বানান হয়ে ওঠা সময়

মানুষ রয় মানুষের ঠাঁই

104
6 views

ফরহাদ মজহার

কার্তিকের তেরো তারিখ। ফকির লবান সাঁইজীর তিরোধান দিবস উপলক্ষে সাধুসঙ্গ। অধিবাস ও দ্বীন ডাকের পর গানের অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। গান শুনতে শুনতে কথা বলছিলাম অনেকের সঙ্গে। অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ। কানে এল নদীয়ার আহাজারি:

‘মানুষ ভজে যে যা কর গৌরচাঁদ গিয়েছে সরে, আরকি গৌর আসবেন ফিরে’।

মঞ্চে গান গাইছেন কমলারাণি। গুণী মানুষ। পুরা পরিবারই কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রখ্যাত। তাঁর সন্তান পরম স্নেহভাজন ভজন কুমার ব্যাধও গুণী। গৌর আর ফিরবেন না। এখন যদি কিছু অর্জনের বাসনা থাকে তবে সেটা ‘মানুষ ভজনা’ র মধ্য দিয়েই একমাত্র সাধ্য, আর কোন ভাবে নয়। গৌর বা শ্রীচৈতন্য প্রেম ধর্ম প্রচার করেছিলেন, সেটা আমরা জানি। ‘রাধা ভাবে উপাসনা’ সেটাও তাঁরই পন্থা। কিন্তু বঙ্গে প্রেমের বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়ে স্মার্ত ব্রাহ্মণদের প্রবল বিরোধিতার মুখে শ্রীচৈতন্য নদীয়া ছেড়ে চলে যান। আর কখনই বাংলায় ফিরে আসেন নি। । কিন্তু তারপরও নদীয়া চৈতন্যকেই প্রথম ‘ফকির’ হিশাবে মান্যতা দেয়। যে বিপ্লবের বীজ তিনি রোপন করেছিলেন, তা পূর্ণতা পায় নি। নিত্যানন্দের নেতৃত্বে বঙ্গে জাতপাত, নারী-পুরুষ ভেদ ও ধনি-নির্ধন বিভাজনের বিরুদ্ধে সেই লড়াই জারি রয়েছে আজও। নদীয়ার ফকিররা তা বহন করে চলেছেন। সাধুসঙ্গে যখন নদীয়ার গৌরের জন্য এই আহাজারি কানে আসে, তখন চোখে পানি এসে যায়। দীর্ঘ একটা লড়াই জারি রয়েছে বাংলায়, বিশেষত বাংলাদেশে। হাজারো আচ্ছাদনে তা ঢাকা পড়ে গেলেও ‘মানুষ ভজনা’ কথাটি লাল অক্ষরে ভাব ও করণ কিম্বা চিন্তা ও তৎপরতার কর্তব্যকে মনে করিয়ে দেয়।


 


চৈতন্য নদীয়া ছেড়ে চলে যাবার পর অবধূত নিত্যানন্দের নেতৃত্বে নিম্ন বর্গের মানুষের রাজনৈতিক ও ভাবগত আন্দোলন চলেছে। থেমে থাকে নি। তারই ধারাবাহিকতায় নদীয়ার ফকিরদের নেতৃ্ত্বে যে ভাবের বিকাশ ঘটেছে তার সারকথা ‘মানুষ ভজনা’। স্রেফ প্রেম বা শুধু প্রেমের প্রচার নয়, কিম্বা শুধু জাতপাত বিরোধিতাও নয়। সেই রাজনীতি তো আছেই। বরং ‘মানুষ ভজনা’ই নদীয়ার নিজস্ব মৌলিক দার্শনিক-রাজনৈতিক প্রত্যয় । ‘ভজনা’ অদ্ভূত একটি শব্দ। বাংলা ছাড়া এর মর্মোদ্ধার দুঃসাধ্য।

প্রেমের প্রচার এবং তার জাতপাত বিরোধী রাজনীতি থেকে ‘মানুষ ভজনা’– রাজনৈতিক ইতিহাস ও ভাবের জগতে দীর্ঘ পরিক্রমা । বঙ্গের দার্শনিক চিন্তার বিকাশ বুঝতে চাইলে এই ঐতিহাসিক পরিক্রমা এবং তার আভ্যন্তরীণ বিবর্তন বোঝা দরকার। চৈতন্য নদীয়া ছেড়ে গিয়েছিলেন, আর ফিরে আসেন নি সেটা নদীয়ায় ঐতিহাসিক ঘটনা মাত্র, কিন্তু ইতিহাসের পরিসমাপ্তি নয়। তিনি আর কখনই ফিরবেন না বলেই এখন তাহলে একমাত্র কাজ ‘মানুষ ভজনা’ – এই ঘোষণার তাৎপর্য বোঝাও সহজ নয়। কারণ এরমধ্যে নিহিত রয়েছে নদীয়ায় ইতিহাসের ধারণা । নদীয়া ইতিহাসকে নিছকই ঘটনা বলে ফেলে রাখল না । বরং ইতিহাসকে রাজনীতি ও দার্শনিক কর্তব্যের দিক থেকে যুগপৎ নতুন কর্তব্যে নিষ্ঠ করবার দিকে, নতুন ইতিহাস নির্মাণের সম্ভাবনার দিকে নিয়ে গেল। গৌর নাই তাতে মানুষের ইতিহাস থেমে নাই। তিনি আর কখনই প্রত্যাবর্তন করবেন নার অর্থ কোন অবতারও আর পুরাণ রূপে ইতিহাসে অবতরণ করবেন না। কারণ কলি যুগে মানুষই অবতার। অতএব এখন কর্তব্য ‘মানুষ ভজনা’। চৈতন্যের আর কখনই ফিরে না আসাকে দার্শনিক অর্থে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলা নদীয়ার ফকিরদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান।



গৌর আর আসবেন না কথাটার আরও মানে আছে। কারন ব্রাহ্মণের সন্তান নিম্ন কোটি থেকে আবার ফিরে গিয়েছেন উচ্চকোটিতে । নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষের ভাষায় ভাবচর্চা, কীর্তন বা পদ রচনার ধারা পরিত্যাগ করে আবার নিজেকে গোস্বামীদের হাতে সঁপে দিয়েছেন । আবার বেদবিধি শাস্ত্রের কাছে প্রেম ও সাধন ভজন শৃংখলিত হোল । অথচ নদীয়া বেদবিরোধী, শাস্ত্র বিরোধী । অতএব গৌর আর ফিরছেন । নিম্নকোটির কাজ হচ্ছে অতএব ‘মানুষ ভজনা’।

বাংলার ভাবান্দোলনের এইসকল মৌলিক বাঁক নিয়ে আদৌ কোন কাজই হয় নি । বৈষ্ণবদের নিয়ে কাজ হয়েছে । বিক্ষিপ্ত ভাবে কর্তাভজাদের নিয়েও কিছু কাজ হয়েছে । কিন্তু নদীয়ার ফকিরদের নিয়ে আন্তরিক অন্বেষণ ও গবেষণা দূরের কথা, বরং লালন ফকিরকে ‘বাউল’ ও ‘বাউল সম্রাট’ বানিয়ে এমন এক খোপে ঢুকিয়ে দেওয়া হোল যার ফলে তাঁকে চেনাই এখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে । বেদ ও শাস্ত্র বিরোধী নদীয়ার ফকিরদের কাছে শ্রীচৈতন্যের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝা যাবে না। তাকে বুঝতে হবে নদীয়ার স্বাতন্ত্র ও নিজস্বতা দিয়ে । ভাবের পরিমণ্ডল হিশাবে নদীয়া আর বৃন্দাবন এক নয়, তবে ঐক্যের ক্ষেত্রও সমান গুরুত্বপূর্ণ । ঐক্যের ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে ফকিরদের নিজস্ব বয়ান আছে ।

আমার বন্ধুদের মধ্যে মোহামদ রোমেল এই ক্ষেত্রে তুমুল অনুসন্ধানী । তাঁর নিষ্ঠা আর আগ্রহে কোন কমতি নাই। আমরা দুজনেই আমাদের আরও অনেক বন্ধুবান্ধব সহ জ্যোতিধামের সাধুসঙ্গে আছি। গানের অনুষ্ঠান শেষ হবার পর সাধুসেবা হোল । নিরামিষ ও ভাত । সেবা শেষ হতে রাত প্রায় তিনটা । রোমেল জানালো, কমলারাণীর গানের পর একজন শিল্পী একটি দারুন কাটান গান গেয়েছেন । গৌর নাই, তা ঠিক আছে, কিন্তু সাঁই তো ‘নিগমে’ বিরাজ করছেন ।

‘বড় নিগমেতে আছেন গো সাঁই,
যেখানেতে আছে মানুষ সেথায় চন্দ্রসূর্যের বারাম নাই
বড় নিগমেতে আছেন গো সাঁই।।

হাওয়াদ্বারী দিল-কুঠুরী
মানুষ আছে শূন্যপুরী
শূন্যকারে শূন্য বাড়ি
‘মানুষ’ রয় মানুষের ঠাঁই ॥  ইত্যাদি।

সোলেমান শাহ’র গাওয়া গানের ইউটিউব লিঙ্ক—  https://www.youtube.com/watch?v=fsmwhlYJVIo

 

গৌর নাই বটে, কিন্তু মানুষের মধ্যে মানুষ আছে। গৌরাঙ্গ ফিরলেন না নদীয়ায়, কিন্তু বেদে বা শাস্ত্রে আর ফিরে যাওয়া যাবে না, ফিরতে হবে মানুষের মধ্যে। ‘মানুষ ভজনাই’ এ কালের কাজ । ‘বৃন্দাবনের নিগূঢ়’ অর্থ এটাই । বৃন্দাবনকে নদীয়ার জায়গা থেকে বুঝতে হবে । বৃন্দবনের ছয় গোস্বামীর ব্যাখ্যা দিয়ে নয় । ব্রাহ্মণদের বৈদিক বা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের মধ্যে যে ‘মানুষ’ বাস করে তার হদিস মিলবে না ।

 



 

যিনি কাটান গাইলেন তাঁকে আমরা রাত্রির তৃতীয় প্রহরে খুঁজতে বেরুলাম। ঘুমের আয়োজন চলছে সবার। আমাদের চোখে ঘুম নাই । কমলা রাণীর পরে কাটান গান করা সোলেমান শাহকে পেয়েও গেলাম । বিস্মিত হলাম । ঝিনাইদহের সোলেমান শাহ অনেক গান ধরে রেখেছেন । আমাদের পেয়ে সোলেমান খুশী। দোতারা দিয়ে গান গাইছেন আর কথা বলছেন । একসময় গাইলেন:

‘ছিঃ ছিঃ ওলো রাই
কথার মুখে ছাই
লাজে মরে যাই গো শুনে ।।

গানটি একজন মুসলমান পদকর্তা মফিজ উদ্দীনের। নদীয়া এখনও সোলেমানের মতো অতি সাধারণ মানুষের ভাবুকতা ও গানে হাজির, ভাবতেই চোখে পানি এসে গেল । বাংলার ভাবজগতে মুসলমান পদকর্তাদের অবদান অসামান্য । অথচ আজ তাঁদের চিহ্ন নাই বললেই চলে । বলা হয় বৈষ্ণব জাতপাত মানে না, বৈষ্ণবের সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি থাকবার কথা নয় । বৈষ্ণব পদকর্তা, পদকর্তাই বটে, হিন্দু মুসলমান ভেদ থাকবার কথা ছিল না । কিন্তু তাঁরা পরিচিত হলেন ‘মুসলমান’ পদকর্তা হিশাবে । তাঁদের পদ্গুলোর আলাদা সংকলন হয় ।

সোলেমানের দোতারা কীর্তনাঙ্গের সুরকে সরল ভাবে পেশ করছে । গানগুলো পদ প্রধান। অর্থাৎ গানের কথাকে স্পষ্ট অর্থবহ করবার চেষ্টা এখানে মুখ্য । সোলেমানেরো খেয়াল সেই দিকেই । কারন তাকে গানের কথা আর দোতারার সিম্পল বাজনা দিয়ে বোঝাতে হবে কৃষ্ণের বাঁশীর উৎপত্তি কোথা থেকে । সেই ব্যাখ্যার জন্য তাকে নারায়ন আর লক্ষীর পুরাণে প্রবেশ করতে হবে ।

‘বাঁশীর জন্ম যথা হতে
লক্ষীর অঙ্গে ক্ষীরোদ উৎপত্তি তাতে”

লক্ষীর অঙ্গে ক্ষীরের সমুদ্রের উৎপত্তি যেখানে বাঁশীর জন্মও সেখানে । সেই বাঁশীই এখন কৃষ্ণের হাতে । নন্দের নন্দন সেই বাঁশী পেয়ে এখন বৃন্দাবনে বাজাচ্ছে । রাধে, এই বৃন্দাবনে এই বাঁশীর জন্যই তোর এতো নিন্দা । লোকনিন্দায় ভয় কি তোর ? কথার মুখে ছাই দিয়ে মফিজ উদ্দীন তোকে সেটা জানিয়ে দিচ্ছে ।

শশিভূষণ দাশগুপ্ত ‘বাংলার মুসলমান কবি ও রাধাবাদ’ নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন হিন্দু বা মুসলমান পদকর্তা সকলেই যে বৈষ্ণব ছিলেন তা নয়, কিম্বা বৈষ্ণব ভাবাপন্ন ছিলেন তাও বলা যাবে না । কিন্তু বাংলায় হোসেন শাহের আমলের অন্তর্গত থেকে শ্রীচৈতন্যের সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের যে প্রভাব পড়ে তা “সমগ্র জাতির একটি চিত্তপ্রবণতা রূপে একটি সাংস্কৃতিক রূপ পরিগ্রহ করে । কোন একটি বিশেষ-জাতীয় সাহিত্যও যখন এইরূপ ব্যাপক ও গভীর প্রসারের দ্বারা জাতীয় চিত্তপ্রবণতারই নিয়ন্ত্রক হইয়া দাঁড়ায় তখনই সাহিত্য-সংস্কৃতির গভীর রূপ ধারণ করে । সাংস্কৃতিক রূপে পরিণত এই-জাতীয় ধর্ম ও সাহিত্যকে জাতি অনেক সময় শতাব্দির পর শতাব্দি ধরিয়া একটি সামাজিক উত্তরাধিকার রূপে গ্রহণ করিতে থাকে।” (পৃঃ ৩৫৬)

‘বাংলাদেশের কয়েকটি ধর্মমত এবং তদাশ্রিত সাহিত্য বিশেষ ধর্ম সম্প্রদায়ের ভাবুকতা ও ধর্মচর্চার বিষয় হওয়া সত্ত্বেও তার ‘ব্যাপক ও গভীর প্রসারের দ্বারা’ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিপুল জনগণের মনে যে ব্যাপকতা ও গভীরতার সঞ্চার ঘটিয়েছে, ধর্ম নির্বিশেষে তার নির্ধারক প্রভাব একটি জনগোষ্ঠি বা ‘জাতি’র ‘চিত্ত প্রবণতা’ হিশাবে দানা বেঁধেছে । তাকে সেই ‘জাতি’ শতাব্দির পর শতাব্দি তাদের ‘সামাজিক উত্তরাধিকার’ হিশাবে গ্রহণ করেছে । বৈষ্ণব ধর্মমত ও সাহিত্য ছাড়াও রয়েছে নাথ ধর্ম ও বিভিন্ন সহজিয়া ধর্ম ও সাহিত্য ।

‘চিত্ত প্রবণতা’, ‘সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার’ ইত্যাদি ধারণা থেকে শশীভূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারনা প্রস্তাব করেছেন । সেটা হচ্ছে ‘বৃহৎ বাঙালি সমাজ’ বা ‘বড় বাঙালি সমাজ’-এর ধারণা। তাঁর দাবি ‘ধর্ম বিশ্বাস রূপে যে সম্প্রদায় যে মতই গ্রহণ করিয়া থাকুক না কেন সাংস্কৃতিক জীবনে আভ্যন্তরীণ চিত্তপ্রবণতার বিচারে তাহাদের একটি ‘অখণ্ড বাঙালী’ পরিচয় ছিল । এই অখণ্ড বাঙালি পরিচয়ের ফলে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নিজেদের ‘ধর্মের ক্ষেত্রে পৃথক’ মনে করলেও ‘সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার’কে কেউই পরিত্যাগ করল না । তাই শশিভূষণ বলছেন, “সেই কারণে দেখিতে পাই বাংলাদেশের হিন্দু যেমন ‘বাঙালি হিন্দু’ বাংলাদেশের মুসলমানও তেমনি ‘বাঙালি মুসলমান’, বাংলাদেশের বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদেরও তাই একটি বিশেষ বাঙালি পরিচয় আছে ।

কিন্তু জিজ্ঞাসা থেকে যায়। ‘অখণ্ড বাঙালি’ অখণ্ড রইল না কেন? কিম্বা রাজনৈতিক ভাবে অখণ্ড হবার বাসনার পরিবর্তে সাত চল্লিশে হিন্দু হিশাবে ‘ভারতীয়’ আর মুসলমান হিশাবে ‘পাকিস্তানী’ হোল কেন? এমনকি তাদের ‘চিত্ত প্রবণতা’ কিম্বা ‘সামাজিক উত্তরাধিকার’ দাঙ্গা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও অক্ষম হোল কেন?

শশীভূষণের কথার সূত্র ধরে বলা যায়, হিন্দু পুরাণ, ধর্মমত ও সাহিত্য থেকে জাত ‘চিত্তবৃত্তি’কে জাতীয় চিত্তবৃত্তি হিশাবে হিন্দু-মুসলমান তাদের ‘উত্তরাধিকার’ গণ্য করলেও বঙ্গে ইসলাম যে নতুন চিন্তা ও চিত্তবৃত্তির জন্ম দিয়েছিল তাকে শুরু থেকেই উচ্চ বর্ণের হিন্দু অস্বীকার করে এসেছে এবং এখনও করে । বঙ্গে রাজনৈতিক শক্তি হিশাবে সুলতানরা ক্ষমতায় না থাকলে চৈতন্য সেই সময় শক্তিশালী স্মার্ত ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জাতপাত বিরোধী আন্দোলন আদৌ শুরু করতে সক্ষম হতেন কিনা সন্দেহ । তাই সুলতানী আমল বা বিশেষ ভাবে হোসেন শাহী আমলের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে চৈতন্যের জাতপাত বিরোধী আন্দোলন কিম্বা ভগবানের সঙ্গে সরাসরি প্রেম সম্বন্ধ স্থাপনের মতাদর্শ প্রচার মোটেও সহজ ছিল না । আল্লার সঙ্গে সরাসরি আশেকী সম্পর্ক স্থাপনের চর্চা ইসলামের সুফি-দরবেশদের মধ্যে সবসময়ই ছিল । সেই দিক থেকে চৈতন্য নতুন কোন কথা বলেন নি । বরং ইসলাম যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিত্তবৃত্তির সংবাদ এনেছিল তাকে একটা স্থানীয় বা ‘বঙ্গীয়’ রূপ দিয়েছেন । তাঁর ‘নামকীর্তন’ মূলত সুফিদের ‘জিকির’ বা নামাশ্রয়েরই বঙ্গীয় রূপ । তাই মুসলমানদের মধ্যে বৈষ্ণব পদকর্তার জন্ম বিস্ময়কর কিছু নয়, বরং সেটা স্বাভাবিক ও অনিবার্যই ছিল । শশিভূষণ যে ‘চিত্তবৃত্তি’র কথা বলছেন বাঙালি মুসলমান তা গ্রহণ করতে দ্বিধা করে নি । নইলে এতো মুসলমান পদকর্তা এলো কোত্থেকে? যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাঙ্গালার বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মুসলমান কবি’দের যে সংকলন প্রকাশ করেছেন সেখানে আমরা ১০২ জন পদকর্তার নাম পাই ।

https://www.youtube.com/watch?v=Bm3hF3Vf8JA

বাঙালি মুসলমানের ক্ষেত্রে চিত্তবৃত্তির ধারণা খাটলেও হিন্দু বাঙ্গালির ক্ষেত্রে সেটা ঘটে নি । জাতপাত বিরোধিতার যে রাজনৈতিক প্রস্তাবনা ইসলামে রয়েছে এবং শ্রীচৈতন্য নদীয়ার লীলায় যাকে বঙ্গীয় রূপ দিয়েছেন; বেদ ও শাস্ত্র নির্ভর বর্ণ হিন্দু তা কখনই গ্রহণ করে নি । ইসলাম যে জাত-পাত বিরোধী সামাজিক-রাজনৈতিক চিত্তবৃত্তির জন্ম দিয়েছিল উচ্চ কোটির হিন্দু তা কখনই গ্রহণ করেনি । এমনকি হিন্দু বৈষ্ণবও জাতপাতের খোপ থেকে বেরুতে পারে নি । শুধু তাই নয় সাতচল্লিশের দেশ বিভক্ত করবার ক্ষেত্রে বর্ণ হিন্দু বা ভদ্রলোক শ্রেণীই প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল । সম্প্রতি জয়া চ্যাটার্জি তাঁর ‘বাংলা ভাগ হোল’ বইতে সেটা দেখিয়েছেন । ‘অখণ্ড বাঙালি’র ধারণ স্রেফ কল্পনা বা মিথ হয়েই রয়েছে । এখন তা রূপ নিচ্ছে হিন্দুত্ববাদ ও মুসলমান জাতিবাদে । বিভাজিত বিখণ্ডিত বাঙালি দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে । কেউ কাউকে এখন আদৌ চেনে বলেও মনে হয় না।

 



 

মোহাম্মদ রোমেল আর আমি সারারাত মুসলমান পদকর্তাদের কীর্তন শুনলাম । একসময় সোলামেন গাইল যাদুবিন্দুর গান । উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে সোলেমানও প্রবল উৎসাহে গেয়ে গেল ।

এক সময় মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল । নিদ্রার চেয়েও সালাত উত্তম ।

আরে মাবুদ ! আমরা তো জেগেই আছি । এবার অন্যদের জাগাও । বৃহৎ বঙ্গে সালাত আদায় হবে।

================================

১৯ কার্তিক ১৪২৬ ।। সোমবার, ৪ নভেম্বর ২০১৯, ঢাকা ।।


You Might Be Interested In

LEAVE A COMMENT