বানান হয়ে ওঠা সময়

দয়াল তোমার সনে প্রেম করিয়া আমার পরান ভরে না – কবি রহমান ।। গেয়েছেন – পাগল শিল্পী, জামশা, সিংগাইর, মানিকগঞ্জ।

101
1521 views

“বৈঠকে শিল্পীর গাওয়া এমন এক আবেগময় পরিস্থিতি তৈয়ার করল যে, মানুষ এক পর্যায়ে নিজের ভিতরের সমস্ত প্রেম দিয়ে, একজন আরেকজনকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল । এই কান্না পরস্পরকে নতুন বন্ধনে বাধে মনে হয় । যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের পূর্বে ঘটে থাকা ক্ষুদ্রতা, এক মধুময় আকুলতায় বিলীন করে দেয়ার ভাবে; কেঁদে উঠে ।” 

[icon size=”” icon=”icon-palette” display=”true” ][/icon] পাগল শিল্পী

শিল্পীর সাথে আলাপ-পরিচয়ের গল্পটা এমন, আগের দিন পীর মোহাম্মদ আলী বিশ্বাসের বাড়িতে তিন দিনের ওরশ-পালা গান শেষে, অনেকেই যার যার মত করে চলে গেছেন নিজেদের বাড়িতে । কর্মে । বিশ্বাসের কিছু ভক্ত এবং নিকট আত্মীয় থেকে গেছেন । বছরে এই একবার ওরশ উপলক্ষে অনেকের সাথে অনেকের দেখা সাক্ষাৎ হয় এখানে । কথা বলে জানলাম বিশ্বাসের এক নাতি মোহাম্মদ নুরু মিয়া কুয়েত থেকে প্রতি বছর এই ওরশ উপলক্ষে ছুটিতে আসেন । পাড়া-গ্রামের মানুষ তো আছেই ।

পীর সাহেব জীবিত না থাকায় ভক্তরাও অন্য সময় না এসে, এই ওরশের সময় আসেন । পরস্পরের দেখা-আড্ডা-উৎসব আনন্দ এবং পীরের স্মরণে এক ধরনের ভাব জাগানিয়া প্রাণের মিলন এই ওরশ । যা ভক্তদের জন্য সাড়া বছরের জ্বালানি হয়ে থাকে ।

ওরশের গণ জমায়েতের পরে ভক্তদের সাথে আরো নিবিড় আলাপের লোভে আমিও থেকে থেকে গেলাম জামশা । সকালে ঘুম থেকে জেগে পীর মোহাম্মদ আলী বিশ্বাসের কবরের পাশেই আড্ডা চলছিল আমাদের । তাঁর বিষয়ে টুকটাক জিজ্ঞাসার ফাঁকে হঠাৎ একজন এসে আমাকে জিগায়, আপনি কি সাংবাদিক ?
আমি বললাম ঠিক তা না ।
আবার জিগায়, কি করেন তাইলে ?
বললাম তেমন কিছু না । ঘুরি ফিরি । পেটের জন্য কিছু কর্ম করি ।

তাঁর জিজ্ঞাসার মধ্যে আন্তরিকতার গন্ধ পেয়ে আমি তাঁরে পাল্টা জিগাই, আপনি কে ? কি করেন ?

শিল্পীর উত্তরের আগেই পাশ থেকে একজন উত্তর দিল,
উনি গান করেন । পালা গান । খুব ভাল গায় ।

এইবার শিল্পী নিজেই বলেন, আমি পাগল মানুষ । গান ভালবাসি । গ্রামে গ্রামে গানের আসরে গান গাই। গানের টানে ছোট সময় বাসা থেকে বের হয়ে যাই । এখনো ছুটি । দয়াল যেখানে ডাকে সেখানে ছুটে যাই । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দয়ালের প্রেমে আমি ছুটতে চাই ।

শিল্পীর কথায় বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশে একজন মেয়ের এই ভাবে পালাকার হয়ে উঠা নিয়ে ভাবছিলাম । ছেলে-সংসার-জীবিকা এই সব ম্যানেজ করে, সারাক্ষণ দয়ালের প্রেম স্মরণে, ভাব গানের পিছনে ছুটে চলা; সামন্তীয়-পুরুষ আধিপত্যের সমাজে খুব কঠিন লড়াই । আরো অনেকের মত শিল্পীও এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন দয়ালের নামে । গ্রামের মেয়েদের এমন হয়ে উঠার লড়াই আমরা খুব বেশি খেয়াল করি না।

কথায় কথায় জানলাম শিল্পীর গানের ওস্তাদ দোহারের বিখ্যাত বয়াতি পরশ আলী । আশে-পাশে কে কোথায় গভীর ভাবনা থেকে গান লিখেন। করেন । এইসব খুঁজ-খবর শিল্পীর বেশ ।

আলাপের এক পর্যায়ে শিল্পী গান শুরু করল । সাথে সাথে আসে পাশে থাকা লোকজন, যার যার মত গানের ভাবে যুক্ত হতে থাকল । খুব প্রফেশনাল বাদক ছিলেন না কেউ । কিন্তু এমন সীমাবদ্ধতা একটার পর একটা গান চলাকে থামাতে পারেনি ।

শিল্পীর গাওয়া বৈঠকে এমন এক আবেগময় পরিস্থিতি তৈয়ার করল যে, মানুষ এক পর্যায়ে নিজের ভিতরের সমস্ত প্রেম দিয়ে, একজন আরেক জনকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল । এই কান্না পরস্পরকে নতুন বন্ধনে বাধে মনে হয় । যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের পূর্বে ঘটে থাকা ক্ষুদ্রতা, এক মধুময় আকুলতায় বিলীন করে দেয়ার ভাবে; কেঁদে উঠে ।
এমন কান্না আমরা আপন জনের মৃত্যুতেও কাঁদি । মৃত্যুই মানুষের পরম যাত্রা । যার মাধ্যমে মানুষ স্বর্গীয় হয়ে উঠে । উঠে পবিত্র হয়ে । এই যাত্রায় প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয় । যেখানে সে জীব থেকেহয়ে উঠে ‘মানুষ’ । হয়ত ফিরে যায় উৎসে । যেমন বলা হয়, প্রত্যেক মানুষকেই তাঁর উৎসে ফিরে; মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। দয়াল প্রেমের পাগল শিল্পীর গান আমাদের মৃত্যুর দিয়ে টেনে নিয়ে গেল । যেমন মৃত্যু ‘মানুষ’ মাত্রই চাইবার কথা ।

মৃত্যু ভাব জাগানিয়া এমন আকুলতা ভরা গান, বাংলার ঘরে ঘরে রিদয়ে গেঁথে আছে । বানান আপনাদের এই আকুলতার কাছে বারবার নিয়ে যাবে ।

[icon size=”” icon=”icon-user” display=”true” ][/icon] লেখা, ক্যামেরা – মোহাম্মাদ রোমেল ।


You Might Be Interested In

LEAVE A COMMENT