বানান হয়ে ওঠা সময়

বেগুন চুরি এবং বিটি বেগুন: প্রকৃতি ও মানুষ বিকৃতির নয়া কৌশল

103
7239 views

বাংলাদেশের মাটি, বীজ, প্রাণ, প্রকৃতি তথা কৃষি আজ ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশি-বিদেশি কর্পোরেট পুঁজি । যেখানে রাষ্ট্র, তার প্রতিষ্ঠান তাদের এই ধ্বংস প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে । কৃষকের হাত থেকে বীজের দখল চলে যাচ্ছে দেশি-বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির হাতে ।

এইসব কর্পোরেশন উচ্চফলনের নানান প্রচারণা চালিয়ে একদিকে মাটিতে-ফসলে বিষ দিয়ে তারা আমাদের নিরাপদ খাদ্য-জমি বিনাশ করে দিচ্ছে । অন্যদিকে তারা দখলে নিতে চাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষকের বীজ নিজেদের হাতে । ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে তারা পরাধীনতার নতুন ফাঁদে আমাদের আটকে ফেলছে ।

St 02

এইসব দখল-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একদল লেখক, সাংবাদিক, ফিল্মমেকার, রাজনৈতিক কর্মী নানান ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন । তাদের প্রতিরোধ চেষ্টার একটি ফসল হচ্ছে  ‘বিটিবেগুন বিসম্বাদ’ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ।

যেখানে তারা দেখানোর চেষ্টা করেছেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) ‘মার্কিন কোম্পানি মনস্যান্টো’ ও তাদের ভারতীয় দোসর ‘মহারাষ্ট্র হাইব্রিড সিড কোম্পানি লিমিটেডের (মাহিকোর)’ কাছে, বাংলাদেশের প্রাণসম্পদ বেগুনের মালিকানা তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে ।  জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার জিন ঢুকিয়ে স্থানীয় বেগুন জাতে কিভাবে তারা বিকৃতি ঘটিয়েছে ।

যা করতে গিয়ে তারা বৈজ্ঞানিক রীতি, দেশি ও আন্তর্জাতিক আইন-গাইডলাইন-বিধিমালা-প্রটোকল কিছুই মানেন নাই । যেখানে জিম্মি হয়ে যাচ্ছে কৃষক । চরম ভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে কোটি কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্যের অধিকার ।

বিটি বেগুনের নামে এই ধরণের গবেষণায় প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতি রক্ষা না করায়, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের উপর এই বেগুনের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তাদের আশঙ্কার কথা আছে এই ফিল্মে । তারা আরো জানান, এই বেগুনের মেধাস্বত্ব নিয়ন্ত্রণ করবে মনস্যান্টো-মাহিকো । আর সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএআরআই ও বেসরকারি বীজ, কৃষি-রাসায়নিক কোম্পানি ‘লাল তীর সীডস লি.’  মনস্যান্টো-মাহিকোর সাথে সেই চুক্তিই সম্পন্ন করেছে । এইসব ষড়যন্ত্র-তৎপরতার সবচাইতে বড় ভুক্তভোগী বেগুন নিজেই । সেইটা পুরো ফিল্মে তারা নানান ভাবে তোলে ধরেছেন । তারা আর দেখানোর চেষ্টা করেছেন বেগুনের আদি উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ । এখানকার বেগুনের বৈচিত্র্য ধ্বংস করতে ধেয়ে আসছে বিটিবেগুনের বোমা ।

st 01

এইসব আগ্রাসনের চিত্র আরো বিস্তারিত ভাবে তারা ফিল্মের সাথে সাথে একখান পুস্তিকায় তুলে ধরেছেন ।

প্রামাণ্যচিত্র ‘বিটিবেগুন বিসম্বাদ’ দেখানোর পর বানানের পক্ষ থেকে এই ছবির নির্মাণ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত জাঈদ আজিজ,পাভেল পার্থ, ফয়সাল রহমান, দেলোয়ার জাহান, আশীষ দাশের সাথে আলাপ হয় এই ছবির আইডিয়া, নির্মাণ প্রক্রিয়া, প্রচার, প্রদর্শন চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে ।

সেই আলাপ এবং ছবির বিশেষ বিশেষ অংশ বানানের দর্শকদের জন্য প্রায় ৪৫ মিনিটের ভিডিও ক্লিপে এখানে প্রচার করা হল ।

গত ৬ জুন ২০১৬ এই  ‘বিটিবেগুন বিসম্বাদ’ প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনী এবং তা নিয়ে আলোচনা হয়ে গেল ঢাকার বাংলামটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ইসফেন্দিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে ।
সেখানে আলোচনায় অংশ নেন আনু মুহাম্মদ, ফরিদা আখতার, অরূপ রাহী সহ নির্মাণ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত অনেকে ।

12       15

16       Still 3

চলচ্চিত্র “বিটিবেগুন বিসম্বাদ” দেখানোর পাশাপাশি  নির্মাতাদের পক্ষ থেকে যে পুস্তিকাটা প্রকাশ করা হয়, সেই পুস্তিকার পুরোটা এখানে ছাপিয়ে দেয়া হল ।

+++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++

বিটিবেগুন বিসম্বাদ

পুুস্তিকা প্রস্তুতকারক:
পাভেল পার্থ
ফয়সাল রহমান
তৌহিদুল ইসলাম
গোলাম মুর্শেদ
অরণ্য প্রভা
শাওন ইসলাম

প্রকাশক: ছবির লড়াই
প্রকাশকাল: জুন, ২০১৬
যোগাযোগ: [email protected]

ভূমিকা

বিসম্বাদ এই যে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) মার্কিন কোম্পানি মনস্যান্টো ও তাদের ভারতীয় দোসর মহারাষ্ট্র হাইব্রিড সিড কোম্পানি লিমিটেডের (মাহিকোর) কাছে বাংলাদেশের প্রাণসম্পদ বেগুনের মালিকানা তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার জিন ঢুকিয়ে স্থানীয় বেগুনের জাতের বিকৃতি ঘটিয়েছে তারা। তাদের দাবি, এসব বেগুন নিজের ভিতরেই মাজরা পোকার বিষ তৈরি করবে। এতে ওই পোকার জন্য আলাদা করে কীটনাশক দিতে হবে না, উৎপাদন খরচ কমবে।

প্রকল্প মোতাবেক, ২০১৪ সালে দেশের ২০ জন কৃষকের হাতে এবং ২০১৫ সালে আরো ১০৬ জনের কাছে বিটিবেগুনের চারা তুলে দিয়েছে বিএআরআই। মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএইড এর অর্থয়নে কৃষি জীব প্রযুক্তি সহায়তা প্রকল্প দুই বা এবিএসপি-২ এর অধীনে চলছে বিটিবেগুন গবেষণা ও চাষের নামে নানা ছলচাতুরি। প্রথম দু’বছর ফলন বিপর্যয়ের কারণে লোকসান গুনতে হয়েছে কৃষককে। বৈজ্ঞানিক রীতি, দেশি ও আন্তর্জাতিক আইন-গাইডলাইন-বিধিমালা-প্রটোকল ভেঙেই চলছে প্রকল্পের কাজ। জিম্মি করা হচ্ছে কৃষককে। লঙ্ঘন করা হচ্ছে কোটি কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্যের অধিকার।

যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা না হওয়ায়, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের উপর এই বেগুনের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমরা শঙ্কিত। তার ওপর এই বেগুনের মেধাস্বত্ব নিয়ন্ত্রণ করবে মনস্যান্টো-মাহিকো। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএআরআই ও বেসরকারি বীজ, কৃষি-রাসায়নিক কোম্পানি ‘লাল তীর সীডস লি.’ মনস্যান্টো-মাহিকোর সাথে সেই চুক্তিই সম্পন্ন করেছে।

তবে এই ষড়যন্ত্রের সবচাইতে বড় ভুক্তভোগী বেগুন নিজে। বেগুনের আদি উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ। এখানকার বেগুনের বৈচিত্র্য ধ্বংস করতে ধেয়ে আসছে বিটিবেগুনের বোমা। আমাদের পুস্তিকায় এই আগ্রাসনের চিত্রই তুলে ধরতে চেয়েছি পাঠকের সামনে।

বিটি জিন

জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে বেগুনের ভেতর একটি জীবাণুর (ব্যাকটেরিয়ার) জিন ঢুকিয়ে গবেষণাগারে এই কৃত্রিম বেগুন তৈরি করা হয়েছে।

বিটি হলো মাটিতে বসবাসকারী জীবাণু। বৈজ্ঞানিক নাম ‘ব্যাসিলাস থুরিনজিএনসিস’। এককোষী এ জীবাণুটি আকারে মানুষের চুলের ব্যাসের লক্ষ ভাগের একভাগ মাত্র। তবে অন্যসব জীবকোষের মতো এর কোষে থাকে বংশগতি নির্ধারণকারী উপাদান বা ডিএনএ। ডিএনএ দেখতে পেঁচানো একজোড়া সিঁড়ি বা মইয়ের মতো, যার বিভিন্ন ধাপকে বলে জিন।

বিটি জীবাণুর দেহে ডিএনএ ছাড়াও প্লাজমিড নামের জিন দিয়ে তৈরি অংশ থাকে। এ প্লাজমিডেরই একটা জিনের কারণে-এর দেহে একপ্রকার ক্রিস্টাল প্রোটিন তৈরি হয়। যা বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকাকে মেরে ফেলতে পারে।

বিটিবেগুন

বিটি ব্যাকটেরিয়ার সেই ক্রিস্টাল প্রোটিন তৈরিকারী জিন কেটে নতুন শেকড় ও পাতা গজানো বেগুন-বীজের কোষের ডিএনএর সাথে জোড়া দেয়া হয়। বিটি-জিন ঢুকানো হয় বলে এর নাম বিটিবেগুন।

বিটি জিনের কারণে বেগুনকোষও ক্রিস্টাল প্রোটিন তৈরি করবে, যা ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার অন্ত্রের রিসেপ্টর দ্বারা গৃহীত হয়ে জৈব উৎসেচকের উপস্থিতিতে ভেঙে গিয়ে অ্যান্ডোটক্সিন রাসায়নিক তৈরি করবে। অ্যান্ডোটক্সিন পোকার অন্ত্রের ক্ষারীয় পরিবেশ (বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার পাকস্থলীর ভেতরের অংশের পিএইচ প্রায় ৯.৫ শতাংশ) বদলে দিয়ে এর অন্ত্র ছিদ্র করে ফেলে যার ফলে পোকাটি মারা যায়।

বিটি জিনের মালিকানা মনস্যান্টোর

বিটি জিন এবং বিটি জিন প্রযুক্তির মেধাসত্ত্ব ও মালিকানা মার্কিন বহুজাতিক কৃষিবাণিজ্য কোম্পানি মনস্যান্টোর। ভারতীয় করপোরেট কোম্পানি মাহিকো মনস্যান্টোর কাছ থেকে এই বিটি জিন প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমোদন লাভ করে। পরবর্তীতে মাহিকো কোম্পানির এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটিবেগুন উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপের’ মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইনকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ‘কৃষিতে জীবপ্রযুক্তি সহায়তা প্রকল্প-২ (অমৎরপঁষঃঁৎধষ ইরড়ঃবপযহড়ষড়মু ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ চৎড়লবপঃ-ওও বা এবিএসপি-টু) নামে ২০০৫ সালে বিটিবেগুন প্রকল্প চালু হয় মার্কিন দাতাসংস্থা ইউএসএইডের সহায়তায়।

অন্যায় চুক্তি

২০০৫ সালের ১৪ মার্চ বিএআরআই, মাহিকো এবং এবিএসপি-টু এর পক্ষে সৎগুরু ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস প্রাইভেট লিমিটেড এক চুক্তি করে। এটি ‘সৎগুরু চুক্তি’ হিসেবে পরিচিত। এর আগে, বিএআরআই মাহিকোর সাথে ‘ম্যাটেরিয়াল ট্রান্সফার এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করে ২০০৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি।

এছাড়া একই বছর ব্যক্তিমালিকানাধীন লাল তীর সিডস লিমিটেড (লাল তীর) এর সাথেও একইরকম দু’টি চুক্তিÑ‘শতগুরু চুক্তি’ ও ‘ম্যাটেরিয়াল ট্রান্সফার এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হয় ওই প্রকল্পের আওতায়।

বিএআরআইয়ের করা ‘সৎতগুরু চুক্তি’ অনুযায়ী বাংলাদেশের উত্তরা (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪০৯), কাজলা (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪১০), নয়নতারা (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪১১), শিংনাথ (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪১২), দোহাজারী (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪১৩), চ্যাগা (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪১৪), খটখটিয়া (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪১৫), ইসলামপুরী (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪১৬) এবং ঈশ্বরদী লোকাল (একসেশন নং-ইসি ৫৪৯৪১৭) এ-নয়টি জাতের বেগুনকে বিটিবেগুন গবেষণা প্রকল্পে ব্যবহারের অনুমতি দেয় বিএআরআই। এদের ভেতর নয়নতারা জাতটির উৎপত্তি ভারতে। ১৯৯৮ সালে বিএআরআই এটিকে বাংলাদেশে চাষের অনুমতি দেয়।

চুক্তির ১.১৯ নং শর্তে স্পষ্ট বলা হয়েছে বিটিবেগুন প্রকল্পে ব্যবহৃত বিটি জিন, বিটি প্রযুক্তি এবং এ প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত বা বিক্রয়যোগ্য সকল বিটিবেগুনের ওপর মেধাস্বত্ব অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ মনস্যান্টো কোম্পানির। মনস্যান্টোর স্বত্ব বিটি জিন বাংলাদেশি বেগুনে ঢুকানোর ভেতর দিয়ে উল্লিখিত চুক্তি মোতাবেক এখন মনস্যান্টো বাংলাদেশের নয়টি বেগুনের ওপর তার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের বৈধতা পেয়েছে।

সংবিধান লংঘন

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ নিরাপত্তা বিধান করবেন।” সেই অনুযায়ী দেশের বেগুনের জাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র দেশের সম্পদ অন্যায়ভাবে কোনো করপোরেট জিম্মায় তুলে দিতে পারেন না।

বাংলাদেশের প্রাণসম্পদের ওপর সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের মালিকানা নিরূপিত। দেশে এমন কোনো আইন বা নীতি নেই যা দেশের কোনো প্রাণসম্পদের ওপর বহিরাগত বহুজাতিক কোম্পানির মেধাস্বত্ব বা মালিকানাকে বৈধতা দেয়।

আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদের লঙ্ঘন

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদের (১৯৯২) অনুচ্ছেদ-১৫ অনুযায়ী, “কোনো রাষ্ট্রের প্রাণসম্পদের ওপর অন্য কোনো পক্ষের অভিগম্যতা কিভাবে ও কতটুকু হবে, তা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সরকার এবং তা হবে জাতীয় আইনের অধীন।” অর্থাৎ রাষ্ট্রের ছাড়পত্র লাগবে।

কিন্তু দেখা যায় বহুজাতিক কোম্পানির হয়ে দাতাসংস্থারা এসব ছাড়পত্র এবং বহুজাতিক কোম্পানির মেধস্বত্বের আইনি গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে জাতীয় আইন ও নীতিগুলো তৈরিতে রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশও এবিএসপি-টু বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০০৫ সালে একটি বায়োসেফটি গাইডলাইন তৈরি করে, ২০০৬ সালে জাতীয় খাদ্যনীতিতে জিএম খাদ্যকে বৈধতা দেয়, ২০১০ সালে জীব-নিরাপত্তা আইন খসড়া করে।

রাষ্ট্রের কৃষিনীতি ও ট্রিপস

২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি কৃষকদের মাঝে বিটি বেগুনের চারা বিতরণ অনুষ্ঠানে বিটি বেগুনের মেধাস্বত্ব বিষয়ে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী বলেন, বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার, বাণিজ্য-সংক্রান্ত অধিকার, মেধাস্বত্ব ইত্যাদিসহ বিদ্যমান এবং অনাগত অন্য অনেক বিধিব্যবস্থা মেনেই জিএম ফসলের বাস্তবতাকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে হবে।

উল্লেখ্য, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব চুক্তির (ট্রিপস) ২৭.৩ (খ) অনুচ্ছেদে প্রাণসম্পদ, জ্ঞান, প্রযুক্তির ওপর পেটেন্টের বৈধতা রাখা হয়েছে। সেই সূত্র ধরেই বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশের মতো গরিব দেশকে জিনসম্পদ লুটতরাজের সবচেয়ে নিরাপদ ক্ষেত্র মনে করছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নিয়ন্ত্রিত করপোরেট বিশ্বায়নে মানুষের সম্পদ, সম্ভাবনা, জ্ঞান, মেধা সবই একতরফাভাবে গবেষণা ও উন্নয়নের নামে ডাকাতি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ভারত ও ফিলিপাইনের না, বাংলাদেশের হ্যাঁ

এই প্রাণডাকাতির উদাহরণ তো এবিএসপি-টু-এর অধীনে ভারত, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে একযোগে চলতে থাকা বিটিবেগুন প্রকল্প থেকেই দেওয়া যায়। ২০০৬ সালে ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় বিটি বেগুনের ছাড়ের ওপর দশ বছরের স্থগিতাদেশ দেয়। পরে সেখানকার উচ্চ আদালতও মতামত দেয় যে, বিটিবেগুন প্রকল্পের আওতায় এই জিন-পরিবর্তিত ফসলের সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। আদালত আরো বলে যেÑযা পরীক্ষা-নীরিক্ষা মাহিকোর অর্থায়নে হয়েছে তাও যথাযথ হয়নি।

ফিলিপাইনের উচ্চ আদালত ২০১৩ সাল থেকে সে দেশে বিটিবেগুনের ছাড় দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রাখার পর ২০১৬ সালে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। অথচ ভারত ও ফিলিপাইনের পথ অনুসরণ না করে বাংলাদেশ কৃষক পর্যায়ে বিটিবেগুন চাষের অনুমোদন দেয়।

প্রাণডাকাতি

২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি কৃষকদের মাঝে বিটি বেগুনের চারা বিতরণ অনুষ্ঠানে বিটি বেগুনের মেধাস্বত্ব বিষয়ে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী বলেন, বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার, বাণিজ্য সংক্রান্ত অধিকার, পেটেন্ট ইত্যাদিসহ বিদ্যমান এবং অনাগত অন্য অনেক বিধিব্যবস্থা মেনেই জিএম ফসলের বাস্তবতাকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। তার মানে আমরা স্পষ্ট হতে পারি যে, রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ কেবলমাত্র মনস্যান্টোর একটি বিপদজনক প্রযুক্তিকেই সফল করে তুলব না, এই বিটিবেগুন প্রকল্পের উপজাত হিসাবে এমন একটি আইনি-কাঠামো ও বিধিব্যবস্থা চালু করবে যাতে কার্যত আর এদেশের প্রাণসম্পদের কোনো মালিকানা ও মেধাস্বত্ব দাবি করা যাবে না।

এটিই নয়াউদারিকরণ ব্যবস্থার প্রাণ-উপনিবেশিকরণের রাজনৈতিক-অর্থনীতি। যা আজ বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের ঘাড়ে বসে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

রাষ্ট্রকে এই বহুজাতিক প্রাণ-উপনিবেশিকরণের বিরুদ্ধে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশের বেগুন নিয়ে সব সিদ্ধান্ত, রূপান্তর, বিকাশ ও মালিকানা বাংলাদেশের জনগণের। তাই বিটিবেগুন বাতিল করে দেশী বেগুন অর্থনীতিকে বিকশিত হবার সুযোগ করে দেয়াই হবে রাষ্ট্রের যথাযথ কর্তব্য।

বিটিবেগুন চাষে কি কীটনাশকের ব্যবহার কমবে?

বিটিবেগুনকে বৈধতা দিতে বিএআরআইকে নাকেমুখে কাজ করতে হয়েছে। সরকারিভাবে স্বাস্থ্য-পরিবেশ-বাণিজ্য-উৎপাদন-সংস্কৃতি-মেধাস্বত্ব-বৈচিত্র্য সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে বারবার বলার চেষ্টা করা হয়েছে বিটিবেগুন চাষে কীটনাশকের ব্যবহার কমবে। ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি বিটিবেগুনের চারা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইউএসএইউ-বাংলাদেশের মিশন ডিরেক্টর জানিনা জারুজেলস্কিও বলেন, বিটিবেগুন চাষে বেগুনের উৎপাদন বাড়বে, কিন্তু কীটনাশক ব্যবহার কমে যাবে।

বিটিবেগুন প্রকল্প চলার সময়েই আশ্চর্যজনকভাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ‘সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপএম) প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি হিসেবে ‘বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা ব্যবস্থাপনার’ প্রচারপত্র প্রকাশ করে ২০১১ সালের এপ্রিলে। প্রচারপত্রে উল্লেখ করা হয়, ক্রমাগতভাবে বেগুনের জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে এ পোকা কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জন করেছে। প্রাকৃতিক শত্রুর ভূমিকা এবং পরিবেশের কথা চিন্তা না করে বেগুন ক্ষেতে নিয়মিত কীটনাশক ব্যবহারের যে রীতি আজও এদেশে প্রচলিত আছে, তার আশু পরিবর্তন প্রয়োজন।

বিটিবেগুন চাষ করলে এটি কেবলমাত্র বেগুনের ফল ও কা- ছিদ্রকারী পোকাকেই দমন করতে পারবে, তাও খুব বেশি দিন নয়। কারণ এক পর্যায়ে পোকাটি আরো বেশি সহনশীল, প্রতিরোধী ও সহিংস হয়ে উঠবে। তখন আর এইসব বিটিবেগুন জাত কোনো কাজে আসবে না। বিষয়টি আন্দাজ করেই সম্ভবত ২০০৫ সালের ‘সৎগুরু চুক্তির’ ৯.২ (ই) শর্তে বলা হয়েছে, বিটিবেগুন যদি ফল ও কা- ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী না হয় বা এ বেগুনের প্রতি যদি উক্ত পোকা প্রতিরোধী হয়ে ওঠে তবে বিএআরআই মাহিকোর সাথে উল্লিখিত চুক্তিটি বাতিল করতে পারবে।

বিটিবেগুনের মতো জিএম ফসল আবাদ করে দুনিয়ার কোথাও বিষের ব্যবহার কমেনি বরং নানামাত্রায় বেড়েছে। জিএম শস্য চাষাবাদ বেড়ে যাওয়ায় আমেরিকাতে জিএম জমিতে প্রাণসংহারী বিষের ব্যবহারও বাড়ছে। ১৯৯৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কীটনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার ৪০৪ মিলিয়ন পাউন্ড বেড়েছে। (সূত্র: রয়টার, ১ অক্টেবর, ২০১২)।

বাংলাদেশের বিটিবেগুন বিজ্ঞানীরাও এটি অস্বীকার করতে পারছেন না। তাই ‘বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তির বিটি বেগুনের জাত উদ্ভাবন ও উৎপাদন প্রযুক্তি’ শীর্ষক পুস্তিকাটির প্রসঙ্গ-কথায় বিএআরআইয়ের গবেষণা বিভাগের পরিচালক ড. মো. খালেদ সুলতান বলেছেন, বিটিবেগুনের ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত হওয়ায় পরিবেশ দূষণ হবে না। কিন্তু বিটিবেগুনের মতো জিন-পরিবর্তিত ফসল একটি সমস্যা মোকাবিলা করতে পারলেও, আরেকটি করতে ব্যর্থ হয়। মানে সমস্যা বেড়েই চলে।

বেগুনসহ কৃষিকে যদি সত্যিকার অর্থেই কীটনাশকমুক্ত করতে হয়, তবে রাষ্ট্রের কৃষি ও উৎপাদনের রাজনৈতিক দর্শনকে প্রথমত বহুজাতিক দস্যুতা থেকে মুক্ত করতে হবে। আজ বিটিবেগুনকে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামীতে বিটিতুলা, জিএম আলু, গোল্ডেন রাইস আসবে হয়তোবা। কিন্তু দেশের কৃষি ও খাদ্যের মজবুত ভিত্তি কোনোভাবেই দাঁড়াবে না, যদি না রাষ্ট্র জনগণের প্রাণসম্পদ ও উৎপাদনের রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করে।

বিটিবেগুন বিরোধিরা কীটনাশক-বিরোধী

দেশব্যাপী যারা বিটিবেগুনের বিরোধিতা করছেন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে কীটনাশক কোম্পানির স্বার্থে এসব বিরোধিতা করা হচ্ছে। কিন্তু বিটিবেগুনের বিরোধিতা করা মানে মনস্যান্টো-মাহিকো-সিনজেনটার মতো করপোরেট কৃষিবিষ কোম্পানির একতরফা কৃষিবাণিজ্য-দস্যুতার বিরুদ্ধেই দাঁড়ানো।

এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি মনস্যান্টো এবং বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের মধ্যে ১৯৯৮ সালে প্রথম জিন প্রযুক্তিতে বিকৃত বীজ (জিএম শস্য বীজ) কার্যক্রম নিয়ে একটি বাণিজ্য কর্মসূচির চুক্তি স্বাক্ষর প্রকাশের পর পরই বাংলাদেশের জনগণের বিরাধিতার চাপে এটি বাতিল হয়। পরে ২০১০ সালে সিনজেনটা যখন বাংলাদেশে হাইব্রিড টমেটো বীজ কেলেংকারি করে তখনও জনগণ সিনজেনটার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ২০১২ সালে দিনাজপুরে লিচুতে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে যখন ১৩টি বাচ্চা মারা যায়, জনগণ সে ঘটনার বিচার দাবি করে। যখনই জনগণ এসব কোম্পানির একতরফা নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তখনই সরকার জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

কীটনাশক কোম্পানির স্বার্থে বিটিবেগুনের বিরোধিতার কোনো আশ্চর্যরকম তথ্য সরকারের কাছে থাকলে অবশ্যই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করা উচিত। বাংলাদেশে ৯৫ রকমের সবজি চাষ হয়। মোট আবাদি জমির (১৯৩ লাখ একর) ২.৫ ভাগ মানে প্রায় ৫ লাখ একর জমিতে সবজি চাষ হয়। এর ভেতর ১,১৫,৪২৪ একর জমিতে চাষ হয় বেগুন (বিবিএস ২০১০)। ২০১০ সালে বাংলাদেশে ২১,৪৬৪.৪০ টন বালাইনাশক ব্যবহৃত হয়েছে। এর ভেতর কীটনাশক ১৩,৫৮৫.৪৪ টন। বেগুনের ক্ষেতে ৩১৪ টন কীটনাশক ব্যবহৃত হয়েছে। দেশে এক বছরে যে পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহৃত হয় তার মাত্র ৩০০ ভাগের একভাগ মানে ৮২.২৫ টন বেগুনে ব্যবহৃত হয়। যদিও আমরা দেশের কৃষি ও জুমে এক বিন্দুও বহুজাতিক কোনো বিষবাণিজ্য মানি না।

প্রশ্নবিদ্ধ কৃষিপরামর্শ

একটু অনুসন্ধান করলেই দেখা যাবে, মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই বেগুন চাষের জন্য, এমনকি বিটিবেগুন চাষের জন্যও কোম্পানির বিষ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে এসেছে নির্লজ্জভাবে। তারা ‘কৃষি-পরামর্শ’ হিসেবে প্রচার করছে কোম্পানির বিজ্ঞাপন। বাংলাদেশে এখন ৩০০০ নিবন্ধনকৃত বিষ কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও আগাছানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাষ্ট্রই বহুজাতিক কৃষিবাণিজ্য কোম্পানিগুলোকে দেশে বিষ বাণিজ্যের এই অবাধ বৈধতা দিয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিটিবেগুনের চাষ নির্দেশিকা পুস্তকে নির্লজ্জভাবে কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিএআরআই কর্তৃক ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তির বিটি বেগুনের জাত উদ্ভাবন ও উৎপাদন প্রযুক্তি’ শীর্ষক একটি পুস্তিকায় বিটিবেগুন চাষের নির্দেশনায় বিএআরআই কৃষকদের কুমুলাং ডিএফ, নো-ইন, ব্যাভিস্টিন, ওমাইট, ট্রিকস, ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি, ডায়াথেন এম-৪৫, ভাইটাভেঙ-২০০, ক্যাপ্টেন এবং এডমায়ার ২০০ এস এলের মতো প্রাণ ও প্রকৃতি সংহারী রাসায়নিক বিষ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।

কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব মৌলিক নীতি মেনে চলা দরকার, বিএআরআই তা ভঙ্গ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কোম্পানির ট্রেড নাম পণ্যগুলোকেই সরাসরি বিটিবেগুনের রাষ্ট্রীয় পুস্তিকায় ব্যবহারের জন্য উল্লেখ করেছে। বিএএসএফ-কানাডার কুমুলাঙ ডিএফ, বায়ার ক্রপ সায়েন্সের এডমায়ার ২০০ এসএল, সিঙ্গাপুরের সানডাট কোম্পানির নো-ইন, ইতালির ইউনিরয়েল কেমিকেল কোম্পানির ওমাইট, ইউনাইটেড ফসফরাস কোম্পানির ট্রিকস, আমেরিকার ডাউ এগ্রোসাইন্সের ডায়াথেন এম-৪৫, ক্যামচুরা করপোরেশনের ভাইটাভেঙ, বিএএসএফ-জার্মানির ব্যাভিস্টিন এবং সাউদার্ন এগ্রিকালচারাল ইনসেক্টিসাইড ইনকরপোরেশনের ক্যাপ্টেন।

এভাবে সরাসরি কোম্পানিগুলোর বিষের বাজারি নাম ব্যবহার না করে এর রাসায়নিক নাম ব্যবহার করাই মৌলিক নৈতিকতা। যদিও এ বিষয়ে বিএআরআইয়ের মহাপরিচালক বলেছেন, কোনো অসৎ উদ্দেশে এসব কোম্পানির পণ্যের নাম ব্যবহৃত হয়নি, তবে ব্র্যান্ডকে এভাবে প্রমোট করা অনৈতিক (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, ৯ মার্চ ২০১৪)।

সরকারি তথ্যে গরমিল

প্রকল্পের হয়ে বিএআরআই হিসাব দিচ্ছে যে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা বেগুনের ফলন ৭৫ ভাগ পর্যন্ত নষ্ট করে। গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বিএআরআই-র মহাপরিচালক দাবি করেছেন, দেশের কৃষকেরা বেগুন মওসুমে মাজরা পোকা দমনে ৬০-১৮০ বার কীটনাশক ব্যবহার করেন। এসব তথ্য অতিরঞ্জিত ও একপেশে। বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা ব্যবস্থাপনার প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, বেগুনের দেশি জাতগুলো পোকা প্রতিরোধী নয়। তবে বিভিন্ন জাতে পোকার আক্রমণে পার্থক্য দেখা যায়। যেসব জাতে পোকার আক্রমণ কম হয়, এক্ষেত্রে সেগুলো চাষ করাই সমাধান। যেমনÑবিএআরআই বেগুন-৬ এবং বিএআরআই বেগুন-৮।

বিএআরআই এর নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় জাতের বেগুনে পোকার আক্রমণ খুব কম হয়। যেমনÑঝুমকি বেগুনে পোকা খুবই কম লাগে, মাত্র ১-১০% (ঐরমযষু জবংরংঃধহঃ), খটখটিয়াতেও মোটামুটি কম লাগে, ২০% (ঋধরৎষু জবংরংঃধহঃ)। কিছু বেগুন যেমনÑইসলামপুরির ২১Ñ৩০% পোকার সম্ভাবনা আছে (ঞড়ষবৎধহঃ) এবং ইরি বেগুনে একটু বেশি লাগে (৪১%-এর বেশি)। উক্ত সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় ৮টি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে, ট্রাইকোগ্রামা, ব্রাকন ও ট্রাথালা নামের বোলতা ও উপকারী পতঙ্গকে বেগুনক্ষেতে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছে। সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে অনুমোদিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করারও পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় ৮টি ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। ট্রাইকোগ্রামা, ব্রাকন ও ট্রাথালা নামের বোলতা ও উপকারী পতঙ্গকে বেগুনক্ষেতে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছে। শেষ ব্যবস্থা হিসেবে অনুমোদিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করারও পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিসের ২০১২ সনের জুলাই মাসে ‘বেগুন চাষ’ নামে একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করে। এই প্রচারপত্রে উত্তরা, কাজলা, নয়নতারা, শিংনাথ, খটখটিয়া বেগুন জাতগুলোকে কা- ও ফল ছিদ্রকারী পোকার প্রতি মাঝারি প্রতিরোধক্ষম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

বিটিবেগুন প্রকল্পের রোডম্যাপ

বাংলাদেশ বিটিবেগুন প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০০৫ সালে একটি বায়োসেফটি গাইডলাইন তৈরি করে, ২০০৬ সালে জাতীয় খাদ্যনীতিতে জিএম খাদ্যকে বৈধতা দেয়, ২০১০ সালে জীবনিরাপত্তা আইন খসড়া করে। ২০১৩ সনের ১৩ জুন রংপুরে, ২১ জুন যশোরে, ২২ জুন চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বিটিবেগুন গবেষণার মাঠ দিবস উদযাপন করে বিএআরআই।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর বিএআরআই কর্তৃক ছাড়পত্রের জন্য আবেদনকৃত চারটি বিটিবেগুন জাত বিষয়ে ৭টি শর্তসহ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। উক্ত প্রজ্ঞাপনে সীমিত চাষাবাদ, নিয়ন্ত্রিত চাষাবাদ, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি যাচাই এবং বিটিবেগুন মোড়কীকরণের শর্ত দেওয়া হয়। জনগণের বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে জাতীয় বীজবোর্ড ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর উত্তরা (বারি-১), কাজলা (বারি-৪), নয়নতারা (বারি-৫) এবং বারি-৬ কে যথাক্রমে বিটিবেগুন ১, ২, ৩, ৪ নামে পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্র অনুমোদিত বিটিবেগুন হিসেবে ছাড় দেয়।

২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি মাননীয় কৃষিমন্ত্রী গাজীপুর, পাবনা, রংপুর ও জামালপুরের কৃষকদের হাতে বিটিবেগুনের চারা তুলে দেন। পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত সংবাদ যে, ২০১৪ সনের মার্চ-এপ্রিল মাসে গাজীপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও রংপুরের রাষ্ট্র কর্তৃক মনোনীত কৃষকদের বিটিবেগুন ক্ষেতে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা, পাতা কোঁকড়ানো, রেড মাইট, এফিডসহ বিভিন্ন পতঙ্গ ও নানান রোগবালাই দেখা দেয়। পাশাপাশি বিটিবেগুন ও প্রাণপ্রযুক্তির বিপদ নিয়ে পরিবেশবাদী, স্বাস্থ্য আন্দোলনকারী, গণমাধ্যমকর্মী ও কৃষিসুরক্ষাকর্মীদের সাহসী প্রতিবাদী ঝাঁঝ বাংলাদেশেও দানা বাধে। বিটিবেগুন নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাও হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত বিটিবেগুন নিয়ে জনগণের আপত্তি, আশংকা ও আওয়াজের কোনো ন্যায্য উত্তর দেয়নি।

এবছর ১৩ মে দি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী সামনের শীতেই আরও ৫,০০০ কৃষককে বিটিবেগুনের চারা দিতে যাচ্ছে সরকার।

কৃষকের মাঠে কেমন ফলে বিটিবেগুন?

পোকায় সাবাড় করছে বিটি বেগুন ক্ষেত

দেলোয়ার জাহান, শ্রীপুর থেকে ফিরে

সকালের খবর, ৭ এপ্রিল, ২০১৪

চাষিদের মাঠে জিএমও বিটিবেগুন পোকায় সাবাড় করছে। বেগুন গাছ আক্রান্ত হয়ে পড়েছে একাধিক রোগবালাইয়ে। দিশেহারা চাষি বিটিবেগুন গাছ বাঁচাতে প্রয়োগ করছেন কীটনাশক। অথচ বিটিবেগুন চাষে পোকার আক্রমণ কম হবে, কীটনাশক ছাড়া উৎপাদন; তাই পরিবেশ দূষণ কমবেÑএমন কথা প্রচার করেছিল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। ফলে বিটি বেগুন চাষিদের উৎসাহিতকরণের মূলমন্ত্র ‘কীটনাশক প্রয়োগ কমবে’ ভেস্তে যেতে বসেছে। চলতি বছর ২২ জানুয়ারি সরকার ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাবনা, জামালপুর, রংপুর, গাজীপুর ও শেরপুর জেলার ২০ কৃষকের হাতে বিটি বেগুনের চারা তুলে দেয়। এদের একজন হলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার সাইটাইল গ্রামের বিটিবেগুন চাষি হাইদুল ইসলাম। গত মঙ্গলবার সরেজমিনে হাইদুল ইসলামের বিটিবেগুন ক্ষেতে দেখা যায়, প্রায় ৩০ শতাংশ গাছই মরে গেছে। কিছু গাছ রোগাক্রান্ত হয়ে নুয়ে পড়েছে। পাতাগুলো কুঁকড়ে যাচ্ছে। কৃষক হাইদুল ইসলাম জানান, গত বছর একই জমিতে তিনি দেশি জাতের বেগুন চাষ করে লাভবান হয়েছেন। কিন্তু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে অনেক বেগুন নষ্ট হয়, বারবার কীটনাশক দিতে হয়। তাই চলতি বছর বারি ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে বিটি বেগুন চাষ করেন। কর্মকর্তারা বলেছিলেন, তিনি ভাগ্যবান। কারণ সারাদেশ থেকে মাত্র ২০ জন কৃষককে বাছাই করা হয়েছে যাদের একজন তিনি। হাইদুল বলেন, কিন্তু চারা লাগানোর পর একটু সতেজ হওয়ার পর গাছগুলো মরে যাচ্ছে। বিভিন্ন পোকামাকড় আক্রমণ করছে। কৃষি কর্মকর্তারা কীটনাশক দিতে বলেছেন। হাইদুল বলেন, কৃষিতে বেগুন চাষই তার আয়ের প্রধান পথ। তাই গাছ মরে গেলে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

শ্রীপুরের তেলিহাটী ইউনিয়নের সাইটাইল গ্রামের চাষি মজিবুর রহমান বসতবাড়ির প্রবেশ পথেই এক বিঘা আয়তনের ক্ষেতে বিটি বেগুনের চারা লাগিয়েছেন। মজিবুরের বিটি বেগুনের পাতাও কুঁকড়ে মরে যাচ্ছে। মজিবুর রহমান বলেন, প্রথমে চারাগুলো তরতাজা হয়ে উঠেছিল, ফুলও ধরেছিল। এখন তো সমানে মরে যাচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে ছত্রাকনাশক বেবিস্টিন ও মাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে ভারটিমেক স্প্রে করছি। কিন্তু গাছ মরা বন্ধ হচ্ছে না। তেলিহাটী ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বলেন, দরিদ্র চাষিদের জমির পরিমাণ কম। একই জমিতে বারবার বেগুন চাষের ফলে জমির উর্বরতা কমে গেছে। ফলে নতুন জাতের বিটিবেগুন ক্ষেতে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেগুলো প্রতিরোধের জন্য চাষিদের ওষুধ দিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় বেগুন চাষিরা জানান, একজন বিটি বেগুন চাষিকে দুই কিস্তিতে ৮ হাজার টাকা দিয়ে রাজি করানো হয়েছে। কৃষকদের প্রথমে বিটি বেগুন সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। পরে গ্রামের চাষিরা বিটিবেগুন সম্পর্কে বিতর্কের কথা জেনেছেন। অন্যদিকে রংপুর সদর উপজেলার খটখটিয়া গ্রামের বিটিবেগুন চাষি শঙ্কর চন্দ্র রায় ফোনে জানান, বিটি বেগুনের চারা লাগানোর পর অধিকাংশ গাছই মরে গেছে। বেঁচে থাকা চারাগুলোতে প্রচুর জাব পোকা আক্রমণ করেছিল। পাতার নিচ থেকে পোকাগুলো রস চুষে খেয়ে ফেলছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) কর্মকর্তারা কীটনাশক দিয়েছিলেন। কীটনাশক মাঠে স্প্রে করার পর এখন কমেছে। একই অবস্থা ঈশ্বরদী ভরইমারি ও বক্তারপুর গ্রামের বিটি বেগুন ক্ষেতেরও। ঈশ্বরদী বিটি বেগুন ক্ষেত সরেজমিন ঘুরে এসেছেন বীজ বিস্তার ফাউন্ডেশনের সভাপতি কৃষিবিদ ড. এমএ সোবহান। তিনি জানান, ঈশ্বরদীতে বিটি ক্ষেত দুটিই রোগাক্রান্ত হয়েছে। ক্ষেত দুটিতে সাদা মাছি, লাল মাছি, জাব ও প্রচুর মাকড়ের আক্রমণ হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে মার্কিন বহুজাতিক বীজ কোম্পানি মনসান্তো ও ভারতীয় বীজ কোম্পানি মহারাষ্ট্র হাইব্রিড সিড কোম্পানি লিমিটেডের (মাহিকো) সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) দেশের জনপ্রিয় ৯টি বেগুন জাতের ব্যাকটেরিয়ায় বিটি জিন সংযুক্ত করে। ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর এনসিবি সীমিত পর্যায়ে চারটি বিটি বেগুনের জাত চাষের অনুমোদন দেয়। বিটি বেগুন মানব দেহে, পরিবেশ, কৃষি ও প্রাণ বৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অভিযোগ করে কৃষক ও পরিবেশবাদীরা ব্যাপক প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। ভারত ও ফিলিপাইনের আদালত দেশ দুটিতে বিটিবেগুন পরীক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

———————————————————————————————————————————————————————————————————–

Bt brinjal turns out to be ‘upset case’ for farmers

Faisal Rahman

United News of Bangladesh, March 21, 2015

The cultivation of genetically engineered Bt Brinjal in the country’s several districts has cost the farmers their fortunes again this year as the plants have either died out prematurely or fruited very insignificantly compared to the locally available varieties, reports United News of Bangladesh.

Spot visits to 12 Bt Brinjal fields in Manikganj, Narsingdi and Comilla over the last one month hardly found any living or properly fruiting plant on those fields.

BARI Bt Brinjal 2 (Bt-Nayantara) and BARI Bt Brinjal 3 (Bt-Kajla) were cultivated by four farmers at Pouli village in Manikganj Sadar under the supervision of Bangladesh Agricultural Research Institute (BARI). The fields belonging to Afzal Hossain and Md Mannaf have turned out to be an ultimate upset as each of the two fields appears half-barren as one looks at.

‘We’ve removed most of the plants after those had died about 15 days ago. The officers (BARI officials) told us to do so to prevent the spread of the disease. Despite that the rest of the plants are dying out in numbers every day,’ Mannaf’s wife Lovely Begum said.

Although only a few of the Bt Brinjal plants have died so far in two other fields cultivated by Boltu Miah and Abul Hossain, who are brothers, of the same village, the fruiting of the plants is nowhere near the satisfactory level, said Lal Chand, father of the two brothers.

The two Bt Brinjal varieties were also cultivated by three farmers at Dhanua village in Shibpur upazila of Narsingdi. All of them ended up miserably.

Md Abul Hayat, who is respected as a successful farmer in the locality, said, ‘Most of the saplings (of Bt Brinjal) have died. The plants are prone to diseases. The officials said it’s due to bacterial attack and prompted by irrigation and soil-type.’

‘If irrigation and soil-type had been a problem, why the local brinjal plants on my other field had not been affected?’ he questioned pointing to a brinjal field beside his Bt Brinjal one.

‘One can’t believe that just one month ago, the plants on my field (Bt Brinjal) were most good looking ones among all the brinjal fields in Shibpur. They (officials) came to my field and took photos and videos of the plants at that time,’ Hayat noted.

The sight of the Bt Brinjal field of Md Alamgir of neighbouring Baghab village in the upazila was more pathetic. ‘Many of the saplings had died at an earlier stage…one months into the planting. The officials replaced the dead plants with fresh ones but those have died too,’ he said.

Harun Mirza, Dilip Kumar Das and Mohammad Ali of Burichong upazila in Comilla planted BARI Bt Brinjal 1 (Bt-Uttara) and BARI Bt Brinjal 4 (Bt-ISD 006) on about 18-20 decimal plots. All the three claimed that around 150-200 of the 500-700 saplings that were provided to them died earlier within one month’s of the planting.

The fresh plants that replaced the dead plants also could not survive, while the most of the rest are also dying out, they added.

Mohammad Ali of Nimsar village in the upazila also showed several plants of BARI Bt Brinjal 4 variety that were affected by Brinjal Fruit and Shoot Borer (BFSB) insects. ‘We were told that these brinjal varieties are resistant to Phol of Doga Chidrokari Poka (BFSB), but the plants on my field have come under its attack,’ he said while showing an affected plant.

Meanwhile, farmers in Sherpur, Mymensingh, Rangpur, Dinajpur, Rajshahi, Pabna, Jessore, Gazipur and Tangail districts shared similar experiences with this UNB correspondent when they were contacted over phone.

At least 25-150 of the Bt Brinjal plants died on each of the Bt Brinjal fields in these districts. The dead plants also include some of BARI Bt Brinjal 5 variety that was cultivated in Dinajpur.

Md Haminur Rahman and Md Mobarak Hossain of Sherpur Sadar upazila said they have harvested 8-10 maunds of Bt Brinjal three months since the planting. It is less than half the amount that could by this timeframe be harvested from a local brinjal field of the same size, they noted.

Ramzan Ali of Jhikargachha upazila in Jessore said most of the Bt Brinjal plants in his field had died.

Asked about the dying of Bt Brinjal plants in the districts mentioned above, BARI director general Rafiqul Islam Mondol said, ‘We didn’t claim that the Bt Brinjal plants will not be affected by diseases. Our claim was that Bt Brinjal is resistant to BFSB.’

Asked about the BFSB infestation in at least one Bt Brinjal field in Comilla, he said, ‘I don’t have any such information. One or two non-Bt plants can be mistakenly grouped with the Bt plants in that field.’

———————————————————————————————————————————————————————————————–

পর পর দুই বছরই অধিকাংশ কৃষক বেগুন গাছ তিন-চার মাসের বেশি টিকিয়ে রাখতে পারেননি। কারো কারো ক্ষেতে দুই-তিনবার পর্যন্ত বিটি বেগুনের চারা দেওয়া হয়েছে। (সকালের খবর, ৭ এপ্রিল, ২০১৪; নিউ এজ, ৭ মে ২০১৪; ইউএনবি, ২১ মার্চ ২০১৫)

তাছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক রফিকুল ইসলাম ম-ল ২০১৫ সালে ২৮ জুলাই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল কনফারেন্স রুমে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন যে, গবেষণা ও কৃষক পর্যায়ে চাষ কোনো ক্ষেত্রেই বিটিবেগুন ১০০ ভাগ ডগা ও ফল ছিদ্রকারী বা মাজরা পোকা প্রতিরোধী নয় (ইউএনবি, ২৮ জুলাই ২০১৫)। সংবাদমাধ্যমেও বিটিবেগুন গাছে, ডগা ও ফল উভয় অংশেই, মাজরা পোকার সংক্রমণের খবর ছাপা হয়েছে (সকালের খবর, ৭ এপ্রিল, ২০১৪; নিউ এজ, ৭ মে ২০১৪; ইউএনবি, ২১ মার্চ ২০১৫)।

পরিবেশের ঝুঁকি

স্বপরাগী হলেও বেগুনের ক্ষেত্রে বেশ উল্লেখযোগ্য হারে পরপরাগায়ণ ঘটে, কখনো তা প্রায় ৪৮ ভাগ। পরাগায়নের মাধ্যমে প্রকৃতিতে বিটিবেগুনের বিকৃত জিন ছড়িয়ে পড়লে তা ভয়াবহ জিনগত বিশৃংখলা তৈরি করবে, যা সামাল দেওয়া অসম্ভব। বেগুন, আলু, টমেটো ইত্যাদি সোলানাসি পরিবারের উদ্ভিদ। সোলানাসি বিশেসজ্ঞ জন স্যামুয়েলস লিখিত ‘Genetically engineered Bt brinjal and the implications for plant biodiversity: revisited’ (April 2012, Novel Solanaceae Crop Project, UK) বিটিবেগুনের বইয়েও সে আশংকার উল্লেখ আছে।

বেগুন প্রায় চল্লিশ ধরনের পোকামাকড়, রোগবালাই দিয়ে আক্রান্ত হয়। বিটিবেগুন মাজরা পোকা ছাড়া অন্যান্য পোকামাকড়ের ওপর কি প্রভাব ফেলবে তার যথাযথ গবেষণা হয়নি। তাছাড়া বিটিবেগুন বিশেষ কোনো পোকামাকড় ও রোগ-জীবাণুর জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক পরিস্থিতি/পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারে।

বিটিবেগুনের সাথে পর-পরাগায়ন হয়ে অন্যান্য চাষের ও বুনো বেগুনের স্বভাব বদলে যেতে পারে। চাষের ও বুনো জাতের বেগুন উভয়েরই আরো বুনো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। পোকামাকড় বাহিত হয়ে বিটি বেগুনের পরাগরেণু কয়েক মাইলের মধ্যে থাকা দেশি বেগুনের ক্ষেতে চলে যেতে পারে ও পরপরাগায়ন ঘটাতে পারে বলে মত দিয়েছেন স্যামুয়েলস।

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির কীটতত্ত্ববীদ ডেভিড এ. অ্যন্ড্রু ও ভারতের ব্যাঙ্গালোরের ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সাইন্স এর প্রাক্তন উপাচার্য ড. জিকে ভিরেশকে সাথে নিয়ে ভারতে বিটিবেগুনের পরিবেশগত সমীক্ষা নিয়ে নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করেন (Bt Brinjal: The scope and adequacy of the GEAC environmental risk assessment’, 2010)। ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া সে রিপোর্টে হাইব্রিড বিটিবেগুন চাষের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাঁরা মত দিয়েছেন, বিটিবেগুন চাষে কৃষকের জন্য প্রতিশ্রুত লাভের দিকটা খুবই সামান্য এবং অনিশ্চিত।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি

এবিএসপি টু প্রকল্পের শুরু থেকেই ভারতে জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে বিটিবেগুনের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে নানা আশংকার কথা জানানো হয়। এসব মতামত আমলে নিয়ে ভারতের তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশ বিটিবেগুন চাষের ওপর দশ বছরের স্থগিতাদেশ দেন। প্রকল্পের পক্ষ থেকে বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাওয়া হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে থাকে। আদালতের নির্দেশে মাহিকো তার হাইব্রিড বিটিবেগুন খাওয়ানো ইঁদুর, খারগোশ ইত্যাদি প্রাণির ওপরে চালানো পরীক্ষাগুলোর কিছু তথ্যসংবলিত একটি রিপোর্ট জমা দেয়।

নিউজিল্যান্ডে কর্মরত পুষ্টি, খাদ্য, পরিবেশ ও রোগতত্ত্ববিদ ড. ল্যু এম গ্যালাহার মাহিকোর রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, বিটিবেগুন খাওয়ানোর ফলে পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রাণিগুলোর স্বাস্থ্যে যেসব সমস্যা (এলার্জিনিসিটি, যকৃত ও প্লিহার আকার বেড়ে যাওয়া, প্রজনন স্বাস্থ্যের সমস্যা ইত্যাদি) শনাক্ত হয়েছে তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে। ল্যাবরেটরি সাধারণ মান রক্ষা করেও ঝুঁকির সমীক্ষা করা হয়নি। (The Scope and Adequacy of the GEAC Toxicological Risk Assessment, November 2010)

এর আগে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে, অস্ট্রেলিয়ার ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ-এর কেমিস্ট ও রোগতত্ত্ববিদ জুডি কারমেন মাহিকের করা ল্যবরেটরি টেস্টের ওপর একটি পর্যালোচনা (অ ৎবারবি ড়ভ গধযুপড়’ং এগ ইৎরহলধষ ভড়ড়ফ ংধভবঃু ংঃঁফরবং) ভারতের আদালতে জমা দেন। সেখানেও উল্লেখ করা হয়েছে: মাহিকোর পরীক্ষাগুলোতে যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণের নিয়ম বা প্রটোকল মেনে চলা হয়নি।

জুডি কারমেন আরও উল্লেখ করেছেন, বিটিজিন ঢুকানোর ফলে বেগুনের ভিতরে বিটি প্রোটিন ছাড়াও আরো নতুন অনু উপাদান মাহক্রোনিউট্রিয়েন্ট তৈরি হবার সম্ভাবনা আছে, এবং সে বিষয়টি নিয়ে মাহিকো কোনো পরীক্ষা করেনি। বিটিজিন ঢুকানোর ফলে বেগুন গাছ যেসব নতুন অনু উপাদান তৈরি করবে, পরিবেশ ও প্রাণিস্বাস্থ্যের জন্য সেগুলোর ফলাফল নেতিবাচক হতে পারে।

জিন-পরিবর্তিত গাছের শিকড় বেয়ে নানান নতুন অণু-উপাদান উপাদান মাটিতে মিশে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়া কখনো কখনো মাটির ভৌত অবস্থা ও অনুজীবদের জন্য বিপর্যয় বয়ে নিয়ে আসতে পারে।

লেবেল ছাড়াই বাজারে বিটিবেগুন

খবর ৩

মন্ত্রণালয়ের শর্ত লঙ্ঘন: লেবেল ছাড়াই বাজারে বিটিবেগুন
নিজস্ব প্রতিবেদক, সকালের খবর, ৭ মে, ২০১৪

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জীব-নিরাপত্তা সংক্রান্ত ‘ন্যাশনাল কমিটি অন বায়োসেফটির (এনসিবি) বেধে দেয়া শর্ত লঙ্ঘন করে লেবেলিং ছাড়াই জিএমও বিটি বেগুন বাজারে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক ড. রফিকুল ইসলাম ম-লের পরিবারের জমিতে উৎপাদিত বিটি বেগুন পাশের খালাসপীর বাজারে লেবেলিং ছাড়াই বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া রংপুরের পীরগঞ্জের ৭নং বড় আলমপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুরিয়া গ্রামের একই জমি থেকে উৎপাদিত বিটি বেগুন লেবেল ছাড়াই বিক্রি করা হয়েছে স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছে। বাঁশপুকুরিয়া গ্রামবাসী ও খালাসপীর বাজারের ক্রেতারা জানিয়েছেন, বিটি বেগুন সম্পর্কে তারা জানে না। চলতি ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি সরকার ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাবনা, জামালপুর, রংপুর, গাজীপুর ও শেরপুর জেলার যে ২০ জন কৃষকের হাতে বিটি বেগুনের চারা তুলে দেয়। তার মধ্যে রংপুরের পীরগঞ্জের ৭নং বড় আলমপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুরিয়া গ্রামের বিটিবেগুন চাষী আফজাল হোসেন একজন। তিনি বারি মহাপরিচালকের পরিবারের মালিকানাধীন জমিতে বিটি বেগুন চাষ করেছেন। কৃষক আফজাল হোসেন ক্ষেতে উৎপাদিত ২০ কেজি বিটি বেগুন গত ২৫ এপ্রিল হাটের দিন স্থানীয় খালাসপীর বাজারে প্রতিমণ ৫২০ টাকা দরে বিক্রি করে দেন। এরপর গত শনিবার বাঁশপুকুরিয়া গ্রামবাসীদের কাছে ১৫ কেজি বেগুন বিক্রি করেন। আফজাল হোসেন জানান, খালাসপীর বাজারে অন্যান্য বেগুনের মতোই বিটি বেগুন বিক্রি হয়েছে। বারির পক্ষ থেকে বিটি বেগুন বিক্রি কীভাবে করতে হবে তা জানানো হয়েছে কিনা জানতে চাওয়া হলে আফজাল হোসেন জানান, চলতি মাসের ১ তারিখ বারির ডিজি (মহাপরিচালক) তার বেগুনক্ষেত দেখে গেছে। কিন্তু লেবেল সম্পর্কে সে কিছু বলেনি। বারির কর্মকর্তারাও তাকে কিছু জানায়নি। বিটি বেগুন চাষের জমির ব্যাপারে তিনি জানান, বিটি বেগুন চাষ করা জমির মালিক ডিজি’র ছোট ভাই সাজু। অথচ বিটি বেগুন লেবেলিং বজায় রেখে বিক্রির শর্ত বেধে দিয়েছিল এনসিবি। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে ৭টি শর্তে বিটি বেগুন সীমিত পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য অবমুক্তের অনুমোদন দেয় এনসিবি। ৬নং শর্তে বলা হয়, বায়োসেফটি রুলসের আওতায় বিটি বেগুন যাতে লেবেলিং বজায় রেখে বাজারজাত করা হয়, সে লক্ষ্যে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ সম্পর্কে বারি’র মহাপরিচালক ড. রফিকুল ইসলাম ম-ল সংবাদ মাধ্যমকে জানায়, বারি থেকে চাষীদের বিটি বেগুন বিক্রির সময় বস্তার গায়ে বিষমুক্ত বারি বিটি বেগুন লেখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু চাষীরা না লিখেই বিক্রি করছে। এদিকে খোলা বাজারে লেবেল ছাড়া বিটি বেগুন বিক্রিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় গ্রামবাসী ও বাজারের ক্রেতারা। তারা জানান, বিটি বেগুন সম্পর্কে তারা কিছু জানে না।

অন্যদিকে লেবেল ছাড়া বিটি বেগুন বিক্রির প্রতিবাদ জানিয়েছে পরিবেশবাদীরা। এনসিবি’র শর্ত ভঙ্গ করে লেবেল ছাড়া বিটি বেগুন বিক্রি করা দ-নীয় অপরাধ। সে সঙ্গে লেবেল ছাড়া বিক্রি করার ফলে বিটি বেগুন অন্য বেগুনের সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ অনুসারে ক্রেতাদের কোনো পণ্য কেনার আগে তা জানার অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। এই দুই আইনের লঙ্ঘন করে ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছে। ক্রেতা-ভোক্তার জানার অধিকার রয়েছে সে জিএমও বিটি বেগুন খাবে, নাকি ঝুঁকিমুক্ত দেশি বেগুন খাবে। ২০০৫ সালে মার্কিন বহুজাতিক বীজ কোম্পানি মনস্যান্টো ও ভারতীয় বীজ কোম্পানি মহারাষ্ট্র হাইব্রিড সিড কোম্পানি লিমিটেড (মাহিকো) সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) দেশের জনপ্রিয় ৯টি বেগুন জাতের ব্যাকটেরিয়ার বিটি জিন সংযুক্ত করে। ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর এনসিবি সীমিত পর্যায়ে চারটি বিটি বেগুনের জাত চাষের অনুমোদন দেয়। বিটি বেগুন মানবদেহ, পরিবেশ, কৃষি ও প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অভিযোগ করে কৃষক ও পরিবেশবাদীরা ব্যাপক প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

বিটিবেগুন ও আদিবাসী জনগণ

বিটিবেগুন কী জীবপ্রযুক্তি বিষয়ে দেশের আদিবাসী জনগণের অবস্থান ও প্রেক্ষাপট কী তা কেউ আমলে আনছে না। এও সেই একই উপনিবেশিক অধিপতি মনস্তত্ত্ব। পরিবেশ কি স্বাস্থ্যসুরক্ষা সব অধিপতি আর উচ্চবর্গের জন্য।

বিটিবেগুন বিতর্ক কোনোভাবেই কেবলমাত্র বাঙালির নয়, এটি আদিবাসী বাঙালি জনগণসহ রাষ্ট্রের সকল প্রাণসত্তার সুরক্ষার প্রশ্ন। বাঙালিরাই কেবলমাত্র বেগুনদরদি নন, দেশের আদিবাসী জনগণ সকলেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বেগুন আখ্যান।

দেশে বেগুনের আবাদি ও বুনো উভয় ধরনের জাতই আদিবাসী বেগুন-সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশে ৪৫ কি তারও কমবেশি আদিবাসী জনগণ এখনও পর্যন্ত জুম-জমিন-জঙ্গল আর জলপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে। বেগুন সকল আদিবাসী সমাজেই এক নৈমিত্তিক পরিচিত এবং ঐতিহাসিক সবজি। প্রতিটি আদিবাসী জাতিরই রয়েছে বেগুন বিষয়ক নিজস্ব চর্চা, কারিগরি ও দিনযাপনের রসায়ন।


মান্দি বারেং

১৯৫০ এর আগ পর্যন্ত মধুপুর শালবনে মান্দি জনগণ হাবাহুয়া (জুম আবাদ) করতেন। এক একটা জুমতালে (জুম জমিনে) নানান জাতের শস্যফসলের বীজের সাথে বুনে দেয়া হতো ‘মান্দিবারেং’ বীজদানা। মানে এক ধরনের জুমবেগুন। মান্দি বারেং এর সাথে নাখাম (প্রক্রিয়াজাতকৃত পুঁটি শুটকি) দিয়ে তৈরি করা হয় ঐতিহ্যবাহী মান্দি খাবার নাখাম-বারেং জাবা, নাখাম-বারেং খারি ও গপ্পা। মান্দি নারীরা শুকনো রাও (এক ধরণের লাউয়ের খোল) এর ভেতর মান্দি বারেং বীজদানা শুকিয়ে পরের বছরের জন্য জমিয়ে রাখতেন। কিন্তু এখন আর মধুপুরে বেগুনের এ জাতটি নেই। রাষ্ট্র এ বেগুনজাতকে হত্যা করেছে, গুম করেছে। আর আমাদের একেবারে চোখের সামনে থেকেই লাশ সরিয়ে ফেলেছে। রাষ্ট্রের এ হত্যাকা-ের নাম দেয়া হয়েছে ‘বনভূমি ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ’। কারণ ১৯৫০ সনে রাষ্ট্র জোর-জবরদস্তি করে মধুপুর শালবনে জুম-আবাদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ‘বনভূমি সংরক্ষণের’ জন্য।


বেরুলগুলু

মধুপুর শালবনের মতোই পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসী জুমে আবাদ হতো এক ধরনের রোমশ বেগুন। স্বাদে টক গোলাকৃতির এই বেগুনের চাকমা নাম বেরুলগুলু। অনেক বলেন হাতিবেগুন। ফলের গায়ে রোমশ আবরণ, যা হাতে গেঁথে যায়। রান্নার আগে ফল থেকে সাবধানে শুঙশুঙিগুলো রোম) ছাড়াতে হয়। নাপ্পি (প্রক্রিয়াজাতকৃত এক ধরনের শুঁটকি) আর বেরুলগুলো দিয়ে জনপ্রিয় চাকমা খাবার গদাইয়া বেশ ভাল জমে। এখন আর পাহাড়ে জুম আবাদে টকস্বাদের এই বেগুনটি তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। সেনানিবাস সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিক পর্যটন, আগ্রাসী প্রজাতির বাগান, রাবার ও তামাক চাষ, সেটেলার অভিবাসন, ঝুম নিয়ন্ত্রণ বনবিভাগ এসব নানাকারণে জুমের অঞ্চল কমে যাওয়ায় জুমে এখন আর বৈচিত্র্যময় ফসলের চাষই কমে গেছে।

 

আদিবাসীর জীবনিরাপত্তা

জীবপ্রযুক্তি গবেষণার জন্য অবশ্যই একটি জীবনিরাপত্তা নীতিমালা থাকতে হবে, যা এখনও বাংলাদেশে চূড়ান্ত করা হয়নি। জাতীয় খাদ্য নীতির ১.১.৪ নং অনুচ্ছেদের ৪ নং উপধারায় জেনেটিক ফসল ও খাদ্যকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) খাদ্যসমূহের স্বাস্থ্যগত প্রভাব ও ঝুঁকিকে নিরূপণ করা জরুরি। আদিবাসী জনগণের কোনো পূর্ব সম্মতি, আলোচনা ও অংশগ্রহণ ছাড়াই ২০০৫ সনে বাংলাদেশ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ‘জীবনিরাপত্তা নির্দেশিকা ২০০৫’ চূড়ান্ত করে। দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও নির্দেশিকাটি ইংরেজিতে লেখা হয়েছে এবং খুবই অগোছালোভাবে এবং খুবই সংকীর্ণ অর্থে উক্ত নির্দেশিকাকে ‘জীবনিরাপত্তাকে’ ব্যাখা করা হয়েছে। ‘আদিবাসী সংস্কৃতি’ বলতে যারা ‘মদ খেয়ে ঢুলু ঢুলু ঝুমুর নাচ আর শিকার নৃত্য বোঝেন’ এটিও সেই একইরকম কায়দায় জনগণের ‘জীবনিরাপত্তাকে’ কেবলমাত্র ‘পরিবেশ প্রশ্ন’ দিয়ে উপস্থাপন করেছে।

জীবনিরাপত্তা নির্দেশিকাতে ‘জীবনিরাপত্তার’ ধারণাটি একেবারেই অস্পষ্ট, বিমূর্ত এবং এটি কোনোভাবেই বাংলাদেশের জীবনিরাপত্তার এতিহাসিকতাকে প্রকাশ করে না। উক্ত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রাণপ্রযুক্তির কারিগরি ও কর্মকা-কে পরিবেশগতভাবে নিরাপদ করতে যেসকল নীতি ও পদ্ধতি গৃহীত হয় তাই জীবনিরাপত্তা। প্রাণবৈচিত্র্য সনদের জীবনিরাপত্তা বিষয়ক কার্টেজেনা প্রটোকল হচ্ছে জীবনিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি যা আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদের (সিবিডি ১৯৯২) সংযুক্ত অংশ। এ চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে আধুনিক প্রাণপ্রযুক্তির ‘জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম’-এর ঝুঁকি থেকে প্রাণবৈচিত্র্যকে সুরক্ষা করা। আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদও (সিবিডি ১৯৯২) সুস্পষ্টভাবে জিনপ্রযুক্তিতে রূপান্তরিত অণুজীব ও কারিগরি ব্যবহার ও হস্তান্তর বিষয়ে ব্যাখা করেছে। বাংলাদেশ উল্লিখিত উভয় সনদ ও চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ সুস্পষ্টভাবে দেশের আদিবাসী জনগণের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করেছে। আদিবাসী জনগণের কোনোধরণের পূর্বসম্মতি ও অংশগ্রহণ ছাড়াই এই বিটিবেগুনসহ প্রাণপ্রযুক্তি প্রর্বতনে আদিবাসী সাংস্কৃতিক বহমানতা ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ বননির্ভর আদিবাসী জনগণের প্রথাগত অধিকার স্বীকার করেছে, বিটিবেগুন প্রবর্তনের ভেতর দিয়ে আদিবাসী জনগণের এই প্রথাগত বননির্ভরতা দুমড়ে-মুচড়ে যেতে বাধ্য। কারণ বিটি বেগুনের অনিয়ন্ত্রিত জীন প্রাকৃতিক প্রতিবেশে ছড়িয়ে পড়ে বাস্তুসংস্থানে বিশৃংখলা তৈরি করবে এবং যা সর্বোপরি আদিবাসী জনগণের জীবনপ্রবাহে কাপ্তাই বাঁধ, কয়লাখনি, ইকোপার্ক, সামাজিক বনায়ন, সেনানিবাস সম্প্রসারণ কি বাঙালি অভিবাসনের মতো আরেক উন্নয়ন আঘাত তৈরি করবে।

প্রতি বছর ৯ আগস্ট আদিবাসী দিবসের একটি প্রতিপাদ্য চূড়ান্ত করে জাতিসংঘ। এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো, আদিবাসী জাতিসমূহের অধিকার সংক্রান্ত সকল চুক্তি ও অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন। কিন্তু নিদারুণভাবে রাষ্ট্র আদিবাসী জনগণের প্রতি সে সম্মান ও স্বীকৃতি প্রকাশ করছে না। দেশের আদিবাসী জনগণের পূর্ব সম্মতি ও অংশগ্রহণ ছাড়া কোনোভাবেই সরকার বিটিবেগুন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আদিবাসী জনগণের ঐতিহাসিক বেগুন-সংস্কৃতি বিপন্ন হওয়ার আংশকা আছে বিটি বেগুনের মতো এমন কাজ থেকে রাষ্ট্রকে বিরত থাকার আহবান জানাই। দেশের আদিবাসী জনগণের অবিস্মরণীয় বেগুন-আখ্যান আর বেগুন জাত সুরক্ষার ভেতর দিয়েই রাষ্ট্রকে আদিবাসী বেগুন সংস্কৃতির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।


বেগুন গবেষণার আদি দলিল

বাংলাদেশে কৃষক ও জুমিয়াদের অবিরত গবেষণার পাশাপাশি চৈতন্য নার্সরিতেই প্রথম বেগুন নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার নজির পাওয়া যায়। ১৮৮৪ সনেই চৈতন্য নার্সারি বেগুন গবেষণা শুরু করে। জামালপুর-শেরপুর-ময়মনসিংহসহ আশপাশের সকল দেশীয়, স্থানীয় বেগুনজাত সংগ্রহ করে চলে বেগুনভিত্তিক গবেষণা।

বেগুন গবেষণার ফলাফল নিয়ে চৈতন্য নার্সারির রূপকার ঈশ্বরচন্দ্র গুহ ‘বেগুনের চাষ’, ‘লেন্ড্রেথের বেগুন’ ও ‘জামালপুরের বেগুন চাষ’ নামে বেশকিছু গবেষণাধর্মী প্রবন্ধও লিখেছেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কৃষিবিষয়ক সাময়িকী ‘কৃষিসম্পদে’ সেসব প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩২১ সনের দিকে, প্রায় ১০০ বছর আগে। বাংলাদেশের বেগুন নিয়ে কোনো গবেষণা কাজের এর চাইতে প্রাচীন নজির ও দলিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

যদিও তারও অনেক আগে থেকেই মহামতি খনার কিছু বেগুন-বচন কৃষিসমাজে প্রচলিত। ‘বলে গেছে বরাহের পো, দশটি মাসই বেগুন রো, ধরলে পোকা দিবি ছাই, এরচে’ ভাল উপায় নাই’। মৈমনসিংহ গীতিকার মহুয়া পালায় হুমরা বাইদ্যা ও মাইনকিয়া নদ্যাপুরে খেলা দেখাতে গিয়ে ‘নয়াবাড়ী লইয়ারে বাইদ্যা লাগাইল বাইঙ্গন..’ গানটি করে। কবিকঙ্কন বিরচিত চ-িমঙ্গলে অনেক দেশিয় রান্নার পাশাপাশি ‘বাগনের খারা’ নামে একটি বিশেষ ব্যঞ্জনের বিবরণ আছে। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে কবি শেখ আমির উদ্দিন রচিত ‘মানিকতারা ডাকাইতের পালায়’ আছে, গামছা বাইন্ধা চাউল ডাইল আর গোটা ব্যাল, বাগুন মরিচ ফল ফলান্তি আরপুটেক ত্যাল। বেগুন নিয়ে এত আদি মৌখিক ও মুদ্রিত নথি ও দলিল আর কোনো দেশে আছে কী না সন্দেহ!

 

বাংলাদেশ বেগুনের জন্মভূমি

ঈশ্বরচন্দ্র গুহ কুরুয়া বেগুন, জামালপুরী গোল বেগুন, সবজে বেগুন, সিংগে বা সিংহনাদ বেগুন, লম্বা বেগুন, ফুলি বেগুন, মাকড়া বেগুন, মুক্তকেশী, গৌরীকাজল ও রামঝুমকী বেগুনের বিবরণ দিয়েছেন। চৈতন্য নার্সারির উল্লিখিত আদি তালিকাটির অনেক বেগুনই আজ নিরুদ্দেশ। দেশে এখনও টিকে আছে শিংনাথ, খটখটিয়া, লম্বা, মোটা, তবলা, গোল, কালা, লতা, পুতা, সাদা, লাল, ঝুমকি, ডিম, তিতা, বারোমাইস্যা, কামরাঙ্গা, তাল, টুপরি, কুলি, টোপা, আউশা, হিংলা, ঘিকাঞ্চন, আমঝুপি, কাঁটা নানান নামের নানান স্বাদের বেগুন। আদিবাসী অঞ্চলে আছে বারেং মেকব্রেও, কামরাঙ্গা বারেং, খুমকা, বারেং দচি, বারেং মিগন এরকম কতজাতের জুমবেগুন। টকস্বাদের একটি বেগুনের চাকমা নাম বেরুলগুলো, তিতাস্বাদের একটি বেগুনকে কোচভাষায় বলে টরা-খাংখা।

বাংলাদেশ বেগুনের আদি জন্মভূমি। উদ্ভিদ-বিজ্ঞানের ভাষায় বলে, প্রজাতির উৎপত্তিস্থল। উদ্ভিদ-বিজ্ঞানী ডি ক্যান্ডোল ১৮৮৬ সালে চাষকৃত ফসলি উদ্ভিদের উৎপত্তিস্থল নিয়ে লিখেন ‘অরিজিন অব কাল্টিভেটেড প্লান্ট’। উক্ত বইতে ক্যান্ডোল বেগুনকে (ঝড়ষধহঁস সবষড়হমবহধ খ.) এশিয় অঞ্চলের স্থানীয় উদ্ভিদ হিসেবে চিহ্নিত করেন। রুশ বিজ্ঞানী এন আই ভ্যালিভব ১৯২৮ সালে বেগুনকে ‘ইন্দো-বার্মা’ অঞ্চলের ফসল হিসেবে বর্ণনা করেন।

 

গবেষণার নামে প্রাণ-উপনিবেশিকরণ

পৃথিবীতে কৃষি ও জুমনির্ভর গ্রামীণ নিম্নবর্গই সম্ভবত সর্বাধিক গবেষিত জনগোষ্ঠী। চলতি সময়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ‘বায়োপ্রসপেক্টিং’ এবং জিনপ্রযুক্তি গবেষণার নামে গ্রামীণ নিম্নবর্গের হাজার বছরের প্রাণসম্পদ ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানও ছিনতাই ও ডাকাতি হচ্ছে।

জাতিরাষ্ট্রগুলো নানান উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিকে এ সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। একসময় অর্থকড়ি, জমিজমা, ধনদৌলত এর মতো দৃশ্যমান বস্তুগত বিষয়াদি ছিল লুটতরাজের নিশানা। কলম্বাসের সময় অন্যায়ভাবে দেশ দখল ছিল উপনিবেশিক লুটতরাজের প্রধান ক্ষেত্র। আজ সেই উপনিবেশিক লুটতরাজের নিশানা পাল্টেছে।

এখন লুট হচ্ছে প্রাণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি মৌলকণা ‘জিন’। জিন মানে হলো বংশগতির ধারক ও বাহক। মানে বেগুন কি মানুষ আমাদের শরীরে সহস্র কোটি কোষ আছে। কোষে আছে জিন। আর এই জিন এর ভিন্ন ভিন্ন বিন্যাসই খুমিদের চেহারার সাথে সাঁওতালদের চেহারার ভিন্নতা তৈরি করেছে। এই জিনবিন্যাসের ভিন্নতাই কোনো বেগুন লম্বা কোনো বেগুন গোল। গরিব দেশের প্রাণসম্পদ ও লোকায়ত জ্ঞানের ওপর চলতি সময়ের এ বহুজাতিক উপনিবেশিক দস্যুতার নামই ‘প্রাণ-উপনিবেশিকরণ’।

মনস্যান্টো, সিনজেনটা, ডুপন্ট, বায়ার ক্রপ সায়েন্স, কারগিল, ফাইজার, কোক-পেপসির মতো বহুজাতিক কোম্পানিরাই এ অন্যায় ‘প্রাণ-উপনিবেশিকরণকে’ তরতাজা রাখছে। সারা দুনিয়ার গরিব নিম্নবর্গের প্রাণসম্পদ ও লোকায়ত বিজ্ঞান নানান প্রকল্প ও গবেষণার নামে একতরফা ডাকাতি ও নিয়ন্ত্রন করছে। দুনিয়ার সামগ্রিক বীজ বাজারের ৬৪ শতাংশ আজ দখল করে রেখেছে দশটি বহুজাতিক কোম্পানি। একা মনস্যান্টোই নিয়ন্ত্রণ করে এর এক পঞ্চমাংশ।

২০০৫ থেকে ২০১৪ সনে সম্পাদিত ‘বিটিবেগুন প্রকল্পের’ নামে মনস্যান্টো বাংলাদেশের নয়টি বেগুন জাত ছিনতাই করেছে। বেগুনের জিনসম্পদের এতবড় বহুজাতিক ডাকাতি এই প্রথম। এসব বহুজাতিক কোম্পানি আইনি খবরদারির মাধ্যমে ছিনতাই করা প্রাণসস্পদের ওপর নিজেদের একতরফা নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানার জন্য এসব পেটেন্ট করে ফেলে। যাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পেটেন্টকৃত প্রাণসম্পদের ওপর ঐ কোম্পানির একতরফা কর্তৃত্ব ও মাালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯৫ সনে আমেরিকার মিসিসিপি মেডিক্যাল সেন্টার ইউনিভার্সিটি যখন একতরফাভাবে হলুদ পেটেন্ট করে তখন এই জিন-দস্যুতার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিরোধ জোরদার হয়। ২০০০ সনে আমেরিকার ডাব্লিউ আর গ্রেস কোম্পানি নিম গাছের পেটেন্ট দাবি করে, ১৯৯৭ সনে আমেরিকার রাইসটেক ইনকরপোরেশন বাঁশমতি ধানের ওপর পেটেন্ট অধিকার চায়।

শামান ফার্মাসিউটিক্যালস এবং বডিশপ আমাজন বর্ষারণ্যের আদিবাসীদের সাথে কাজ করে তাদের ঐতিহ্যগত উদ্ভিদ ব্যবহার থেকে কিছু ব্যবহারকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিক্রি করা শুরু করে। ভারতের দ্য আরায়া বৈদ্য ফার্মেসি কানি আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত উদ্ভিদ আরোগ্যপাচ্চাকে পেটেন্ট করে।

সাম্প্রতিক প্রাণ-উপনিবেশিকরণ ঘটেছে গ্রামবাংলার বেগুনকে ঘিরে। ‘বিটিবেগুন গবেষণা প্রকল্পের’ ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরা, কাজলা, নয়নতারা, শিংনাথ, দোহাজারী, চ্যাগা, খটখটিয়া, ইসলামপুরী এবং ঈশ্বরদী লোকাল এ নয়টি বেগুন জাতের ওপর মনস্যান্টোর বহুজাতিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

হাজার বছরের নাম ও স্বভাব পাল্টে ফেলা হয়েছে

বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত শস্য ফসলের জাতসমূহের একটি প্রাণসম্পদ তালিকা তৈরি হয় ১৯৯৬ সনে। ‘জবঢ়ড়ৎঃ ড়হ ঢ়ষধহঃ মবহবঃরপ ৎবংড়ঁৎপবং ১৯৯৬’ নামের সেই তালিকাটিকে মূল তালিকা ধরে ২০০৬ সন পর্যন্ত তালিকাটিকে আপডেট করা হয়। উক্ত প্রতিবেদনে বিএআরআই এর কাছে বেগুনের (ঝড়ষধহঁস সবষড়হমবহধ) মোট ২৪৮টি একসেশন সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মনস্যান্টোর ডাকাতি করা নয়টি বেগুন জাতের ভেতর কেবলমাত্র নয়নতারা জাতটির উৎপত্তিস্থল ভারত, ১৯৯৮ সনে বিএআরআই একে দেশে চাষের অনুমোদন দেয়। নয়টি দেশি বেগুন জাতে বিটি জিন ঢুকিয়ে বিটিবেগুন প্রকল্প শুরু হয় ২০০৫ সনে। জাতীয় বীজ বোর্ড ২০১৩ সনের ৩০ অক্টোবর উত্তরা (বারি-১), কাজলা (বারি-৪), নয়নতারা (বারি-৫) এবং বারি-৬ কে যথাক্রমে বিটিবেগুন-১, ২ , ৩, ৪ নামে ছাড় দেয়।

শুধুমাত্র একটি জিনের বদলের কারণে বেগুনগুলির ঐতিহ্যগত নাম-পরিচয় ও স্বভাবকে সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলা হয়েছে। বেগুনের সাথে জনগণ ও প্রতিবেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও বিজ্ঞানকে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

বিটিবেগুনকে ‘না’, দেশি বেগুনকে ‘হ্যাঁ’

স্বাস্থ্য, পরিবেশ, বাণিজ্যপ্রশ্ন, মেধাস্বত্ত্ব, প্রতিবেশ, সংস্কৃতি প্রশ্নে বিটিবেগুনসহ জিএম খাদ্য-ফসল ঘিরে এ বিতর্ক আজ বৈশ্বিক। রাষ্ট্রকে অবশ্যই বিটিবেগুন প্রশ্নে দেশি বেগুন ঘিরে দেশের প্রাণসম্পদ ও জনগণের ঐতিহাসিকতার বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিটিবেগুন প্রকল্প এবং চুক্তিটি আবারো যাচাই করা জরুরি। কোনোভাবেই যেন আমাদের কোনো বেগুনের জাত হাতছাড়া না হয় রাষ্ট্রকেই সামাল দিতে হবে।

বিটিবেগুন নয়, দেশিবেগুনের জাত ও দেশীয় কৃষিজ চর্চাকে গুরুত্ব দিয়ে বেগুনের জাত ও উৎপাদনের বিকাশ ঘটানো সক্ষম। পাশাপাশি বেগুনে বহুজাতিক কোম্পানির অবাধ অন্যায় বিষ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেবল বেগুন কেন, সকল শস্য ফসলকেই আজ বহুজাতিক কৃষিবিষের অন্যায় বাণিজ্য থেকে মুক্ত করা জরুরি। বাংলাদেশে প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিগত বেগুন গবেষক ঈশ্বরচন্দ্র গুহ বেগুন গবেষণার ফলাফল ১৩২১ বাংলায় মন্তব্য করেন, বিদেশি বীজের প্রতি আস্থাবান না হয়ে যতœসহ এ দেশিয় উন্নতমানের বেগুনের চাষ করলে নিশ্চয়ই আমাদের পূর্ব সুনাম বজায় থাকবে ও কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের জন্য অধিক মূল্য পাবে। আসুন দেশি বেগুন ও দেশের জনগণের ওপর পূর্ণ আস্থার সীমানা বিস্তৃত করি।

 

এবিএসপি-টু এর অন্তরালে

১৯৯১ সালে এগ্রিকালচারাল বায়োটেকনোলজি ফর সাসটেইনেবল প্রোডাক্টিভিটি নামে একটি প্রকল্প চালু করে ইউএসএআইডি, যার নাম পরে পরিবর্তন করে রাখা হয় দ্য এগ্রিকালচারাল বায়োটেকনোলজি সাপোর্ট প্রোজেক্ট বা এবিএসপি। বিভিন্ন প্রাইভেট ও পাবলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ সহযোগিতায় প্রকল্পটি পরিচালনা করে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি। যার মূল লক্ষ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জিএম প্রকল্পসহ মার্কিন জীবনিরাপত্তা মডেল ও মেধাসত্ব আইনের প্রসার। এটা ছিল বহির্বিশ্বে মার্কিন কৃষি নীতির পরিবর্তনের সূচক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন নীতি ছিলÑউদ্বৃত্ত কৃষি পণ্যের জন্য বাজার উন্মোচন। কিন্তু বিশ্বায়নের জোয়ারে এই নীতি বদলায়। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিজেদের পণ্য বেচতে এখন মরিয়া মার্কিন করপোরেশনগুলো। আর তাদের মূল লক্ষ্য সর্বোচ্চ মুনাফা। তাদের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর যুক্তরাষ্ট্র সরকার। বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থায় একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে চায় তারা। আর এ প্রক্রিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে জিএম শস্য। বীজের মালিকানার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায়ও এটা ব্যবহার করা হচ্ছে।

জিএম শস্য নিয়ে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় শুরুর দিকের প্রকল্প এবিএসপি। এক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র। করপোরেট বান্ধব জিএম নীতি গ্রহণ করতে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপও বাড়ানো হতে থাকে। কৃষকের মাঠ থেকে ভোক্তার উদর পর্যন্ত জিএম শস্য পৌঁছে দিতে হাত করা হয় এসব দেশের ক্ষমতাসীনদের। বড়সড় তহবিল বরাদ্দ করা হয়। ব্যবহার করা হয় স্থানীয় বিজ্ঞানীদের। জিএম শস্য চালু করার পক্ষে সাফাই গেয়ে পরোক্ষভাবে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজটা মূলত তারাই করেন।

প্রথম দফায় ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ১২ বছর ধরে চলে এবিএসপি-১। এতে ইউএসএআইডির খরচ হয় ১.৩ কোটি ডলার। তবে এই ধাপের খুব কম প্রকল্পেই বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় জিএম শস্য উৎপাদিত হয়।

দ্বিতীয় ধাপ এবিএসপি-টু শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। এ ধাপে বিটি আলু ও ভাইরাস প্রতিরোধী লাউ বাদে বাকি সব প্রকল্প বাতিল করা হয়। গুরুত্ব দেয়া হয় উৎপাদিত পণ্যের গুনগত মান বাড়ানোর ওপর। তবে প্রাইভেট সেক্টরের সহযোগিদের আগ্রহের অভাবে শেষ দুই প্রকল্পও বাতিল করা হয়। মেধাস্বত্ব ও অন্যান্য নিয়মকানুনের বিষয়গুলো অমীমাংসিতই থেকে যায়।

দুই ধাপে এবিএসপি প্রকল্পের প্রযুক্তিগত অর্জন খুব সামান্য। তবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সাথে কিভাবে হাত মিলিয়ে চলতে হবে এই সময়ের মধ্যে এসব দেশের বিজ্ঞানীরা তা ভালোই আয়ত্ব করে নেয়। মার্কিন করপোরেশনগুলোর পেটেন্ট করা জিএম ভ্যারাইটি বাজারে আনার পথ সুগম হয়। কৃষকের ক্ষেত পর্যন্ত জিএম শস্য পৌছাতে না পারলেও, জীবনিরাপত্তা ও মেধাস্বত্ব উভয়ের ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে এ প্রকল্প যথেষ্ট প্রভাবক হয়ে ওঠে।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারলেও, কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে ইউএসএআইডি। জিএম শস্যের বিষয়ে সাধারণ মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়ে ওঠে। যে দেশগুলোতে এসব প্রকল্পের লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয় তাদের অনেকে বেঁকে বসে।

২০০০ সাল পর্যন্ত মাত্র চারটি দেশ জিএম শস্য উৎপাদন করতে থাকে। বিশ্বের ৭০ ভাগ জিএম শস্যই উৎপাদিত হচ্ছিলো যুক্তরাষ্ট্রে। ইউরোপে তখন বিষয়টা কার্যত স্থগিত। বিপদ বুঝে ইউএসএআইডি বিনিয়োগ পাওয়া কয়েকটি দেশও আগের চেয়ে সাবধানী অবস্থান নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি আরো প্রতিকূল হয় বায়োসেফটি প্রটোকল বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমঝোতার কারণে। পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতীয় জীবনিরাপত্তা নীতি গ্রহণে দেশগুলোকে সবুজ সংকেত দেয় এ চুক্তি।

তবে এই প্রটোকলের প্রয়োগ কিভাবে হবে তা সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। অন্যান্য চুক্তির সাথে অস্পষ্ট সম্পর্কের কারণেও এর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিষয়ে এটা কোন ধরনের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থ সহায়তার রাজনীতি শুরু করে। বেঁকেবসা দেশগুলোর ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়। বদলায় তাদের পরিকল্পনাও। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্প থেকে ‘নিয়ার-মার্কেট’ জিএম প্রকল্পের দিকে সরে আসে তারা। ২০০২ সালে চালু করে কোলাবরেটিভ বায়োটেকনোলজি ইনিশিয়েটিভ বা সিএবিআইও নামে নতুন প্রকল্প।

এর আগের এবিএসপি প্রকল্পকে দুই ভাগে ভাগ করে সিএবিআইও: এবিএসপি টু ও বিএসপি বা প্রোগ্রাম ফর বায়োসেফটি সিস্টেম। প্রথমটার কাজ গবেষণা। তবে তা আগের চেয়ে অনেক সুনির্দিষ্ট প্রোডাক্ট কমার্শিয়ালাইজেশন প্যাকেজ। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের আগেই হাত গুটিয়ে নেয়ার ঝুঁকি নিতে আর রাজি নয় তারা। অন্যদিকে পিবিএসের কাজ ঠিক করা হয় পলিসি লেভেলে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, নির্দিষ্ট দেশের বাজারে জিএম ফসল নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় দেন দরবার পরিচালনা। যেমনÑপাবলিক রিলেশন, জিএম শস্য অনুমোদন প্রক্রিয়াসম্পন্ন করা ইত্যাদি। নানা মূল্যায়নের পর অল্প কয়েকটি দেশে এ প্রকল্প কার্যকর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে ইউএসএআইডি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফিলিপাইন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও ভারত, পূর্ব আফ্রিকায় উগান্ডা ও কেনিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকায় মালি ও নাইজেরিয়া।

এবিএসপি-টু এর প্রধান কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি। একটা করপোরেট অংশীদারের মতো পরিচালনা করতে প্রকল্পটিকে এর সাথে সমন্বয় করা হয়েছে। তাদের কাজ হলো নির্দিষ্ট দেশে গিয়ে প্রথমেই বাজারজাত করার জন্য একটা জিএম শস্য খুঁজে বের করা।

এরপর গঠন করা হয় বিজ্ঞানীদের একটি দল। কাজ শুরু হয় মেধাস্বত্ব ও অন্যান্য নীতি নির্ধারনী বিষয়গুলো। আর এই সময়ের মধ্যে পাবলিক রিলেশনের জন্য গণমাধ্যমগুলোতে প্রচুর অর্থ ঢালা হয়। কিন্তু মনস্যান্টো বা সিনজেন্টার মত, এবিএসপির মূল লক্ষ্য মুনাফা নয়। এটাই তার সবচেয়ে কার্যকর মুখোশ। গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য জিএম ফসল নিয়ে কাজ করার দাবি করে তারা। অথচ তলে তলে মার্কিন করপোরেট অংশীদারদের জন্য বাজার তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য।

২০০৭ সালে এশিয়ার বাজারে বিটিবেগুন আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবিএসপি-টু। তাদের সাথে কাজ করছে মনস্যান্টোর ভারতীয় অংশীদার মাহিকো, যারা এরই মধ্যে ভারতে মাঠ পর্যায়ে বিটি বেগুনের পরীক্ষা চালিয়েছে। ফিলিপাইনের ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ের বিজ্ঞানীদের সাথেও কাজ করছে তারা। নিকট ভবিষ্যতে মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষার জন্য জিএম আলু ও ভাইরাস প্রতিরোধী জিএম পেঁপে বেছে নেয়া হয়েছে, যা এরই মধ্যে থাইল্যান্ডে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে ভাইরাস প্রতিরোধী টমেটোও তাদের পরিকল্পনায় আছে।

 

সরকারি প্রতিষ্ঠান/বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা

বহুজাতিকের স্বার্থে পরিচালিত জিন-পরিবর্তিত ফসলের প্রকল্পের অংশীদার হয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারগুলো হয়তো তাদের গবেষণা চালানোর জন্য কিছু তহবিল বা প্রশিক্ষণ পায়, কিন্তু চাষিদের বিশেষ কিছু করবার থাকে না। তারা কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, তাদের বীজ-ফসল কিভাবে বহুজাতিকের মালিকানায় চলে যাচ্ছে আর তারা স্বত্বাধিকার আইনের ফাঁদে পড়ে কিভাবে কোম্পানির বীজের ভোক্তায় পরিণত হচ্ছে। অথচ এসব চাষিদের সঙ্গে নিয়ে গবেষণা-পরীক্ষা চালানোর কথা সরকার কখনোই ভাবে না।

ভারতে বিটি বেগুনের চাষ প্রসারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং উত্তর-দক্ষিণ সহায়তা প্রচেষ্টার কৌশল খাটানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে চলা এগ্রিকালচারাল বায়োটেকনোলজি সাপোর্ট প্রজেক্ট-টু এর ভারত অংশে অংশীদার ছিল মনসানটোর ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মাহিকো, তামিলনাডুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ), ধারবাদের কৃষিবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেনারসির ভারতীয় শাক-সবজি গবেষণা ইনস্টিটিউট। এসবের মধ্যে ভারতে বিটি জিন ব্যবহারের লাইসেন্স আছে মনস্যান্টোর। আর মাহিকোর ছিল বিদেশি সংস্থার সাথে চুক্তি, যার অধীনে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে বিটি বেগুনের পরীক্ষামূলক চাষ হয়।

তামিলনাডুর দেয়া বীজে জিনের পরিবর্তন করে মাহিকো/মনস্যান্টো সেসবের মালিক বা স্বত্বাধিকারী বনে যায়। তারা এসব বীজ বাজারে ছাড়ে। অথচ তাতে কৃষকের কোনো অধিকার থাকে না।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ধরনটি এমন হয়, যাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর যা চায়, তাই হয়। যেমনÑ২০০৫ সালের মার্চে তামিলনাডু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মাহিকোর যে ম্যাটেরিয়াল এক্সচেঞ্জ এগ্রিমেন্ট (এমটিএ) স্বাক্ষরিত হয়, তা অনুযায়ী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কোম্পানিকে যেমনÑইচ্ছে তেমন করে ব্যবহারের জন্য দেশি বীজ সরবরাহ করবে বিনিময়ে মনস্যান্টো বা মাহিকো দেবে পরিবর্তিত জিনের (ট্রান্সজিন) বীজ। তামিলনাডু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আবার চাইলেই সেসব বীজে পরিবর্তন আনতে পারবে না। কেবল চাষ করে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।

এছাড়া সরকারি খাতের গবেষণার প্রকৃতি বদলে দেওয়ার জন্যও কাজ করছে জিএম ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। ভারতে আইন করে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে গবেষকেরা বিভিন্ন জিএম ফসলের বীজ বানিয়ে তা সহজেই নিজের স্বত্ব হিসেবে পাশ করিয়ে নিতে পারেন। অথচ তারা গবেষণা করছেন দেশের অর্থে। কার্যত দেশের মানুষকে সেবা দেয়াই যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য, তা খুব দ্রুত বিলীন হতে চলেছে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা ক্রমে ঢুকে পড়ছেন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পকেটে।

 

সরকার ও জনতার বিভেদ

এশিয়া জুড়ে জিএম শস্য প্রসারে সরকারি উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে এবং কিছু গুরুতর প্রশ্নকে উসকে দিয়েছে। যদি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো জিএম প্রসারে তাদের সীমিত সামর্থ্য কাজে লাগায়, তাতে কার স্বার্থরক্ষা হয়? সরকারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় জিন সংগ্রহশালায় যেসব বীজ সংরক্ষিত থাকে, তার ওপরে মালিকানা বা স্বত্ব কার? অনেকে ভাবতে পারেন, শস্য-বীজ কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানির হাতে থাকার চেয়ে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা নিরাপদ। যদিও বিটিবেগুনের ক্ষেত্রে দেখা গেল, জাতীয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনস্যান্টোকে বেগুন বীজ দিল। আর কিছুদিন বাদে সেসব বীজের জিনে বিটি জিন জুড়ে দিয়ে মনস্যান্টো সেগুলোর স্বত্বাধিকারী বনে গেল।
কার্যত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো বীজের মালিকানা হাতিয়ে নেবার জন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতিয়ার মাত্র। প্রকৃতপক্ষে যাদের কর্তৃত্বে বীজ থাকে অর্থাৎ কৃষকের হাত থেকে বীজকে সরিয়ে নিয়ে কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে কৃষককে সেসবের ভোক্তা বানানোর যে সুগভীর ষড়যন্ত্র, সেটা বাস্তবায়নের কাজটি সারে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
এখন পর্যন্ত স্রেফ জনতার প্রতিরোধের কারণে এশিয়াতে জিএম ফসলের প্রসার খুব বেশি এগোয়নি। তাই বলে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাঠ বা পরীক্ষাগারে জিএম ফসলের আবাদকে ঠেকিয়ে রাখা গেছে, সেটিও সত্যি নয়। আসলে এসব প্রতিষ্ঠান হলো বড় বেনিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুপ্রবেশের দুয়ার। এরা ক্ষুদ্র চাষিদের হাত থেকে দেশি জাতগুলোকে কেড়ে নেয় আর তাদের চাষপদ্ধতিকে ধ্বংস করে দেয়। অথচ এসব বীজ ও চাষপদ্ধতিই বছরের পর বছর ধরে চাষিদের জীবিকা ও খাবার নিশ্চিত করছিল।
এখন সময় এসেছে ফসলের মাঠগুলো চাষিদের হাতে থাকা বহুবিচিত্র জাতের ফসলে ভরে তুলবার। কৃষকেরা বিকশিত করেছে, এসব জাতের ফসলও তার মধ্যে থাকবে। প্রয়োজনে সরকারি বিজ্ঞানীদের সহায়তাও নিতে হবে। ধীরে ধীরে বিজ্ঞানী ও চাষিদের মধ্যে এক সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যা স্বাভাবিক [জিএমও নয় এমন] জাতের প্রসারকে করে তুলবে বাধাহীন।

++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++

বিসম্বাদ এই যে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) মার্কিন কোম্পানি মনস্যান্টো ও তাদের ভারতীয় দোসর মহারাষ্ট্র হাইব্রিড সিড কোম্পানি লিমিটেডের (মাহিকোর) কাছে বাংলাদেশের প্রাণসম্পদ বেগুনের মালিকানা তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার জিন ঢুকিয়ে স্থানীয় বেগুনের জাতের বিকৃতি ঘটিয়েছে তারা। তাদের দাবি, এসব বেগুন নিজের ভিতরেই মাজরা পোকার বিষ তৈরি করবে। এতে ওই পোকার জন্য আলাদা করে কীটনাশক দিতে হবে না, উৎপাদন খরচ কমবে।

প্রকল্প মোতাবেক, ২০১৪ সালে দেশের ২০ জন কৃষকের হাতে এবং ২০১৫ সালে আরো ১০৬ জনের কাছে বিটিবেগুনের চারা তুলে দিয়েছে বিএআরআই। মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএইড এর অর্থয়নে কৃষি জীব প্রযুক্তি সহায়তা প্রকল্প দুই বা এবিএসপি-২ এর অধীনে চলছে বিটিবেগুন গবেষণা ও চাষের নামে নানা ছলচাতুরি। প্রথম দু’বছর ফলন বিপর্যয়ের কারণে লোকসান গুনতে হয়েছে কৃষককে। বৈজ্ঞানিক রীতি, দেশি ও আন্তর্জাতিক আইন-গাইডলাইন-বিধিমালা-প্রটোকল ভেঙেই চলছে প্রকল্পের কাজ। জিম্মি করা হচ্ছে কৃষককে। লঙ্ঘন করা হচ্ছে কোটি কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্যের অধিকার।
যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা না হওয়ায়, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের উপর এই বেগুনের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমরা শঙ্কিত। তার ওপর এই বেগুনের মেধাস্বত্ব নিয়ন্ত্রণ করবে মনস্যান্টো-মাহিকো। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএআরআই ও বেসরকারি বীজ, কৃষি-রাসায়নিক কোম্পানি ‘লাল তীর সীডস লি.’ মনস্যান্টো-মাহিকোর সাথে সেই চুক্তিই সম্পন্ন করেছে।

তবে এই ষড়যন্ত্রের সবচাইতে বড় ভুক্তভোগী বেগুন নিজে। বেগুনের আদি উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ। এখানকার বেগুনের বৈচিত্র্য ধ্বংস করতে ধেয়ে আসছে বিটিবেগুনের বোমা। আমাদের পুস্তিকায় এই আগ্রাসনের চিত্রই তুলে ধরতে চেয়েছি পাঠকের সামনে।


You Might Be Interested In

LEAVE A COMMENT