বানান হয়ে ওঠা সময়

“মানুষ বানায়া, খোদা গেল সাফায়া, পাইনা খুঁজিয়া, দেয়না দেখা” ।। যারা ভালবাসার তারা ঠিকই ভালবাসে — আব্বাস শেখ

106
117 views

আমি ডাব খাব বলে রাস্তার পাশে ডাবের দোকানে দাঁড়ায় আছি । দোকানি আমার জন্য ডাব কাটতেছে । দেখি একজন দুতারা নিয়া যাচ্ছে । দেখে ভাবের মানুষ মনে হইল । ভাই বইলা ডাক দিলাম । জিগাইলাম গান করেন ? বলল টুকটাক করি । নাম ? আব্বাস শেখ । বাড়ি ? মধুপুর, টাঙ্গাইল ।

এমন কথায় কথায় জানলাম আব্বাস শেখ কাদেরিয়া তরিকায় বায়াত । মুর্শিদের নাম আব্দুল আজিজ । বাড়ির কাছেই বাড়ি । নিজের বাবার কাছেই গান শিখেছেন । বাবা গান করতেন না । তবে গান বিষয়ে জানতেন । সেই জানাটা আব্বাস শেখকে দিয়া গেছেন । নিজের গুরু আর বাবা দুইজনই কাছাকাছি সময়ে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন ।

আব্বাস শেখ ঘর ছাড়া বহুদিন । যেইখানে মন টানে সেইখানে ছুঁটে বেড়ান । সেইটা মাজার কিনবা অন্য জায়গায় । আমি অনুরোধ করলাম সময় থাকলে একটুঁ গান শুনান । রাজি হইলেন । আরো কয়েকজন বন্ধু সমেত রাস্তায় আমরা আব্বাস শেখের গান শুনলাম । উনি গাইলেন—

“মানুষ বানায়া, খোদা গেল সাফায়া,
পাইনা খুঁজিয়া, দেয়না দেখা ।

প্রথমে আক্কাল আলী
দিলে থাকে শাহ্‌ আলী
ফুসফুসেতে জ্ঞানের থলি
ঘুরদানি নিদালায়
ঘুরদার ভিতর তিনটি নালা
কিছু মস্কার লস্কা কাটা
পাঁচজন অতীত বেটা থাকে সেইখানে
পাঁচ পাঁচা পঁচিশের গুণে
কল চালাইছেন রাত্রে দিনে
তারা পাঁচজন বইসা কান্দে ঘরের এই কোনায়
কইতে গেলে দেহের কাণ্ড
ফেটে যায় আমার হিদয় মণ্ড
ছাইড়া দে বা দেহের মণ্ড
এই জোড়ায় জোড়ায় ।।

মানুষ বানায়া, খোদা গেল সাফায়া,
পাইনা খুঁজিয়া, দেয়না দেখা ”

তারপর আক্কাস শেখকে জিগাইলাম আপনার এই ভাবজ্ঞান ক্যামেরায় রেকর্ড করতে চাই । বললেন, চলেন । ক্যামেরার সামনে আক্কাস শেখ ৫ টা গান গাইলেন । গানের ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করলে জানাইলেন, “গান সত্য জিনিস, এইটা কইয়া যাইতাছি, বাকিটা আপনার বিচার কইরা নিতে হইব। এর বেশি ব্যাখ্যা কইরা কইবার অনুমতি নাই ।” ফলে শুধু গান শুনাইলেন উনি । আলাপে গেলেন না । এমনে উনি যে খুব ভাল গান করছেন তা না । তবে ভাবের পাগলের যেই ভাব সেই ভাব দিয়া গান করছেন । ফলে স্কিল গায়ক না একজন ভাবুকের গলায় ভাবগান যেমন নিজ সুরতে ফুঁটে উঠে তেমন একটা ফিল পাইবেন আক্কাস শেখের গায়কীতে । আগ্রহীরা শুনতে পারেন ।

উনার গানের ফাঁকে আমি কিছু বকবক করছি । যেমন কইছি, এইসব গান আমাদের ভাবের ইতিহাসের পরম্পরার চিনহ। কিন্তু আধুনিক (পড়েন কলোনিয়াল) শিক্ষা-রুচির আগ্রাসনে আমরা এখন এইসব ভাবের কথার অর্থ বুঝতে পারি না । বুঝতে চাইও না । দরকারও মনে করি না । বরং অনেক সময় এইসব মূল্যবান সম্পদ যারা স্মৃতিতে ধরে রাখছেন তাঁদের প্রতি ঘৃণা এবং বিরক্তি নিয়া তাকাই। একটু গোড়া হইলে, বিদাতি বইলা মারতে যাই । অথচ ধর্মের মধ্যে মানুষের যে পরমার্থিক আকুতির কথা আছে, সেইসবের গোড়া বুঝতে এইসব ভাবের পরম্পরা-ইতিহাস খুবই কাজের হইত । হইত ধর্মকে— ধর্মতত্ত্বের বাইরে দাঁড়িয়ে চিন্তার জায়গা থেকে বুঝতে পারার সক্ষমতা । যেই সক্ষম বুঝ শুধু ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের না হয়ে জগতের সকলের হয়ে উঠার সম্ভাবনা নিয়া হাজির হইত । একটা বৃহৎ উম্মা বা পৃথিবী নির্মাণের পথে ঘৃণা বা চাপায় দেয়া সাম্প্রদায়িক ভঙ্গির বাইরে একটা প্রস্তাব হয়ে হাজির হইত ।

কৃষি সংস্কৃতির মধ্যে এই ভাবের যত বুঝ-কদর আমাদের কলোনিয়াল সেমি আরবান মধ্যবিত্ত-বড়লোকের মধ্যে ততটা বুঝ-কদর না হইবারই কথা । হইলে আমাদের ইতিহাস বর্তমান ফ্যাসিবাদী চক্রে বাঁধা পড়ত না । ফলে মোল্লা এবং আধুনিক মোল্লা আমরা মুদ্রার দুই পিঠ মাত্র । এর বাইরে দাঁড়িতে বুঝার আকুতি নাই তেমন । তার মধ্যে আবার আধুনিক মোল্লারা যারা দরদ দেখাইতে গেছেন তারা আরো সর্বনাশ করেছেন । যেমন গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ সিনেমার কথা একটু করে উদাহরণ হিসাবে বলছি । যারা আসলে ফকিরদের নিয়া কাজের নামে বলদকার করেছেন । কখনো কখনো তারা ঠাকুর বাড়ির জমিদারী ইমেজের বোখরা পড়াইতে চাইছেন ।

আলাপের একজায়গায় ভাবের পাগলের প্রতি মানুষের টান কমে গেছে কিনা জিগাইলে আব্বাস শেখ বলে, “যারা ভালবাসার তারা ঠিকই ভালবাসে ।”

তো ১ ঘণ্টার ভিডিও আলাপটা শুনেন । শুনেন “গান সত্য জিনিস, এইটা কইয়া যাইতাছি, বাকিটা আপনার বিচার কইরা নিতে হইব” — আব্বাস শেখের এই কথাও ।

#মোহাম্মদ রোমেল


You Might Be Interested In

LEAVE A COMMENT