বানান হয়ে ওঠা সময়

মহাকাব্য রচয়িতা কবি কায়কোবাদের স্মৃতিচিহ্নের খোঁজে

104
224 views

হুমায়ূন শফিক

তখনো আমার ঘুম ভাংগে নি। সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে । মোহাম্মদ রোমেল ভাই ফোন দিয়া কইল, আমার বাসায় চইলা আসো । ঘুম ঘুম কন্ঠে বললাম, আসতেছি । যাইতে যাইতে সাড়ে এগারোটা বাইজা গেল ।

শুনলাম ফিল্মমেকার আবিদ মল্লিক ভাই আসতেছে । ঢাকার নবাবপুরে আগলা গ্রামে যাবে কবি কায়কোবাদের জন্ম ভিটায় । কেন ? সেইখানে কবি কায়কোবাদের স্মৃতিচিহ্ন কি কি আছে সেইটা দেখতে ।

রোমেল ভাই নেট ঘেটে কবি কায়কোবাদ বিষয় আপডেট হচ্ছিল । বলছিলেন, উনাদের সময়ে ‘আযান’ নামে একটা কবিতা স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে ছিল । আমাদের সময়ে পাঠ্য হিসাবে পাই নাই । আমরা কয়কোবাদের অন্য কিছু কবিতাও পড়লাম ।

দুপুরের পানাহার শেষ কইরা রওনা দিলাম আগলার উদ্দেশ্য । গাবতলী থেকে টেম্পুতে উঠলাম । আবিদ ভাইয়ের কাঁদে ভারী ক্যামেরার ব্যাগ ।

কবি কায়কোবাদের বিষয়ে যারা একেবারেই জানেন না তাঁদের কিছু বেসিক তথ্য এইখানে দিয়া রাখি । কবি কায়কোবাদ ১৮৫৭ সালে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানার অধীনে আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। উনার বাবা শাহামাতুল্লাহ আল কোরেশী ঢাকা জেলা জজকোর্টের একজন আইনজীবি ছিলেন। কায়কোবাদ সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে অধ্যয়ন করছিলেন। পিতার অকালমৃত্যুর পর তিনি ঢাকা মাদ্রাসাতে (বর্তমান কবি নজরুল সরকারি কলেজ) ভর্তি হন । সেইখানে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষা পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছিলেন কিন্তু পরীক্ষা দেননি । পোস্টমাস্টারের চাকরি নিয়ে তার গ্রাম আগলায় চলে যান । সেইখানেই তিনি অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত কাজ করেছেন । ১৯৫১ সালে ২১ শে জুলাই উনি মারা যান । কায়কোবাদ ‘মহাশ্মশান’ কাব্য গ্রন্থের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেন ।

বলা হয়, আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম মহাকাব্য রচয়িতা কবি কায়কোবাদ । তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে অবলম্বন করে রচিত এ কাব্যে জয়-পরাজয় অপেক্ষা ধ্বংসের ভয়াবহতা প্রকট হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘মহাশ্মশান’। এটি তাঁর সবচেয়ে ভাল রচনা এবং এর কারণেই তিনি মহাকবিরূপে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে ।

প্রায় ঘন্টা খানেক সিএনজিতে জার্নি করার পর আমরা নবাবাগঞ্জের আগলা বাসস্ট্যান্ডে নামলাম । সেইখানে আমাদের কবি বন্ধু শেখ সাদ্দাম হোসেন অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য তাঁর চাচাত ভাই রবিউলকে নিয়া । সেইখান থেকে ইজিবাইকে করে প্রায় ১ কিলোমিটার ভিতরে আগলা পূর্ব পাড়া গ্রামে কায়কোবাদের জন্মভিটায় আমাদের যাইতে হবে । ইজিবাইকে উঠার পরপরই আলাপে আলাপে একজন জানাইলেন এইযে দেখেন, এইখানে ‘কায়কোবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে একখান স্কুল আছে । পাশেই আছে পোস্ট অফিস । যেইখানে কায়কোবাদ সারাজীবন পোস্টমাস্টার হিসাবে চাকুরি করেছেন ।

এই পোস্ট অফিসের পাশ দিয়েই গাছে ঘেরা পিচঢালা সরু সুন্দর একটা রাস্তা চলে গেছে কায়কোবাদের জন্মভিটা আগলা পূর্ব পাড়ায় । এই রাস্তা ধরেই ৭/৮ মিনিটের মাথায় ইজিবাইক থামল । ড্রাইভার বলল এইখানেই কায়কোবাদের বাড়ি । নিশ্চিত হওয়ার জন্য কাছেই কয়েকজন মহিলা দাঁড়ানো দেখে তাদের আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কায়কোবাদের বাড়ি কোনটা ? উত্তরে জানাইল, এইখানে তো কায়কোবাদের বাড়ি নাই । উনার নাতিরা বাড়ি বেইচা চইলা গেছে অনেক আগেই । আমরা আরো কিছু খোঁজ-খবর জানতে চাইলে সামনে মোড় দেখাইয়া বলল, ঐখানে যান । ঐখানে অনেক মুরুব্বি লোকজন আছেন । তাঁদের জিগান । উনারা আরো ভাল বলতে পারবেন ।

কায়কোবাদের বাড়ির কাছেই মোড়ে নতুন বাজার হয়ে উঠতেছে টাইপের একটা জায়গা । সেইখানে চায়ের দোকানে দোকানে মানুষের গুচ্ছ গুচ্ছ আড্ডা । কয়েকজন মুরব্বির লগে কথা বললেন, রোমেল ভাই । জানতে চাইলেন কায়কোবাদ নিয়া । মুরব্বিরা জানাইল’ ‘এইখানে কায়কোবাদের কোন স্মৃতিচিহ্ন নাই । জন্মভিটাও বিক্রি কইরা দিছে নাতিরা দিকে । ফলে এইখানে এখন কায়কোবাদের কোন আত্মীয় থাকেন না । ১৯৮৩ সালে আমরা এলাকাবাসি মিল্লা কায়কোবাদের নামে একটা ক্লাব করছি । এই যে, পাশে ‘ক্লাব’ ।’

আমরা উকি দিয়া দেখলাম, একটু ভাঙ্গাচুরা টিনের ঘর । সেইখানে ছেলে-পেলেরা ক্যারাম খেলছে । ক্লাবে ।

ইতিমধ্যে আবিদ মল্লিক ভাই ক্যামেরা সেটআপ করে রেডি করে ফেলল । মোহাম্মদ রোমেল ভাই লোকাল লোকদের ক্যামেরায় সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন । তাঁদের নিয়ে কায়কোবাদের জন্মভিটায় গেলেন । ক্রয়সূত্রে এখন যারা মালিক তাঁদের সাথে কথা বললেন ।

লোকাল লোকজন বলছিল, কায়কোবাদের গ্রামের বাড়ির সামনের সড়কের নাম, একটা ক্লাব আর একটা স্কুলের নাম ছাড়া পুরা নবাবগঞ্জে কয়কোবাদের নামে আর কোন কিছু নাই । সরকার কিনবা পরিবার এইখানে কিছু করে নাই । এই নিয়া সামান্য আক্ষেপও জানাইতেছিল তারা ।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম মহাকাব্য রচয়িতা কবি কায়কোবাদের ‘আযান’ কবিতার স্মৃতি এলাকাবাসীর মনে এখন তাজা । বয়স্ক প্রায় সকলেই কায়কোবাদের ‘আযান’ কবিতার কথা বলছিল । এইটা ছাড়া অন্য কোন কবিতার কথা তারা বিশেষ জানে না । জানে না কায়কোবাদের কাব্যসাধনার পিছনে মুসলমান সম্প্রদায়কে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়াস । ইংরেজ শাসনে বৈষম্যের শিকার হয়ে পিছিয়ে পড়া মুসলমান সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তুলা প্রয়াস ।

কায়কোবাদ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ । সেই প্রকাশ তাঁর বিভিন্ন রচনায় আছে । তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন ।

১৯৩২ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন । বাংলা কাব্যসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাঁকে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ এবং ‘সাহিত্যরত্ন’ (১৯২৫) উপাধি দেয় ।

কায়কোবাদ ১৯৫১ সালের ২১ জুলাই ঢাকায় মারা যান । উনার কবর আজিমপুর গোরস্থানে আছে বলে এলাকার মানুষ বলছিলেন । সেইটা আমরা যাচাই করে দেখতে পারি নাই ।

কায়কোবাদের কাব্যগ্রন্থ সমূহঃ
১) বিরহ বিলাপ (১৮৭০) (এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ)
২) কুসুম কানন (১৮৭৩)
৩) অশ্রুমালা (১৮৯৬)
৪) মহাশ্মশান (১৯০৪), এটি তাঁর রচিত মহাকাব্য
৫) শিব মন্দির (১৯২১),
৬) অমিয় ধারা (১৯২৩),
৭) শ্মশানভষ্ম (১৯২৪)
৮) মহররম শরীফ (১৯৩৩) [ মহররম শরীফ’ কবির মহাকাব্যোচিত বিপুল আয়তনের একটি কাহিনী কাব্য।]
৯) শ্মশান ভসন (১৯৩৮)
১০) প্রেমের রাণী (১৯৭০)
১১) প্রেম পারিজাত (১৯৭০)


You Might Be Interested In

LEAVE A COMMENT