের দাস হয়ত নয়, স্বভাবের তো বটেই। সলিম খানের লেখালেখি ও
চর্চার মধ্যে আমি দীর্ঘমেয়াদি তৎপরতাই বেশি আবিষ্কার করেছি; ফলে তাঁর প্রতি আমার
পক্ষপাত ক্রমে দৃঢ়তর হয়েছে। অব্যবহিত রাজনীতি সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সম্ভবত
শাহবাগ আন্দোলনের মতো এত বড় ঘটনাও আমাকে বিচলিত করতে পারল না। আমি প্রথম থেকেই
এ ব্যাপারে ক্রিটিকেল ছিলাম। যথাসম্ভব গভীরভাবে ঘটনাপ্রবাহ এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া খেয়াল
করছিলাম। সলিম খানের দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে বিব্রত করছিল; কিন্তু তাঁর ব্যাপারে আমি কখনোই
আশা হারাই নাই। কয়েকটি কারণে। এক. পশ্চিমা কাণ্ডে খান সাহেবের দখলের কথা আগে বলেছি।
এখন বলা যাক, দেশীয় এবং পূর্বদেশীয় জ্ঞানকাণ্ডেও সলিম বিরল দখল হাসিল করেছেন। চীন,
রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক, আফগানিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানের
পরিচয় বহুবার পেয়েছি। এমন লোকের কোনো সিদ্ধান্তই পত্রপাঠ বিদায় করা যায় না। দুই. আমি
আমার স্বভাবমতো শাহবাগ আন্দোলনকে দেখছিলাম ভাসমান হিমশৈলের প্রকাশ্য অংশ হিসাবে।
ফলে আমার দায়িত্ব দাঁড়ায় ডুবা অংশের সুলুক সন্ধান। ওই অনুসন্ধানে সলিম খানের আগের তের
বছর আমার বিশেষ কাজে লাগছিল। তিন. আমি মনে করি, তিনি যদি এমনকি কোনো বিষয়ে
‘ভুল’ সিদ্ধান্তও নেন, তিনি প্রাপ্ত ‘সত্য’ ও সিদ্ধান্তের অনুকারী হিসাবে কাজ করবেন না;
তিনি ‘সত্য’ খুঁজবেন, ফলে খোঁজার ‘পদ্ধতি’ আবিষ্কার করবেন; তিনি ‘ভাষা’ তৈরি
করবেন, এবং সেই ভাষা সঙ্গত কারণেই জনগোষ্ঠীকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে যাবে।
কথাটা আরো খুলে বললে এরকম হবে, যদি সলিমের এককালীন বিরোধীপক্ষ এখন তাঁকে
অ্যাকোমোডেড করতে চায় তাহলে তাঁদের বোধ-বোধির আওতাও বাড়াতে হবে। ফলে আমি
মোটেই উদ্বিগ্ন ছিলাম না। কিন্তু আমার একটা ছোট্ট আকাঙ্ক্ষা ছিল। আমি চাইতাম,
সলিম ভাই দু-চার পৃষ্ঠার লেখায় নিজের পূর্বতন অবস্থানের সাথে বর্তমান অবস্থানের একটা
সম্পর্কসূত্র প্রণয়ন করুক। সেটা মিল-অমিল যাই হোক না কেন। যদ্দুর মনে পড়ছে, এ ধরনের
কিছু তিনি সরবরাহ করেননি।

 

শাহবাগ আন্দোলনের সময় থেকে বাংলাদেশের অ্যাকাডেমিক-বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রভাবশালী
ধারায় সলিমুল্লাহ খানের আদর-আপ্যায়ন যথেষ্ট বেড়ে গেল। তিনি বিস্তর সেমিনার-
সিম্পোজিয়ামে দাওয়াত পাচ্ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের
এক সভায় তো বলেই ফেললেন, এখানে এ-ই তাঁর প্রথম বক্তৃতা। আমার বন্ধু ও পরিচিতদের যে অংশ
আগে সলিম খানের কথা মোটেই বুঝতে পারতেন না, তাঁদের কাছে তিনি প্রাঞ্জল হয়ে উঠলেন।
কিছুদিন আগে পর্যন্ত যিনি কারণে-অকারণে সলিম প্রসঙ্গ টেনে বিরক্তি প্রকাশ করতেন,
তাঁর সাধু গদ্যকে ভড়ং হিসাবে ব্যাখ্যা করতেন, ক্লাবে চা খেতে খেতে তিনি খোশগল্পের
ভঙ্গিতে গতরাতের টিভি টকশোর প্রসঙ্গ তুলতে লাগলেন : সলিম কাল রাতে অমুককে ধরাশায়ী করে
ফেলেছেন। বলার সময়ে তাঁর মুখে বিগলিত হাসি। আমার অন্য এক সহকর্মী, সলিমের লেখা এবং
বক্তৃতা সবসময়েই যাঁর মাথার উপর দিয়ে যেত, প্রায়ই বলা শুরু করলেন, এখন তিনি সলিম
ভাইয়ের কথা পরিষ্কার বুঝতে পারছেন। কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমি সবসময়েই খেয়াল
করেছি, ঢাকার বুদ্ধিজীবীরা অন্য দিক থেকে যাই হোক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বেশ ইনোসেন্ট
অতিমাত্রায় সরল। উল্লেখ করা দরকার, এ পর্বে এঁদের কেউ অন্তত আমার সামনে সলিমের সাধু
গদ্য সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তোলেননি।

 

সলিমের পূর্বতন অনুরাগীদের বৃহদংশ এসময় সলিমের ব্যাপারে ক্রিটিক্যাল হয়ে ওঠে। এঁদের
একটা বড় অংশ কোনো না কোনো সময়ে সলিমের সেমিনারে গেছেন এবং সে সূত্রে বা অন্য
সূত্রে আমার পরিচিত। তাঁরা যেসব অভিযোগ উত্থাপন করছিলেন সেগুলোকে তিন শ্রেণিতে
বিন্যস্ত করা চলে। এক. সলিম মূলত একজন টীকাকার। তাঁর প্রধান প্রতিভা সূত্র উদ্ধৃত করায়।
দুই. সলিম খানের কোনো মাস্টাপিস নাই, বা কোনো মৌলিক প্রস্তাব নাই। তিন. সলিম
পড়াশোনা করেছেন ঢের, কিন্তু ‘রাজনৈতিক’ জ্ঞান হয় নাই। কথাগুলো আগে কেউ যে
একেবারেই বলত না তা নয়, কিন্তু এ সময় থেকে গুণে-মাত্রায় তা প্রবল হয়েছে। এত এত নিন্দার
মধ্যেও, যদ্দুর মনে করতে পারছি, আমি কখনো এঁদের কাউকে সলিমের ‘সাধু’ গদ্য নিয়ে প্রশ্ন
তুলতে বা উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুনিনি। ঠিক এ কথাটি বলার জন্য আমি শাহবাগ আন্দোলন
সম্পর্কে এত লম্বা ফিরিস্তি টানলাম। কথাটার বিস্তার এভাবে করা যায় যে, গত তিন দশক ধরে
ঢাকায় প্রমিত বাংলার রক্ষাকারী এবং বিরোধীদের যে নানামাত্রিক লড়াই চলছে, সলিম তাঁর পুরানা
চলিত এবং পরবর্তী সাধু গদ্য নিয়ে তাতে ‘বিরোধী’ গোত্রেই শামিল ছিলেন। তাঁর
এককালীন অনুরাগী এবং শাহবাগ আন্দোলনের পটভূমিতে সমালোচনামুখর হয়ে ওঠা আমাদের
উল্লিখিত তরুণকুলও ‘বিরোধী’ শিবিরেই পড়বেন। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে মোটা দাগে
এই বিভাজন করা সম্ভব। এ প্রস্তাব এতটাই আনুমানিক যে এর পক্ষে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের
কাজে নামাও বেশ দুঃসাহসী উদ্যোগ হবে। তবে জোরের সাথে বলা যায়, এই তল থেকে পেছন
দিকে হেঁটে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাকরণ, এবং তা থেকে রাজনীতির ব্যাকরণ, এবং তা
থেকে বর্তমান রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যাকরণ পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে। যাঁরা বিদ্যমান প্রমিত বাংলার
বিরোধিতা করেন, এবং বিভিন্ন ফর্মে নতুন গদ্য চর্চা করে সে বিরোধিতাকে একটা বাস্তব
বিকল্পে পৌঁছানোর চেষ্টা নানাভাবে করছেন, তাঁরা সলিমের ‘সাধু’ গদ্যকে চলতি প্রমিতের
ব্যত্যয় এবং সে অর্থে নিজেদের পক্ষের কাজই হয়ত ভেবে থাকবেন। ফলে সলিমের সাধুরীতিতে
তাঁরা বিচলিত বোধ করেন নাই। আগেও না, পরেও না।

 

আমি সলিম ভাইকে বেশ রয়েসয়ে, বিস্তর ভনিতা ও বিনয় সহযোগে কথাটা জিজ্ঞাসা
করেছিলাম: আপনার দিক থেকে ব্যাখ্যাটা কী? তিনি বেশি পাত্তা দিলেন না। স্বভাবসুলভ
উন্নাসিকতায় কিছু একটা বলতে হয় এমন ভঙ্গিতে বললেন, এইভাবেও লেখা যায়, ওইভাবেও যায়।
তা, আমি এইভাবেই লিখি। এই আর কী। এর পরে যা বললেন তা অবশ্য বেশ মজার। বললেন, আমরা যখন
কথা বলি তখন তো চলিত রীতির ক্রিয়া ব্যবহার করি না। একটু লম্বা ক্রিয়া ব্যবহার করি। আমার
ক্রিয়াটা আরেকটু লম্বা মাত্র। আমাদের মুখের ভাষার ক্রিয়ারূপ থেকে কলকাত্তাই চলতির ক্রিয়ারূপ
যট্টুক আলাদা, আমার গদ্যের ক্রিয়ারূপ মোটামুটি তট্টুকই আলাদা। নিজের মতো করে তিনি
কথাগুলো বলেছিলেন। আমি মনে মনে কই, খাইছে আমারে। কোত্থেকে কই লইয়া যায়!

 

লম্বা ক্রিয়ার সাথে ঢাকার পুরানা পিরিত সম্পর্কে আমার কিঞ্চিৎ জানাশোনা ছিল। এক দফা
‘জ্ঞান’ পেয়েছিলাম শ্যামাচরণ গাঙ্গুলি মহাশয়ের ‘বেঙ্গলি স্পোকেন এন্ড রিটেন’ প্রবন্ধ
থেকে। এ সম্পর্কে দু-কথা বলা দরকার। শ্যামাচরণ প্রবন্ধটি ছেপেছিলেন ১৮৭৭ সালে ক্যালকাটা
রিভিয়্যু পত্রিকায়। পবিত্র সরকার বোধ হয় ১৯৮৯ সালে প্রবন্ধটি পুনরায় ছাপেন। ওই মুদ্রণ সলিম
ভাইয়ের নজরে এসেছিল এবং তিনি আমাদের পড়ার বন্দোবস্তও করেছিলেন। আমি প্রবন্ধটি
পড়েছি এবং পছন্দ করেছি টের পেয়েই বোধ হয় একদিন আমাকে বললেন, আপনি তো কাজের
কাজ কিছুই আর করলেন না, এই প্রবন্ধটা অনুবাদ করেন। একটা কাজ হবে। আমি আনন্দ ও
ভীতিসহ সম্মত হলাম। ভীতির কারণ ছিল। সলিম ভাই অনুবাদে নিজেই নিজেকে সন্তুষ্ট করতে
পারেন না। আমি কোন ছার। আমি অনুবাদ করে তাঁকে পড়ে শুনালাম। তিনি ঠিকঠাক করলেন।
পরিভাষাগত সমস্যার সুরাহা করলেন। আমাকে ঠান্ডা স্বরে পর্যাপ্ত গালিগালাজ করলেন। নমুনা
দিচ্ছি। এক অংশ পড়ে শুনানোর পর তিনি বেশ বিস্ময়ের ভঙ্গিতে আমার দিকে ফিরে বললেন, আপনি
ক্লাসে পড়ান কিভাবে? আপনি তো দেখি বাংলার কিছুই জানেন না। আমি বিনয়ে বিগলিত
হয়ে বললাম, আপনি যথার্থই বলেছেন। তবে আমার সমস্যা হয় না। আমার ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা
এতেই খুশি। তাদের অবস্থা বোধ হয় আমার চেয়ে খারাপ। আমার বাংলা না জানার প্রসঙ্গ তিনি
ওই কদিনে বার-কয়েক তুলেছিলেন। আরেকবার খুব গুরুতর কিছু বলছেন এমন ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা
করলেন : আপনার সমস্যা কী জানেন? আমি প্রমাদ গুনলাম। কিন্তু তা চেপে রেখে বললাম, আমার
সমস্যা তো প্রচুর। আপনি এ মুহূর্তে কোনটার কথা বলছেন? তিনি আমার কথার
মারপ্যাঁচকে মোটেই আমল না দিয়ে বললেন, আপনি যে গদ্যে অনুবাদটা করছেন তার ওজন ধরেন
আধা কেজি, আর যে বস্তু অনুবাদ করছেন তার ওজন সে অনুপাতে কমসে কম দশ কেজি। এখন
আপনি দশ কেজি ওজনকে আপনার আধা কেজির মধ্যে রাখবেন ক্যামনে? আমি বললাম, আপনি
ঠিকই বলেছেন। দেখি চেষ্টা করে কদ্দুর কী করা যায়। পৃষ্ঠা চল্লিশেকের এই অনুবাদ করতে গিয়ে
সলিম ভাই আমাকে এ ধরনের কথাবার্তা অনেকবার বলেছেন, যেগুলোর জন্য প্রত্যেকবার অন্তত
একবার করে আমার মন খারাপ করার কথা, কিন্তু আমি তা করিনি, কারণ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম,
প্রত্যেকবারই ভালো বিকল্প প্রস্তাব করে, অনেকগুলো ডাহা ভুল সংশোধন করে, অভিধান দেখে যে
সমস্যাগুলোর কিনারা করতে পারছিলাম না সেগুলোর সহজ সমাধান দিয়ে তিনি নিজের
গালিগালাজকে সন্তোষজনকভাবে বৈধ করতে পেরেছেন। ঢাকার বিদ্বৎসমাজ সম্পর্কে ধারণা
আছে বলেই আমি নিশ্চিত ছিলাম, এ বস্তু অন্যত্র মিলবে না। ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মনস্তত্ত্ব,
কাণ্ডজ্ঞান ও মাত্রাজ্ঞানের সমন্বয় সৃষ্টিশীল চর্চায় সুলভ বটে, কিন্তু পাণ্ডিত্য অন্য জিনিস। এ বস্তু
আসমানে পয়দা হয় না, এক জনমের সাধনায় কারো কারো মধ্যে সঞ্চিত হয় মাত্র।

 

শ্যামাচরণ গাঙ্গুলির এ প্রবন্ধ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে গেছে। আমার মাঝে মাঝে
এমনও মনে হয়, আমাদের এখানে ভাষা-টাষা নিয়া যারা কাজ-কাম করে তাদের অনেকের সাথে আমার
ফারাক এই যে, আমি শ্যামাচরণের এই লেখা মনোযোগ দিয়ে এস্তেমাল করার চেষ্টা করেছি, অন্যরা
করে নাই। বর্তমান প্রসঙ্গে জরুরি তথ্যটা হল, শ্যামাচরণ বাবু প্রবন্ধের এক জায়গায় সেকালের
বাংলার প্রধান উপভাষাগুলোর ক্রিয়ারূপের তুলনামূলক ছক এঁকেছেন। তৎকালীন বইপুস্তকের ভাষা
অর্থাৎ কথিত সাধু ভাষা থেকে তিনি ছয়টি ক্রিয়াপদ বাছাই করেছেন: ‘করিতেছি’,
‘করিয়াছি’, ‘করিলাম’, ‘করিতেছিলাম’, ‘করিতাম’, ‘করিব’। ঢাকার বাংলায় এ
ক্রিয়াগুলোর রূপ তিনি পেয়েছেন যথাক্রমে : ‘করতেছি’, ‘করিয়াছি’, ‘কোরলাম’,
‘করিতেছিলাম’, ‘কোরতাম’, ‘কোরবো’। সিদ্ধান্তের ঘরে তিনি জানাচ্ছেন, পূর্ববাংলার
উপভাষাগুলো মনে হয় মানভাষার নিকটতর। এখানে তথ্য হিসাবে মনে করিয়ে দিই, গ্রিয়ারসন
মশাই ভারতে যে বিখ্যাত ভাষা-জরিপ চালিয়েছিলেন, শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন তার স্থানীয়
সহচর।

 

ঢাকার কথ্যভাষায় ক্রিয়াপদের দীর্ঘতা সম্পর্কে দ্বিতীয় ‘জ্ঞান’ পেয়েছিলাম মৃণাল নাথের লেখায়।
পূর্ববাংলার উপভাষাগুলো মানভাষা অর্থাৎ সাধুভাষার নিকটতর কেন তার ব্যাখ্যা আছে ওই জ্ঞানে।
‘বাঙালীর ভাষাচিন্তায় চলিত-সাধুর দ্বন্দ্ব’ নামের প্রবন্ধটিতে মৃণাল নাথ জানাচ্ছেন, পরে
কলকাতায় বিকশিত হলেও সাধু গদ্যের আদি জন্মভূমি আদতে ঢাকা। কথাটা চমকে ওঠার মতো।
কিন্তু যদি মনে রাখি, কলকাতার জন্মের বহু আগে থেকে ঢাকা শুধু রাজধানী-শহরই ছিল না,
উৎপাদনশীলতা এবং আভিজাত্যেরও কেন্দ্র ছিল, তাহলে বাংলার পশ্চিমাঞ্চলের ভাষাগুলো যে কোনো-না-
কোনো মাত্রায় ঢাকার চালু ভাষা দ্বারা প্রভাবিত হবে, তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। পুরানা
পদ্য এবং গদ্যের ক্রিয়ারূপ ছিল দীর্ঘ। সেই গদ্য উনিশ শতকের কলকাতার উপনিবেশায়নের বিচিত্র
মতিতে পড়ে গতি হারিয়েছে। সংস্কৃতায়ন আর ইংরেজিয়ানার বাড়াবাড়ি সয়ে হয়ে উঠেছে
স্থবির। তখন সবাই মিলে সমস্ত দোষ দিল ক্রিয়ারূপের। তড়িঘড়ি ক্রিয়াকে কলকাত্তাই ক্রিয়া
মোতাবেক সাফসুতরা করে ছোট করে নিয়ে বাদবাকি সমস্ত উপাদান ঠিক রেখে তার নাম দেয়া
হল চলিত গদ্য। নতুন নামায়নে সুধীন দত্তের আজদাহা পড়ল চলিতের ঘরে, আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর
মিষ্টি সারল্য পড়ল সাধুর ঘরে। আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ এই বস্তুই বটে।

 

১৯১০-এর পর বাংলা গদ্যের দশা বেহাল হয়েছে এরকম একটা মত বাজারে চালু আছে। আমাদের কাল
পর্যন্ত এ সংবাদ বয়ে এনেছেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী। তাঁর সূত্রেই কিনা জানি না, তবে আমি
সলিম ভাইকে একাধিকবার বলতে শুনেছি, তিনি এ মত কম-বেশি খরিদ করেন। নীরদ চৌধুরীর মরহুম
বন্ধুরা পুরানা সাধু গদ্যের জন্য হাহাকার করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এবং প্রমথের প্রচণ্ড প্রতাপে
সাধুর সাধুত্ব রক্ষা করা বেশ জটিল হয়ে উঠলে সজনীকান্ত দাস, মোহিতলাল মজুমদার,
সুশীলকুমার দে প্রমুখ এ বাবদ বিস্তর কলমি লড়াই লড়েছিলেন। এই হিসাবটা একটু জটিল।
এঁরা উনিশ শতকের শেষ দিকে কলকাতায় জমে ওঠা বাঙালিত্ব, হিন্দুত্ব এবং বাংলা গদ্যের
সাধুত্বকে এক পাল্লায় তুলতে পারতেন, এক পাত্রে মিলাতে পারতেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ বরাবরই
সাধু গদ্যকে বিচার করেছেন ইংরেজ-পণ্ডিত যৌথতায় নিষ্পন্ন ‘আদিপাপ’ হিসাবে, আর
তার বিপরীতে প্রস্তাব করছিলেন ‘প্রাকৃত বাংলা’। কিন্তু শেষ পযন্ত অনেকটা তাঁর সমর্থনে
প্রতিষ্ঠিত হল চলিত বাংলা। উনিশ শতকি বাংলা গদ্যের গড়াপেটায় যে বিস্তর জটিলতা আর
টানাপড়েন তার সব মুছে গিয়ে ভাষা-বিতর্ক দাঁড়াল সর্বনাম আর ক্রিয়াপদের সংক্ষিপ্ত রূপে।
উপনিবেশিত বাংলা গদ্য, বাংলা ব্যাকরণ-অভিধান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো কার্যকর
পর্যালোচনা বাদেই ‘মান’ বাংলা প্রতিষ্ঠিত হল। নিন্দুকেরা বলল, এর মধ্য দিয়ে আসলে
কলকাত্তাই কথ্য ক্রিয়া ও সর্বনামের চরম প্রতিষ্ঠা ঘটল। ধরা যাক, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
অভিশ্রুতি ব্যাখ্যা করে বললেন, এটা হল চলিত ক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য। তাঁর ব্যাখ্যা শুনলে মনে হবে, সাধু
গদ্য এ প্রক্রিয়ায় কালক্রমে চলতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এটা ভাষার ‘প্রগতি’। আসলে
বোগাস। আসলে এটা কলকাত্তাই ক্রিয়ার স্বাভাবিক রূপ। মোটেই রূপান্তরিত রূপ নয়। যাই হোক,
পুরানা সাধু রীতিতে যেমন, নতুন চলিত রীতিতেও সৃষ্টিশীল রচনা দারুণ জমল। কলকাতায়।
ঢাকায়ও কতকটা। মুশকিল হল সাকুল্যে দুটো। এক. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, জসীমউদ্দিন প্রমুখ
গদ্যলেখকের এবং তিরিশের প্রধান কথাসাহিত্যিকদের রচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ লেখা হল ‘সাধু’
বাংলায়, অন্তত পরবর্তী নামায়নে ব্যাপারটা তা-ই দাঁড়াল, অথচ এসব গদ্য চলিতের বাপ
রীতিমতো চলতি । প্রমথের চলিত গদ্য আদতে চলতি গদ্য নয়, সে কথাটা আর খোলাখুলিভাবে
উচ্চারিতই হল না। দুই. চলিতের এই গড়নে ঢাকার চলতি ভাষাকে আমলে আনার কোনো উপায়ই
থাকল না।

 

গত অন্তত তিন দশক ধরে প্রমিত ওরফে চলিত ভাষা সম্পর্কে ঢাকার যে বিপুল ও বিচিত্র
প্রতিক্রিয়া, তার পেছনে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে উল্লিখিত অজাচারগুলো কাজ করেছে। সেদিক থেকে
তাঁর নিজের মনে যা-ই থাকুক, সলিমুল্লাহ খানের ‘সাধু’ গদ্যকে ওই প্রতিক্রিয়ার অংশ
হিসাবে গণ্য করলে ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক চিহ্নের বরাতে যৌক্তিক হবে বলেই মনে হয়।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও জসীমউদ্দিনকে খাঁটি বাংলার লেখক হিসাবে আবিষ্কার করা সলিমুল্লাহ
খানের নিজের পক্ষেই সম্ভব ছিল। বাংলা ভাষা ও গদ্যের ইতিহাসে তাঁর পাণ্ডিত্যের যে বহর লেখায়
প্রকাশ পেয়েছে মুখের কথাবার্তায় জেনেছি তার চেয়ে ঢের বেশি। ফলে শাস্ত্রী বা জসীম ভালো
গদ্য-লেখক এ কথাটা তিনি নিজেই আমাদের বুঝিয়ে বলতে পারতেন। কিন্তু তাঁর নিজের
সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে নিশ্চিত করে বলা যায়, নাম দুটো তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন
অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে আহমদ ছফা মারফত। দুজন সম্পর্কে — শাস্ত্রী সম্পর্কে
কম এবং জসীম সম্পর্কে বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ — নিজের থিসিসও তিনি উপস্থাপন করেছেন।
বলার কথাটা হল, স্রেফ এ দুজনের বরাতেই কেউ একজন তাঁদের ধারার ‘সাধু’ গদ্য লিখতে শুরু
করতে পারেন। একথাও হয়ত নিরাপদে বলা যাবে, ‘চলতি’র প্রতি কোনো আকর্ষণ থাকলে ওই
ধারার ‘সাধু’তেই তা অধিকতর মাত্রায় রক্ষিত হতে পারে।

 

এতসব ‘জ্ঞান’ সত্ত্বেও ‘সলিমুল্লাহ খান ‘সাধু’ গদ্যে লেখেন কেন’ জাতীয় কোনো
প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য আমি মোটেই অগ্রসর হব না। কারণ, আমার কাছে প্রশ্নটাই
অবান্তর। আমি জানি, খান সাহেব একজন গদ্যশিল্পী। ভাবের প্রকাশই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য নয়।
প্রকাশভঙ্গিকেও তিনি ভাবের অংশ করে তুলতে পেরেছেন। এ ব্যাপারে তাঁর মনোযোগ প্রমথ
চৌধুরীর কথাই মনে করিয়ে দ্যায়। তিনি যখন কথিত চলিতরীতির গদ্য লিখতেন, এ কথা তখনো
সমান পরিমাণে প্রযোজ্য ছিল। বিশ্বাস না হয়, তাঁর সেকালের লেখা আরেকবার পরীক্ষা করে দেখতে
পারেন। তাহলেই আপনার হয়ত মনে হবে, যেমনটা আমার হয়েছে, গদ্যের বাক্যস্তরের মূল কাঠামোর
দিক থেকে তাঁর লেখা আসলে ‘সাধু’ শুরুর পরে বিশেষ বদলায়নি। গদ্যের গতি তাঁর পরম মোক্ষ নয়।
তিনি স্থিতির ব্যাপারেই অধিকতর আগ্রহী। যেতে চান ধীরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে; যোগ
করেন ব্যাখ্যাসূচক বিস্তর উপবাক্য; আর শব্দের শরীর ও মন নিয়ে ক্রীড়া-কৌতুকে মাততেও দ্বিধা
করেন না। নিছক উদাহরণ হিসাবে বলছি, বুদ্ধদেব বসু বা হুমায়ুন আজাদের গদ্যের বেশ কতকটা
বিপরীত প্রক্রিয়া এটি। তাঁর গদ্যে আগে থেকেই জমাট বাঁধা এসব মনোহর বৈশিষ্ট্য লম্বা
ক্রিয়াপদের সাথে আমূল খাপ খেয়ে গেছে বলেই মনে হয়।

 

যাঁরা এ পর্যন্ত লেখাটি পড়েছেন তাঁদের ধৈর্যের প্রশংসাপূর্বক দুটি সতর্কবাণী উচ্চারণ
করে লেখাটি শেষ করছি। এক. আমার লেখা পড়ে যদি কারো মনে হয়, লম্বা ক্রিয়ার পক্ষে আমি
কোনো প্রকার সাফাই-সাক্ষ্য দিয়েছি, তাহলে তাঁদেরকে আমি অতিরিক্ত সরল সাব্যস্ত করব; এবং
তাঁদের সাথে ভাষার মতো জটিল বিষয় নিয়ে আলাপ করা থেকে বিরত থাকব। দুই. এখনো যদি
কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, সলিমুল্লাহ খান ‘সাধু’ গদ্যে লেখেন কেন? আমি কোনো
প্রকার দ্বিধা ছাড়াই জবাব দেব : আমি জানি না। এমনকি জানাটা কর্তব্য বলেও মানি না।

——————————————————–

বিঃ দ্রঃ লেখায় ব্যবহার কথা ছবি সকল নেট থেকে সংগ্রহ করা ।

LEAVE A COMMENT