বানান হয়ে ওঠা সময়

আমাদের ফিল্মের অবকাঠামো ভেঙ্গে গেছে, ৩৫ টি সুপার ক্লাস প্রোডাকশন হাউজ ছিল, কাকরাইলে এখন সব বন্ধ — মিশা সওদাগর ।।

101
2444 views

ভিডিওতে পুরা আলাপ শুনতে ভিতরে ক্লিক করতে পারেন 


মিশা সওদাগর পয়লা এপ্রিল, ২০১৭ আসছিলেন বিড়ালপাখির মজমা ১০.০ আসরে । বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্সে এই আসর বসছিল । নায়ক চরিত্র দিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে উনার অভিনয় যাত্রা শুরু হইছিল । তবে নাম করেন খলনায়ক চরিত্রে অভিনয়ে । শুরুটা হয় ছিয়াশিতে। নয়শোর বেশি পূর্ণদৈর্ঘ‍্য সিনেমায় শ্রম দেয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর। বেশিরভাগই খলনায়ক চরিত্রে। অভিনয়ে পাইছেন জাতীয় পুরস্কার।

 

 প্রায় ১ ঘণ্টার আলাপে উনি কথা বলেন– পর্দায় উনার যাত্রা, পর্দার পিছনের গল্প, উনার কাছে ফিল্ম ব্যাপারটা কি, কেমনে উনি পর্দায় অভিনয়ে সফল হইলেন, নতুন যারা কাজ করতে চান তাঁরা কি কি বিষয়ে মনোযোগী হইবেন, উনার শুরুর সময়ে ৩৫ টার মত সুপার ক্লাস প্রোডাকশন হাউজ থেকে আজকে যে ফিল্ম প্রোডাকশন পাড়া কাকরাইলে সব প্রোডাকশন হাউজ বন্ধ হইয়া গেল তা নিয়া, এমন কি আমাদের পুরা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবকাঠামো যে ভেঙ্গে গেছে আজকে ইত্যাদি বিষয় নিয়াও কথা বলেন খোলামনে । মিশা একটু হতাশ হইয়া বলতেছিলেন, আমি নিরবে ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে চলে যাব । কাউকে কিছু বলব না । কারণ কেউ আমার অভিমানের কথা বুঝবে না ।

 

 ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ফিল্ম বা ডিরেক্টর এবং তার বাইরে যারা বিকল্প বা ইন্ডিপেনডেন্ট ভঙ্গিতে ফিল্ম চর্চা করেন, তাঁদের ঠাট্টা করে বলেন– এরা আঁতেল ডিরেক্টর। ফেস্টিভাল বা পুরস্কারের জন্য ফিল্ম বানায় এরা । এই সব ফিল্ম না ।
 
তাঁর কাছে ফিল্ম কি ? মিশা সওদাগর বলছেন–
 
“ডিসি থেকে থার্ড ক্লাসের লোক একই সময়ে কাঁদা আরম্ভ করে মধুমিতা থেকে ভেরামার হলে । দিস ইজ ডান বাই এফডিসি’স ডিরেক্টর, নট ডান বাই আঁতেল ডিরেক্টর । যার এই ক্ষমতাটা আছে সেইতো লিডার । সেইতো ডিরেক্টর ।
 
আমি দেখেছি যে একটা হলে চারিদিকে মশার কামড়, গরমে লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত তুলেছে, সারা গায়ে ছারপোকার কামড়, ফ্যান নাই । পুরা হল মানুষে গাদাগাদি । ফিল্ম চলছে । যেখানে তালি দেয়ার সেখানে মানুষ ঠিকই তালি দিচ্ছে, যেখানে শিস বাজানোর শেখানে শিস বাজাচ্ছে । যেখানে কান্নার সেখানে হুহু করে কাঁদছে ।
 
শুধু সিনেপ্লেক্সে ঢুকটা, বান্ধবীকে হাতে নিয়া বাদামটা চিবাবা আর কথা বলবা দু চারটা লাইন, এটা ফিল্ম না । ফিল্ম অনেক বড় ব্যাপার । ফিল্ম কিছু কলেজ ইউনিভার্সিটির মধ্যে সঙ্গবদ্ধ থাকবে এটা হতে পারে না । ফিল্ম মেয়র দেখবে । মেথর দেখবে । ফিল্ম মন্ত্রী দেখবে । ফিল্ম সন্ত্রাসী দেখবে । ফিল্ম সেক্টেটারি দেখবে । ফিল্ম পিয়ন দেখবে । ছবি দেখে বের হবে, কোন না কোন গান তার মাথায় বাজবে । ড্রাইভারের মাথাও বাজবে । ঐটাই ফিল্ম । ঐটাই ডিরেকশন ।”
 
মিশা আরো বলেন— “যারা ফেস্টিভাল মার্কা ছবি বানান উনারা তো পদ্মার ঢেউ বলেই পার । পদ্মার ঢেউ’র উপর ফ্রেম ধরলেন, পদ্মার ঢেউ উঠে যাচ্ছে, বানানোর কোন প্রয়োজন নাই । তো কঠিন হচ্ছে পদ্মার ঢেউ না, এফডিসিতে পদ্মার একটা কর্নার বানিয়ে মেকবিলিভ করানো । ইজ দা ভেরি ইম্পর্টেন্ট । তাই ইবনে মিজান আমার কাছে অনেক বড় ডিরেক্টর । ”
 
একটু খেয়াল করলে আমরা শুনব মিশা বলতে চেষ্টা করেছেন যে, আমাদের মেইনস্টিম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সাথে অনন্যা ফিল্ম চার্চার ধারার একটা পার্থক্য আছে । আমরা আনুমান করি সেটা হয়ত গরিবের আবেগ-আকুতি-রুচির সাথে মধ্যবিত্ত কিনবা অন্যবিত্তের আবেগ-আকুতি-রুচির পার্থক্য । এই ক্ষেত্রে আমাদের মেইনস্টিম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কম করেও গত ২ যুগ যে যে মানুষকে হলে আনতে চেয়েছেন; অন্যরা সেইসব বিপুল গরিব দর্শকদের হয়ত তেমন পাত্তা দেয়ার কিনবা মনে রাখার দরকার মনে করেন নাই । এই চিন্তার পার্থক্য আমাদের নানান ভাবে বিভক্ত করেছে । কখনো বিপরীত দ্বন্দ্বে আমরা একে অপরকে গালি দিয়েছি । এখনো চলছে । মিশা যেমনটা আঁতেল বলে ঠাট্টা করছেন ।
 
তো ‘নানান শ্রেণী-রুচির দেশে নানান ফিল্মের চর্চা-ভুক্তা থাকবে’ এই কথা আমরা এখনো মানতে পারি নাই । ফাঁকে আমাদের ফিল্মের মেরুদণ্ড ‘ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি’টাও বিনাশ করলাম-করছি তিলে তিলে । এখন দেশি-বিদেশিরা মিলে মিলে ।

You Might Be Interested In

LEAVE A COMMENT