বানান হয়ে ওঠা সময়

গোষ্ঠ গান এবং নদীয়ার ভাবের গোড়ার আলাপ ।। ফরহাদ মজহার, রওশন ফকির এবং ওয়াজ ফকির ।।

102
2898 views

মোহাম্মদ রোমেল


আজ ১ লা কার্তিক। কার্তিকের এইদিন লালন ফকির ভক্ত-অনুরাগীদের জন্য বিশেষ দিন । আজ হতে ১২৬ বছর আগে এইদিনে লালন ফকির তিরোধান করেন কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় । ফলে তাকে স্মরণ করতে সারা দেশ থেকে সাধু-গুরু-বৈষ্ণবরা কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেউড়িয়ায় লালান স্মৃতিধামে হাজির হন সাধু-সঙ্গের ভাব মনে নিয়ে । আজ বিকাল থেকে শুরু হবে সেই সঙ্গের অধিবাস ।



st-010


চৈতন্য থেকে লালন পর্যন্ত বাংলায় ভাব চর্চার যে বিশেষ ধারা চলে আসছে তাকে ‘নদীয়া ভাব পরিমণ্ডল’ বলে কেউ কেউ ব্যাখ্যা করেছেন । এই ভাব পরিমণ্ডল অসংখ্য সাধু-গুরুর সাধনার মাধ্যমে বিকশিত হয়ে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বর্তমান পর্যন্ত চলে আসছে । এইখানে নদীয়ার ভাব পরিমণ্ডল বলে যাকে ডাকা হয় সেখানে পাঁচ ‘ঘর’ আছে (এখানে ‘ঘর’ মানে চিন্তা চর্চার ভিন্ন ভিন্ন স্কুল– বুঝার সুবিধার্থে এইভাবে বলা যায় ) । এই পাঁচ ঘরের এক ঘর হচ্ছে লালন ফকিরের ঘর । লালন ফকির ছাড়াও এই পাঁচ ঘরে আর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাধু-গুরু-মহৎ আছেন । যথাযথ গবেষণা, মিডিয়ার প্রেজেন্টেশনের কারণে তাদের কথা আমরা খুব বেশি জানি-শুনি না । এই ধারা নিজেদের মধ্যে প্রশ্ন-উত্তরের ভঙ্গিতে গানে গানে চিন্তার বিস্তার করেছেন । ফলে প্রশ্ন-উত্তরের ভঙ্গিতে লালনের গান বুঝতে গিয়ে অন্য সাধকদের কালামের খবর আমাদের নিতে হবে ।

এই পাঁচ ঘরের বাইরেও সুফি-বাউল সহ আরো যেসব চর্চা গুরু পরম্পরায় আছে তাদেরকে লালন মিত্র মনে করতেন কিন্তু ঘরের লোক মনে করতেন না ।

গত বছর ১ লা কার্তিক ( ১৪২২ বাংলা , ১৭ অক্টোবর ২০১৫ ইংরেজি) লালন ফকিরের তিরোধান দিবসের উছিলায় কুষ্টিয়ায় লালন আখড়ায় সাধু গুরু বৈষ্ণবদের সাথে আমরাও হাজির হয়েছিলাম প্রতি বছরের মত । গত ১ যুগের অভিজ্ঞতায় দেখেছি আখড়ায় লাখ মানুষের আনাগোনায় তিরোধান দিবসে সাধুরা ঠিক সাধু সঙ্গের যে নিয়ম-রীতি; সে সব মেনে সঙ্গ করার বাস্তবতায় থাকেন না । ফলে যার যার সুবিধা মত সাধু গুরুরা নানান মহতের কালাম, ভক্তি-ভাব বিনিময় করেন নিজ নিজ ভক্তদের সাথে নিয়ে । পুরো আখড়া জুড়ে এমন হাজারও রকম আড্ডা-আলাপ চলে প্রায় ৭২ ঘণ্টা ।

এর বাইরে সরকারি সর্দারিতে কালিগঙ্গা নদী ভরাট করে আখড়ার সামনের দিকে যে মাঠ তৈয়ার হয়েছে সেখানে মঞ্চ বানিয়ে সাড়া রাত গান চলে সরকারি নিয়মে । সাথে সন্ধ্যায় সরকারি আমলা, সরকার দলীয় নেতা এবং গবেষক-অধ্যাপকদের সর্দারিতে মঞ্চে চলে বক্তৃতা । এই সরকারি মঞ্চে গানের সময় সাড়া দেশ থেকে আগত শিল্পীদের দেখা গেলেও সাধুদের খুব দেখেছি বলে মনে পড়ে না । সত্যিকারের সাধুরা এই সব থেকে একটু দুরেই থাকেন নিজ ভক্তদের নিয়ে মনে হয় । সেখানে বক্তৃতা পর্বেও সাধুদের ভিড় আমি গত ১০ বছরে কখনো দেখিনি । সরকারি আয়োজনে এমনটা হয়ত খুব স্বাভাবিকই । তবু বলা বাহুল্য হবে না মনে করে বলি, লালন অনুসারী সাধু-গুরু ভক্তদের মেলায় তাদের জীবন-কালাম নিয়ে আলাপে তারা নাই সর্দারদের আধিপত্যে এমনটা সাধু কারবার নয় । এই হুশ সরকারি সর্দারদের দেখি নাই খুব ।

আসলে তিরোধান দিবসের এই সময়টাতে আখড়ার পুরা পরিবেশটাই এমন হয়ে থেকে যে, এইখানে সাধুদের সঙ্গ করার কোন বাস্তব অবস্থা আর থাকে না । অতিরিক্ত দর্শনার্থী আর আর সিদ্ধ সাধকের বাইরে উটকো নেশা-ভাঙ্গকারি লোকেদের ভিড়ে এইটা সাধু সঙ্গের বদলে হয়ে উঠে নানান মানুষের মেলার সঙ্গ । ফলে লালন ফকিরের তিরোধান দিবসের সাধু ভাব হারিয়ে পুরো ধাম হয়ে যায় বাজারি মেলা টাইপের। লাখ মানুষের আয়োজনকে নিয়মের মধ্যে বাঁধা কঠিন । হয়ত এমন মেলার সুদূর প্রসারি লাভও আছে ।

তবু যারা সত্যিকারের সাধু সঙ্গ দেখতে বুঝতে চর্চা করতে চান, তারা সাধুদের বাড়িতে আয়োজিত সঙ্গে যেতে পারেন । সেইসব সঙ্গ গুরু নির্ধারিত দিনে প্রতি বছর সাধুদের নিজ নিজ বাড়িতে হয়ে থাকে । অনেকেই মেলায় আগত সাধুদের কাছ থেকে সহজেই জেনে নিতে পারেন তাদের নিজ নিজ সঙ্গের দিনক্ষণ ।

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি অনেকে সাধু আর শিল্পীর পার্থক্য গুলিয়ে ফেলেন । যেমন ঢাকায় লালনের গান করে বেড়ান এমন অনেককেই বন্ধুরা সাধু ভাবেন । অনেকে ভুল দেখে ভাবেন লালনপন্থী সাধুরা গাজাখোর । এইসব একদম মিথ্যাচার । লালন কখনো নেশার চর্চা করতেন না । তার সঙ্গে এইসব চলত না । আমার গত ১২ বছরের অভিজ্ঞতায় লালন ঘরের কোন সাধককে নেশা করতে দেখিনি । কেউ করেন না সেইটা বলছি না । লালন ঘরের কথা বলছি । আর নেশার বিরোদ্ধে সাধকদের কোন মধ্যবিত্ত ঘৃণাও নাই এই কথা মনে রাখাও জরুরি।

সাধু গুরুরা প্রতি বছর দোল এবং কার্তিকে লালন ফকিরের ধামে মিলিত হতে আসেন । নির্বিবাদী নিরীহ গরীব সাধু গুরুরা নানান প্রতিকূলতার মধ্যে সাইজির ধামে নিজেদের ভাবের রক্ষা-চর্চার কূলকিনারা করতে পারছেন বলে দেখছি না ।

এই সব প্রতিকূলতার মধ্যেও কেউ কেউ সীমিত আকারে হলেও কিছু চর্চা চালু রেখেছেন । যেমন নদীয়ার পাঁচ ঘরের একঘর লালন সাইজি ঘরের ফকির নহির শাহ্‌দের সার্কেল তাদের মধ্যে অন্যতম । তারা আখড়ার ভিতরেই একটা বিশেষ জায়গায় বসে গুরু কাজ সারেন ।

এই ঘরেরই ফকির লবান শাহর ভক্ত কবি ফরহাদ মজহার তার গুরুকে সাথে নিয়ে গড়ে তুলেন নবপ্রাণ আখড়া বাড়ী । পুরা লালন ধামের মধ্যে এই নবপ্রাণ আখড়া বাড়ীতেই কিছু নিয়ম মেনে অধিবাস শুরুর সময় বিকাল থেকেই দৈন্য গান, ভোরে গোষ্ঠ গান, বিধান মেনে সাধু সেবা ইত্যাদির চর্চা দেখা যায় । নবপ্রাণ আখড়ার এই কর্মে যে সাধু দায়িত্বে আছে তার নাম রওশন ফকির ।

আমরা গতবছরের ১ লা কার্তিকের স্মরণ সঙ্গের ভোরে নবপ্রাণ আখড়া বাড়ীর গোষ্ঠ গানে হাজির ছিলাম । সেখানে লবান শাহ্‌ ফকিরের ভক্ত লালন ঘরের কবি ফরহাদ মজহার গোষ্ঠ গান এবং নদীয়া ভাব পরিমণ্ডলের কিছু ইতিহাস পুরান গল্প রীতি ব্যাখ্যা করেছেন । এমন করে নদীয়ার ভাব পরিমণ্ডলকে ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ উভয় বাংলায় বিরল । অসাধারণ সেই মুহূর্তের পুরাটাই আমরা ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করতে পেরেছিলাম । সেখানে ফরহাদ মজহার ছাড়াও আখড়া বাড়ীর সাধুগুরু ভক্ত শিল্পীরা তিনটি গোষ্ঠ গান করেছেন ।

ফকির রওশন সাধুর গলায় ২ টা এবং ফকির ওয়াজ শাহ্‌র গলায় ২ টা গোষ্ঠ গান সহ প্রায় ২ ঘণ্টার ভিডিওটি ডকুটি বানান এইখানে প্রচার করছে ।

বানানের দর্শক-পাঠকদের ভাল লাগলে সামনে এমন আরো ভিডিও আমরা আপ করতে পারব ।

  • প্রায় ২ ঘণ্টার এই ভিডিও ডকুটি তৈয়ার করেছেন মোহাম্মদ রোমেল ।

You Might Be Interested In

LEAVE A COMMENT